চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে (ইপিজেড) ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর দৃশ্য যেন যুদ্ধক্ষেত্র। ভবনের দেয়াল-ছাদ ধসে পড়েছে, কাচের টুকরো ছড়িয়ে আছে চারদিকে। লোহার গ্রিলগুলো দুমড়ে-মুচড়ে আছে। গতকালও যেখানে ব্যস্ততা ছিল, আজ সেখানে কেবল ছাই আর ধোঁয়া। এই আগুন কেড়ে নিয়েছে শত শত শ্রমিকের জীবিকার একমাত্র অবলম্বন।
১৭ ঘণ্টার ভয়ংকর আগুন
বৃহস্পতিবার দুপুরে ৮ তলা ভবনের ৭ তলায় আগুন লাগে। প্রায় ১৭ ঘণ্টা পর শুক্রবার সকালে ফায়ার সার্ভিস আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। আগুনে পুড়ে গেছে সুতা, তুলা, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও মূল্যবান যন্ত্রপাতি। আগুনের তাপ এতটাই তীব্র ছিল যে, দূর থেকেও তা অনুভূত হয়েছে। বারবার বিস্ফোরণের শব্দ আতঙ্ক ছড়িয়েছে এলাকাজুড়ে। আগুন নিয়ন্ত্রণে সেনা ও নৌবাহিনীর সদস্যরাও যোগ দেন।
শ্রমিকদের আহাজারি “এখন আমাদের চলবে কীভাবে?”
ভবনে ছিল দুটি কারখানার গুদাম, অ্যাডামস ক্যাপস ও জিহং মেডিকেল। প্রায় ৫০০ শ্রমিক সেখানে কাজ করতেন। আগুনের পর থেকে তারা সবাই কর্মহীন।
শ্রমিক শফিক আহমেদ কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন,
“আমার কারখানা পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এখন কোনো কাজ নেই। পরিবার নিয়ে কীভাবে চলব জানি না।”
তাঁর মতো আরও শত শত শ্রমিকের চোখে এখন একটাই প্রশ্ন, আগামীকাল কী হবে?
মালিকপক্ষের নীরবতা ও অনিশ্চয়তা
অগ্নিকাণ্ডের পর শ্রমিকদের বেতন-ভাতা কিংবা পুনরায় কাজ শুরু নিয়ে এখনো কোনো ঘোষণা দেয়নি মালিকপক্ষ। অ্যাডামস ক্যাপসের ফিন্যান্স ম্যানেজার রিফাত হাসান বলেন,
“বেতন বা ভাতা নিয়ে কিছু সিদ্ধান্ত হয়নি। আগুনে সব নষ্ট হয়ে গেছে। এখন কীভাবে শুরু করব, তা জানি না।”
অন্যদিকে চীনা প্রতিষ্ঠান জিহং মেডিকেলের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। কবে তারা কারখানা পুনরায় চালু করবে, সেটিও অনিশ্চিত।
তদন্ত কমিটি গঠন, দায় নিরূপণে উদ্যোগ
চট্টগ্রাম ইপিজেড কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। নির্বাহী পরিচালক আব্দুস সোবহান জানান,
“আগুনের কারণ ও ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে কাজ চলছে। বিশেষজ্ঞরা ভবনের নিরাপত্তা পরীক্ষা করবেন। ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা বাড়াতে পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, যাতে এমন দুর্ঘটনা আর না ঘটে।”
ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনো অজানা
ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, আগুনে অন্তত কয়েক কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পুড়ে যাওয়া ভবন এখন প্রবেশের অযোগ্য। ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে দেখা হবে কোন যন্ত্রপাতি উদ্ধারযোগ্য। তবে শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
শ্রমিকদের জন্য সরকারি উদ্যোগের দাবি
অগ্নিকাণ্ডের পর শ্রমিক সংগঠনগুলো সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তাদের দাবি,
- কর্মহীন শ্রমিকদের পুনর্বাসন করতে হবে
- জরুরি সহায়তা ও বকেয়া বেতন নিশ্চিত করতে হবে
- ইপিজেডে অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে
চট্টগ্রাম ইপিজেড বাংলাদেশের অন্যতম বড় রপ্তানি কেন্দ্র। এখানকার প্রতিটি শ্রমিক দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাই তাদের জীবন ও নিরাপত্তা রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি।
আগামীর পথ, পুনর্গঠন ও আশার আলো
ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও কেউ কেউ আশার কথা বলছেন। শ্রমিক হাসিনা বেগম বলেন,
“জীবন থেমে থাকে না। কারখানা আবার চালু হলে আমরাও ফিরব কাজের জায়গায়।”
অগ্নিকাণ্ডের এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা ইপিজেডে নতুন নিরাপত্তা নীতিমালা প্রণয়নে অনুপ্রেরণা হতে পারে। সঠিক তদন্ত, ক্ষতিপূরণ এবং শ্রমিক পুনর্বাসনের মাধ্যমে হয়তো চট্টগ্রাম ইপিজেড আবার ফিরবে তার আগের প্রাণচাঞ্চল্যে।
চট্টগ্রাম ইপিজেডের এই অগ্নিকাণ্ড শুধু একটি ভবনের ক্ষতি নয়, এটি শত শত পরিবারের জীবিকা হারানোর গল্প। শ্রমিকদের মুখে এখনো হতাশার ছাপ। সময়ই বলে দেবে এই ভস্মীভূত স্বপ্ন আবার নতুন করে জেগে উঠবে কি না।








