হটলাইনঃ +৮৮০ ৯৬১৩ ০০০ ২০০ |
Sunday, July 26, 2026
- বিজ্ঞাপন-spot_img
Homeজাতীয়রাষ্ট্রপতি পদে নিয়োগ থেকে পদত্যাগ: মো. সাহাবুদ্দিনকে ঘিরে যত বিতর্ক ও আলোচনা
spot_img

রাষ্ট্রপতি পদে নিয়োগ থেকে পদত্যাগ: মো. সাহাবুদ্দিনকে ঘিরে যত বিতর্ক ও আলোচনা

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম ঘটনাবহুল ও বিতর্কিত মেয়াদ পার করে সম্প্রতি পদত্যাগ করেছেন দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। তিন বছর তিন মাসের সংক্ষিপ্ত এই মেয়াদকালে তিনি একে একে তিনটি ভিন্ন সরকারের আওয়ামী লীগ, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং পরবর্তীতে নির্বাচনে বিজয়ী বিএনপি সরকারের প্রধানদের শপথ পাঠ করিয়েছেন, যা দেশের রাজনীতিতে এক অনন্য ও ব্যতিক্রমী ঘটনা।

মনোনয়ন লাভ থেকে শুরু করে পদত্যাগের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, আইনি বিতর্ক এবং সরকারের সাথে সম্পর্কের টানা-পোড়েন সবকিছু মিলিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন তিনি। চলুন জেনে নেওয়া যাক সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের এই আলোচিত মেয়াদকালের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কী কী ঘটনা ঘটেছিল।

রাজনৈতিক পরিচয় ও নিয়োগ ঘিরে প্রাথমিক বিতর্ক

২০২৩ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের প্রথমবারের মতো মো. সাহাবুদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন এবং একই বছরের ২৪শে এপ্রিল তিনি শপথ গ্রহণ করেন।

তবে দায়িত্ব নেওয়ার শুরু থেকেই তার রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন ওঠে:

  • দলীয় সম্পৃক্ততা: তিনি পাবনা জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি, যুবলীগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা এবং পরবর্তীতে বাকশাল ও পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক ছিলেন।
  • আনুগত্য বনাম নিরপেক্ষতা: আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দলীয় আনুগত্যকে বড় যোগ্যতা হিসেবে দেখা হলেও, বিরোধী দল ও সমালোচকরা প্রশ্ন তোলেন যে এমন রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ডের একজন ব্যক্তি রাষ্ট্রপতির মতো নিরপেক্ষ সাংবিধানিক পদে কতটা নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখতে পারবেন।

দুদকের পদ ও আইনি জটিলতা

রাষ্ট্রপতি পদে তার নাম ঘোষণার পরই একটি বড় আইনি বিতর্ক তৈরি হয়। মো. সাহাবুদ্দিন ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

দুদক আইন অনুযায়ী, এই পদ থেকে অবসর নেওয়া কোনো ব্যক্তি পরবর্তীতে প্রজাতন্ত্রের কোনো ‘লাভজনক পদে’ নিয়োগ পাওয়ার যোগ্য নন। ফলে তিনি রাষ্ট্রপতি হতে পারেন কিনা তা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে রিট করা হয়। তবে হাইকোর্ট ১৯৯৬ সালের সাবেক প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদের এক রিটের নির্দেশনার ওপর ভিত্তি করে জানায় যে—‘রাষ্ট্রপতি পদটি কোনো লাভজনক পদ নয়’। এর ফলে তার নিয়োগের আইনি বৈধতা নিশ্চিত হয়।

শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র সংক্রান্ত পরস্পরবিরোধী বক্তব্য

২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র নিয়ে রাষ্ট্রপতির দুটি ভিন্ন বক্তব্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ঝড়ের জন্ম দেয়:

১. প্রথম বক্তব্য: দেশত্যাগের দিন জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে রাষ্ট্রপতি বলেন, “প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমার কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন এবং আমি তা গ্রহণ করেছি।”

২. দ্বিতীয় বক্তব্য: কয়েক মাস পর এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, তাঁর কাছে শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্রের কোনো অফিশিয়াল কপি বা দালিলিক প্রমাণ নেই।

এই বক্তব্যের পর দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ তার পদত্যাগের দাবিতে বঙ্গভবন ঘেরাওসহ দেশব্যাপী আন্দোলন শুরু করে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বঙ্গভবন থেকে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে মীমাংসিত বিষয়ে নতুন বিতর্ক না বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়।

অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে তিক্ততা ও দূরত্ব

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পুরো সময়জুড়েই রাষ্ট্রপতির সাথে এক ধরনের টানাপড়েন স্পষ্ট ছিল।

আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান যে, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তিনি ‘অপমানিত’ বোধ করছিলেন। প্রধান উপদেষ্টা দীর্ঘদিন তাঁর সাথে সাক্ষাৎ না করা, বঙ্গভবনের প্রেস বিভাগ সরিয়ে নেওয়া এবং বিদেশের মিশনগুলো থেকে রাষ্ট্রপতির ছবি বা প্রতিকৃতি সরিয়ে ফেলার কারণে সরকারের সাথে তাঁর দূরত্বের বিষয়টি প্রকাশ্যে চলে আসে।

বিএনপি ও সাহাবুদ্দিন: সমর্থন থেকে পদত্যাগের বার্তা

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যখন বিভিন্ন পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতিকে সরানোর চাপ দেওয়া হচ্ছিল, তখন প্রধান বিরোধী দল বিএনপি সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার স্বার্থে সাহাবুদ্দিনের বহাল থাকার পক্ষে অবস্থান নেয়।

২০২৬ সালের নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরও রাষ্ট্রপতির সাথে নতুন সরকারের এক ধরনের সুসম্পর্ক দেখা যায়। এক সাক্ষাৎকারে শায়খ সাহাবুদ্দিন নিজেও কঠিন সময়ে তাঁর পাশে থাকার জন্য বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বকে ধন্যবাদ জানান। তবে সরকার গঠনের পাঁচ মাসের মাথায় রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে যেতে শুরু করে। বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে নতুন সরকারের সাথে তাঁর কিছুটা দূরত্ব তৈরি হয় এবং পরবর্তীতে বিএনপির উচ্চ পর্যায় থেকেই তাঁকে পদত্যাগের পরামর্শ বা বার্তা দেওয়া হয়।


রাষ্ট্রপতি হিসেবে মো. সাহাবুদ্দিনের মেয়াদকাল ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম মোড় ঘোরানো সময়। একটি স্বৈরাচারী সরকারের পতন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উত্থান এবং নতুন গণতান্ত্রিক সরকারের আগমন সবকিছুর প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন তিনি। অবশেষে নানা বিতর্ক ও রাজনৈতিক সমীকরণের মধ্য দিয়ে শেষ হলো তাঁর রাষ্ট্রপতি অধ্যায়।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সর্বাধিক জনপ্রিয়

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সাম্প্রতিক মন্তব্য

- বিজ্ঞাপন-spot_img
error: Content is protected !!