২০০২ সালের সেই ভয়াবহ অক্ষরধাম মন্দির হামলার ক্ষত আজও দগদগে। কিন্তু সেই মামলার তদন্ত আর বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠল সাম্প্রতিক এক আদালতের রায়ে। দীর্ঘ ৬ বছর কারাগারে বন্দি থাকার পর অবশেষে নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে মুক্তি পেলেন তিন মুসলিম ব্যক্তি। গুজরাটের আহমেদাবাদে বিশেষ সন্ত্রাস দমন আদালত (POTA Court) এই রায় ঘোষণা করেছে।
কারা এই খালাসপ্রাপ্ত ব্যক্তি?
আদালতের রায়ে যে তিনজনকে নির্দোষ ঘোষণা করা হয়েছে তারা হলেন: ১. আবদুল রশিদ সুলেমান আজমেরি ২. মুহাম্মদ ফারুক মুহাম্মদ হাফেজ শেখ ৩. মুহাম্মদ ইয়াসিন (ওরফে ইয়াসিন ভাট)
দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর গত সপ্তাহে এই রায় আসে। তাদের পরিবারগুলো এই সংবাদে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে। তাদের মতে, দেরিতে হলেও সত্যের জয় হয়েছে।
আদালতের রায়ে যা বলা হয়েছে
আহমেদাবাদের বিশেষ আদালত তার পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে নতুন কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ মেলেনি। মূলত ২০১৪ সালে সুপ্রিম কোর্ট এই মামলার অন্যান্য অভিযুক্তদের খালাস দেওয়ার সময় যে যুক্তিগুলো দিয়েছিল, বর্তমান রায়েও সেই নজির অনুসরণ করা হয়েছে।
আদালত স্পষ্ট করে বলেছে, তদন্তকারী সংস্থা এমন কোনো জোরালো তথ্য দিতে পারেনি যা দিয়ে এই তিনজনকে অপরাধী প্রমাণ করা যায়। ফলে তাদের তাৎক্ষণিক মুক্তির নির্দেশ দেওয়া হয়।
প্রবাসে থেকেও ‘পলাতক’ আসামী!
এই মামলার সবচেয়ে অবাক করা দিক হলো আজমেরি এবং হাফেজ শেখের বিষয়টি। ২০০২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর যখন অক্ষরধাম মন্দিরে হামলা হয়, তখন তারা দুজনেই কাজের প্রয়োজনে সৌদি আরবে অবস্থান করছিলেন। অথচ তদন্তকারী সংস্থা তাদের ‘পলাতক’ হিসেবে তালিকায় রেখেছিল। ২০১৯ সালে তারা দেশে ফেরার পর বিমানবন্দর থেকেই ক্রাইম ব্রাঞ্চ তাদের গ্রেপ্তার করে। কোনো অপরাধ না করেও শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে তাদের জীবনের ৬টি বছর অন্ধাকারে কাটল।
সুপ্রিম কোর্টের আগের সেই পর্যবেক্ষণ
উল্লেখ্য যে, ২০১৪ সালে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত (Supreme Court) এই মামলার মূল অভিযুক্তদের খালাস দিয়েছিল। তখন আদালত গুজরাট পুলিশের তদন্তের তীব্র সমালোচনা করে বলেছিল যে, তদন্তে স্বচ্ছতার অভাব ছিল এবং নির্দোষ ব্যক্তিদের ফাঁসানো হয়েছে। সেই সময় অনেকের মৃত্যুদণ্ডও বাতিল করা হয়েছিল। বর্তমান রায়টি সেই আগের রায়েরই ধারাবাহিকতা।
জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের ভূমিকা
এই দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ। সংগঠনটির প্রধান মাওলানা আরশাদ মাদানী এই রায়কে ‘ন্যায়বিচারের বিজয়’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তবে তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, “ব্যবস্থাগত ত্রুটির কারণে নির্দোষ মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় কারাগারের ভেতরে নষ্ট হওয়া খুবই দুঃখজনক।” তিনি ভবিষ্যতে যেন আর কাউকে বিনা বিচারে বা মিথ্যা অভিযোগে জেল খাটতে না হয়, সে বিষয়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
তদন্তের মান নিয়ে বড় প্রশ্ন
২০০২ সালের হামলায় ৩০ জনের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। এমন একটি স্পর্শকাতর মামলায় বারবার তদন্তের ত্রুটি ধরা পড়া দেশের বিচারব্যবস্থা ও তদন্তকারী সংস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। নিরপরাধ মানুষ জেল খাটার ফলে আসল অপরাধীরা আড়ালে থেকে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
এই রায় আবারও প্রমাণ করল যে, সঠিক তদন্ত আর প্রমাণের অভাবে দীর্ঘ সময় কাউকে আটকে রাখা মানবাধিকারের লঙ্ঘন। ভুক্তভোগী পরিবারগুলো এখন এই ক্ষতি কাটিয়ে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছে।








