সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুক ব্যবহারকারীদের জন্য আসছে বড় এক পরিবর্তনের খবর। এতদিন ফেইসবুক পোস্টে যত খুশি ওয়েবসাইটের লিংক শেয়ার করা যেত বিনামূল্যে। কিন্তু এখন সেই সাধারণ সুবিধাটির ওপর সীমা বা লিমিট নির্ধারণ করার কথা ভাবছে মেটা। কোম্পানিটি এমন একটি বিষয় নিয়ে পরীক্ষা চালাচ্ছে, যেখানে মাসে নির্দিষ্ট সংখ্যার বেশি লিংক শেয়ার করতে হলে ব্যবহারকারীকে গুনতে হতে পারে মোটা অঙ্কের টাকা।
মেটার নতুন পরীক্ষা ও সাবস্ক্রিপশন ফি
যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের নির্দিষ্ট কিছু ব্যবহারকারী সম্প্রতি ফেইসবুক থেকে একটি নোটিফিকেশন পেয়েছেন। সেখানে বলা হয়েছে, সাবস্ক্রিপশন ছাড়া ফেইসবুক পোস্টে কেবল নির্দিষ্ট সংখ্যক লিংক শেয়ার করা যাবে। এই সুবিধার জন্য প্রতি মাসে প্রায় ৯.৯৯ পাউন্ড (বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ১৫০০ টাকার বেশি) খরচ হতে পারে।
মেটার একজন মুখপাত্র বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, এটি একটি সীমিত সময়ের পরীক্ষা। তারা যাচাই করে দেখছেন যে, বেশি পরিমাণে লিংক শেয়ার করার সুবিধাটি ‘মেটা ভেরিফাইড’ সাবস্ক্রাইবারদের জন্য বাড়তি কোনো গুরুত্ব যোগ করে কি না।
১৬ ডিসেম্বর থেকে নতুন নিয়ম?
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বিশেষজ্ঞ ম্যাট নাভারা নিজেও এই পরীক্ষার নোটিফিকেশন পেয়েছেন। তাকে জানানো হয়েছে, ১৬ ডিসেম্বর থেকে তিনি মাসে কেবল দুটি লিংক শেয়ার করতে পারবেন। যদি এর বেশি লিংক শেয়ার করতে হয়, তবে তাকে পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে হবে।
নাভারার মতে, ফেইসবুক এখন কেবল বিজ্ঞাপন থেকে আয় করে সন্তুষ্ট নয়। তারা এখন প্ল্যাটফর্মের সাধারণ বা মৌলিক ফিচারের ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপ করে ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে সরাসরি অর্থ নেওয়ার পথ খুঁজছে।
সাধারণ ফিচারের ওপর কেন এই কড়াকড়ি?
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি আসলে কোনো পরিচয় যাচাই বা সিকিউরিটির বিষয় নয়। বরং ফেইসবুকে টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় ফিচারগুলোকে সাবস্ক্রিপশন প্যাকেজের ভেতরে আটকে দিতে চাইছে কোম্পানিটি। আগে কোনো পোস্ট কত মানুষের কাছে পৌঁছাবে তা অ্যালগরিদমের ওপর নির্ভর করত, কিন্তু এখন বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাতে বা বেশি লিংক শেয়ার করে নিজের ওয়েবসাইটে ট্রাফিক নিতে হলে অর্থ দিতে হবে।
কাদের ওপর প্রভাব পড়বে বেশি?
বর্তমানে এই পরীক্ষাটি মূলত ফেইসবুকের ‘প্রফেশনাল মোড’ ব্যবহারকারী নির্দিষ্ট সংখ্যক কনটেন্ট নির্মাতা ও পেজের ওপর চালানো হচ্ছে। তবে স্বস্তির খবর হলো, সংবাদ মাধ্যম বা প্রকাশকরা আপাতত এই নিয়মের আওতাভুক্ত নয়।
তবুও অনেক কন্টেন্ট ক্রিয়েটর এবং ছোট ব্যবসায়ী যারা তাদের ওয়েবসাইটের ট্রাফিকের জন্য ফেইসবুকের ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য এটি একটি বড় ধাক্কা হতে পারে। যদি এই নিয়ম স্থায়ীভাবে চালু হয়, তবে ব্যবসায়িক প্রচারণার খরচ অনেক বেড়ে যাবে।
মেটা ভেরিফাইড ও ব্যবহারকারীদের ক্ষোভ
ইতোমধ্যেই ‘মেটা ভেরিফাইড’ সাবস্ক্রিপশনের কারণে অনেক ব্যবহারকারী ও নির্মাতা ক্ষুব্ধ। ব্লু টিক বা নীল চিহ্ন এবং উন্নত কারিগরি সহায়তার জন্য মাসে ১৪.৯৯ ডলার খরচ করতে হয়। এর ওপর এখন যদি লিংক শেয়ারের মতো সাধারণ কাজকেও পেইড ফিচারে পরিণত করা হয়, তবে ফেইসবুক তার জনপ্রিয়তা হারাতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকেই।
এক নজরে নতুন পরিবর্তনের মূল দিকগুলো:
- লিংক শেয়ারের সীমা: মাসে মাত্র দুটি লিংক শেয়ার করা যাবে বিনামূল্যে।
- সাবস্ক্রিপশন ফি: অতিরিক্ত লিংকের জন্য মাসে প্রায় ৯.৯৯ পাউন্ড বা তার বেশি খরচ হতে পারে।
- লক্ষ্যমাত্রা: প্রফেশনাল মোড ব্যবহারকারী ও নির্দিষ্ট কন্টেন্ট ক্রিয়েটর।
- উদ্দেশ্য: সরাসরি ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে রাজস্ব বা আয় বাড়ানো।
বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?
ম্যাট নাভারা বলেন, “আপনি যদি একজন ব্যবসায়ী হন এবং ফেইসবুক যদি আপনার ওয়েবসাইটে ট্রাফিক পাওয়ার প্রধান উৎস হয়, তবে আপনার জন্য বার্তাটি পরিষ্কার সুবিধা পেতে হলে এখন থেকে দাম দিতে হবে।” ফেইসবুক যে ধীরে ধীরে অর্থের বিনিময়ে সুবিধা দেওয়ার দিকে যাচ্ছে, এই নোটিফিকেশন তারই স্পষ্ট প্রমাণ।
ফেইসবুকের এই নতুন পদক্ষেপ ডিজিটাল মার্কেটিং এবং কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য এক নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে যাচ্ছে। সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য প্ল্যাটফর্মটি কতটা উন্মুক্ত থাকবে, তা এখন বড় প্রশ্ন। মেটার এই পরীক্ষা যদি সফল হয় এবং বিশ্বজুড়ে চালু হয়, তবে বিনামূল্যে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের যুগ হয়তো শেষ হতে চলেছে।








