ফুটবল মানেই কি শুধুই গোল আর গ্যালারির উল্লাস? একজন খেলোয়াড়ের জীবনের পর্দার আড়ালের গল্পটা সব সময় রঙিন হয় না। বিশেষ করে তিনি যদি হন নেইমার জুনিয়র। যার পায়ের জাদুতে মুগ্ধ পুরো বিশ্ব, সেই নেইমারই কিনা চোটের যন্ত্রণায় ফুটবলকে চিরবিদায় জানাতে চেয়েছিলেন! সম্প্রতি এমনটাই জানিয়েছেন তার বাবা এবং এজেন্ট নেইমার সিনিয়র।
ব্রাজিলিয়ান এই সুপারস্টারের ক্যারিয়ার জুড়ে ইনজুরি বা চোট যেন এক অভিশাপের মতো পিছু নিয়েছে। ২০২৩ সালের সেই ভয়াবহ চোট থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের শুরু মাঝখানের সময়টা নেইমারের জন্য ছিল নরকযন্ত্রণার মতো। বারবার ফিরে আসার চেষ্টা করেও যখন ব্যর্থ হচ্ছিলেন, তখন মানসিকভাবে এতটাই ভেঙে পড়েছিলেন যে, বুটজোড়া তুলে রাখার কঠিন সিদ্ধান্তও প্রায় নিয়েই ফেলেছিলেন।
চোটের আঘাতে বিপর্যস্ত নেইমার ও কঠিন সময়
২০২৩ সালের অক্টোবর মাস। ব্রাজিলের হয়ে খেলার সময় বাঁ হাঁটুতে মারাত্মক চোট পান নেইমার। এসিএল ও মেনিসকাসে আঘাত পাওয়ার পর দীর্ঘ সময় মাঠের বাইরে থাকতে হয় তাকে। ভক্তরা আশায় ছিলেন, প্রিয় তারকা হয়তো দ্রুতই ফিরবেন। সৌদি আরবের ক্লাব আল হিলালে চোট জর্জরিত একটা অধ্যায় শেষ করে, নিজেকে ফিরে পাওয়ার আশায় ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তিনি ফিরে আসেন তার শৈশবের ক্লাব সান্তোসে।
কিন্তু সান্তোসে ফিরেও স্বস্তি পাননি তিনি। এখানেও চোট তাকে ভোগাতে থাকে। গত বছরের শেষ দিকে, অর্থাৎ নভেম্বর-ডিসেম্বরে সান্তোসের জার্সিতে কয়েকটি ম্যাচ খেলেন তিনি, এমনকি একটি ম্যাচে হ্যাটট্রিকও করেন। কিন্তু সুখ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। আবারও হাঁটুতে সমস্যা দেখা দেয়। এরপর গত ২২ ডিসেম্বর তার বাঁ হাঁটুতে আবারও ছোট একটি অস্ত্রোপচার করানো হয়। এই ধারাবাহিক চোট আর অস্ত্রোপচারের ধকল সইতে পারছিলেন না তিনি।
“আমি আর নিতে পারছি না বাবা” নেইমারের আকুতি
সম্প্রতি একটি ইউটিউব চ্যানেলে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নেইমারের বাবা সেই কঠিন মুহূর্তগুলোর বর্ণনা দেন। তিনি জানান, ছেলের ওই অবস্থা দেখে তিনিও বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন। গণমাধ্যমে চোটের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর নেইমার মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন।
নেইমার সিনিয়র বলেন, “মেনিস্কাসে চোট পাওয়ার খবরটা আমরা ওর সাথে আলোচনা করার আগেই মিডিয়ায় চলে আসে। তখন ওর মাথা আর কাজ করছিল না। এত মানসিক চাপ ও শারীরিক যন্ত্রণা সামলানো ওর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছিল।”
ছেলের মানসিক অবস্থার কথা বলতে গিয়ে তিনি আরও যোগ করেন, “আমি ওর বাসায় গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এখন তুমি কেমন আছো?’ সে আমার দিকে ঘুরে অসহায়ভাবে বলল, ‘আমি আর নিতে পারছি না। বাবা… আমি জানি না অস্ত্রোপচারে আর কাজ হবে কিনা। যথেষ্ট হয়েছে’।”
এই কথাগুলোই প্রমাণ করে, কতটা হতাশা থেকে একজন বিশ্বসেরা ফুটবলার খেলার জগৎ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে চেয়েছিলেন।
সমালোচনার জবাব ও বাবার অনুপ্রেরণা
নেইমার যখনই চোটে পড়েছেন, তখনই একদল সমালোচক তাকে তিরে বিদ্ধ করেছেন। কিন্তু এই কঠিন সময়ে বাবার কাঁধেই ভরসা খুঁজে পেয়েছেন তিনি। নেইমার সিনিয়র তাকে বুঝিয়েছেন, সমালোচকদের কথায় কান না দিয়ে মাঠেই জবাব দিতে হবে।
বাবার অনুপ্রেরণাতেই অস্ত্রোপচারের পরদিন থেকে আবারও লড়াই শুরু করেন নেইমার। বাবা তাকে বলেছিলেন, “সেরে ওঠার জন্য তুমি যদি অস্ত্রোপচার চাও, আমি তোমার সঙ্গে আছি।” বাবার এই আশ্বাসেই যেন নতুন জীবন পান তিনি। পরের দিন অনুশীলনে নেমে যখন দেখেন তিনি পায়ে বল লাগাতে পারছেন, তখন আত্মবিশ্বাস ফিরে পান। মাথা নেড়ে বাবাকে জানান, “আমার মনে হয় আমি এটা করতে পারব।” এরপর তিনি খেলায় ফেরেন এবং গোল করে প্রমাণ করেন যে তিনি ফুরিয়ে যাননি।
২০২৬ বিশ্বকাপ ও নতুন চ্যালেঞ্জ
বর্তমানে নেইমার আবারও মাঠে ফেরার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। সব ঠিক থাকলে চলতি মাসের (জানুয়ারি ২০২৬) শেষ দিকেই তাকে আবারও মাঠে দেখা যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। দেশের হয়ে ১২৮ ম্যাচে রেকর্ড ৭৯ গোল করা এই তারকার সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ ২০২৬ বিশ্বকাপ।
তিনটি বিশ্বকাপ খেলা নেইমার কি পারবেন ইনজুরিকে জয় করে ব্রাজিলের বিশ্বকাপ দলে জায়গা করে নিতে? ভক্তদের প্রত্যাশা, সব বাধা পেরিয়ে আবারও সাম্বা ছন্দে মাঠ মাতাবেন তাদের প্রিয় তারকা। তবে আপাতত তার লক্ষ্য একটাই সম্পূর্ণ ফিট হয়ে মাঠে ফেরা।
ফুটবল বিশ্ব সাক্ষী, নেইমার বারবার পড়ে গিয়েও উঠে দাঁড়িয়েছেন। এবারও হয়তো তার ব্যতিক্রম হবে না। বাবার অনুপ্রেরণা আর নিজের মনের জোরে আবারও জয়ের হাসি হাসবেন নেইমার, এমনটাই প্রত্যাশা ফুটবলপ্রেমীদের।








