নাহিদ ইসলাম জামায়াত কে লক্ষ্য করে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা দেশের রাজনীতিতে নতুন এক জটিলতা সৃষ্টি করেছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বৈরশাসনের পতন হলেও, পরবর্তী রাজনৈতিক জোটের অংশীদারদের মধ্যেই দূরত্ব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং জামায়াতে ইসলামীর মধ্যেকার এই মতবিরোধ এখন প্রকাশ্যে। এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম জামায়াতের রাজনৈতিক কার্যকলাপ নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন, যার জেরে জামায়াতও কড়া পাল্টা জবাব দিয়েছে।
জুলাই সনদ নিয়ে দূরত্বের সূচনা
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) অবস্থানে প্রাথমিকভাবে বেশ মিল ছিল। উভয় দলই সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে। কিন্তু দুই দলের মধ্যেকার এই সাদৃশ্য বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। ‘জুলাই সনদ’ নিয়ে জামায়াতের সিদ্ধান্তের পরই মূলত এই দূরত্বের সূচনা হয়।
এনসিপি প্রথম থেকেই এই সনদে স্বাক্ষর করার বিষয়ে তাদের অনীহা প্রকাশ করে। এনসিপি নেতারা মনে করেন, কোনো আইনি কাঠামো বা আনুষ্ঠানিক ভিত্তি ছাড়া এই ধরনের সনদে স্বাক্ষর করা তাদের নীতিবিরোধী। তাই সরকারের পক্ষ থেকে বহু চেষ্টা করা সত্ত্বেও এনসিপি এই সনদে স্বাক্ষর করেনি।
তবে, এনসিপি সনদে স্বাক্ষর না করলেও, তারা জামায়াতকেও এই সনদ স্বাক্ষর থেকে বিরত থাকার জন্য অনুরোধ জানিয়েছিল। কিন্তু জামায়াত সেই অনুরোধ উপেক্ষা করে সনদে স্বাক্ষর করে, যা এনসিপি নেতৃত্বের কাছে বিশ্বাসভঙ্গের প্রথম কারণ হিসেবে দেখা দেয়।
নাহিদের ফেসবুক পোস্ট: ‘রাজনৈতিক প্রতারণা’র অভিযোগ
এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের সাম্প্রতিক ফেসবুক পোস্ট এই দূরত্বকে একেবারে প্রকাশ্যে নিয়ে আসে। তিনি তার পোস্টে জামায়াতের কঠোর সমালোচনা করেছেন।
নাহিদ ইসলাম জামায়াতের পিআর আন্দোলন (Proportional Representation বা আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের আন্দোলন) কে উদ্দেশ্য করে বলেন, এটি আসলে একটি ‘পরিকল্পিত রাজনৈতিক প্রতারণা’। তার মতে, এই আন্দোলন জনগণের মনোযোগকে মূল সংস্কারের প্রশ্ন থেকে সরিয়ে দেওয়ার একটি কৌশল মাত্র।
তিনি আরও দাবি করেন যে, জামায়াত যখন দেশের গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার আলোচনা চলছিল, তখন কখনোই সক্রিয় অংশগ্রহণ করেনি। বরং জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করতে চাইছে। নাহিদের এই সরাসরি আক্রমণ দুই দলের সম্পর্ককে আরও কঠিন করে তুলেছে।
এনসিপিতে ‘বিশ্বাসভঙ্গের বোধ’ ও অভ্যন্তরীণ কারণ
এনসিপি নীতিনির্ধারকদের মধ্যে জামায়াতের প্রতি কেবল রাজনৈতিক কৌশলগত দূরত্বই নয়, বরং এক ধরনের ‘বিশ্বাসভঙ্গের বোধ’ তৈরি হয়েছে। এনসিপির শীর্ষ নেতারা মনে করছেন:
- তৃণমূলে অনুপ্রবেশ: জামায়াত কৌশলে এনসিপির তৃণমূল স্তরে অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালাচ্ছে। এটি এনসিপির নিজস্ব সাংগঠনিক ভিত্তির জন্য হুমকিস্বরূপ।
- দলীয় প্রতীক নিয়ে বাধা: এনসিপির দলীয় প্রতীক ‘শাপলা’ নিয়েও জামায়াত বিভিন্নভাবে বাধা সৃষ্টি করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এনসিপির এই সমালোচনার পেছনে তাদের নিজেদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি করার উদ্দেশ্যও থাকতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। অভ্যুত্থানের পর গঠিত নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এনসিপি নিজেদের একটি স্বতন্ত্র ও শক্তিশালী দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে, যার জন্য অন্য কোনো দলের সঙ্গে কৌশলগত দূরত্ব তৈরি করা অপরিহার্য।
জামায়াতের পাল্টা জবাব ও প্রতিক্রিয়া
নাহিদ ইসলামের এমন তীব্র আক্রমণের পর জামায়াতে ইসলামী চুপ থাকেনি। তারা দ্রুত এর পাল্টা জবাব দিয়েছে।
জামায়াত নেতারা নাহিদ ইসলামের বক্তব্যকে ‘অস্পষ্ট ও বিভ্রান্তিকর’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তাদের মতে, এই ধরনের ‘বালখিল্য বক্তব্য’ (ছেলেমানুষী মন্তব্য) দেশের মানুষ বা জাতি আশা করে না।
জামায়াত পরিষ্কারভাবে দাবি করেছে যে, জুলাই সনদ ও পিআর আন্দোলন নিয়ে তাদের অবস্থান প্রথম থেকেই স্পষ্ট ছিল এবং তারা কোনো প্রতারণার আশ্রয় নেয়নি। তারা উল্টো নাহিদ ইসলামকে বিভ্রান্তিকর মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে।
রাজনৈতিক মহলের মতে, এই বক্তব্য-পাল্টা বক্তব্য দেশের সদ্য পরিবর্তিত রাজনৈতিক সমীকরণে বড় ধরনের জটিলতা যোগ করল। এটি প্রমাণ করে, স্বৈরশাসনের পতনের পর একসঙ্গে কাজ করা শক্তিগুলোর মধ্যে কৌশলগত এবং আদর্শগত পার্থক্যগুলো এখন সামনে আসছে। সামনে এই দুই দলের সম্পর্ক কোন দিকে মোড় নেয়, তার ওপর দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে।








