দীর্ঘ রাজনৈতিক জল্পনা–কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে বিএনপি তাদের নির্বাচনী অভিযাত্রা শুরু করেছে দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে সামনে রেখে। দলটির পক্ষ থেকে সোমবার ঘোষণা করা হয়েছে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খালেদা জিয়া প্রার্থী হচ্ছেন ফেনী-১, বগুড়া-৭ এবং দিনাজপুর-৩ আসনে।
একই সঙ্গে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও বগুড়া-৬ আসনে প্রার্থী হবেন।
দলের শীর্ষ নেতাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণে নতুন উদ্দীপনা
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঠাকুরগাঁও-১ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।
দলটি সোমবার মোট ২৩৭টি আসনে প্রার্থী ঘোষণা করেছে, যা তাদের নির্বাচনী প্রস্তুতির একটি বড় ধাপ।
এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার অবসান হয়েছে এবং দলের ভেতর নতুন করে আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছে।
দলীয় সূত্র জানায়, শুরুতে খালেদা জিয়ার প্রার্থী হওয়া নিয়ে কিছুটা সংশয় ছিল, কারণ তিনি শারীরিকভাবে অসুস্থ। তবে পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তাঁকে নির্বাচনে অংশ নিতে অনুরোধ জানানো হয় এবং শেষ পর্যন্ত তিনি রাজি হন। এতে দলীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে উৎসবের আমেজ তৈরি হয়েছে।
তারেক রহমানের নেতৃত্বে প্রার্থিতা চূড়ান্ত
প্রার্থী ঘোষণার আগে লন্ডনে অবস্থানরত তারেক রহমানের সভাপতিত্বে দলের স্থায়ী কমিটির দীর্ঘ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় পাঁচ ঘণ্টাব্যাপী সেই বৈঠকে প্রার্থীদের নাম চূড়ান্ত করা হয়।
দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৩৭টির নাম সোমবার ঘোষণা করা হয়েছে। বাকি ৬৩টি আসনে প্রার্থীর নাম পরবর্তীতে প্রকাশ করা হবে।
দলের নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, এই নির্বাচনে বিএনপির সামনে চ্যালেঞ্জ থাকলেও, খালেদা জিয়ার অংশগ্রহণ নির্বাচনের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে তুলবে।
প্রার্থী তালিকায় শীর্ষ নেতারা
ঘোষিত তালিকা অনুযায়ী, বিএনপির চেয়ারপারসন, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও মহাসচিব ছাড়াও স্থায়ী কমিটির ১২ জন সদস্য নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।
তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন:
খন্দকার মোশাররফ হোসেন (কুমিল্লা-১), মির্জা আব্বাস (ঢাকা-৮), গয়েশ্বর চন্দ্র রায় (ঢাকা-৩), আবদুল মঈন খান (নরসিংদী-২), আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী (চট্টগ্রাম-১০), সালাহউদ্দিন আহমদ (কক্সবাজার-১) এবং হাফিজ উদ্দিন আহমদ (ভোলা-৩)।
স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ নেতা জমির উদ্দিন সরকার, সেলিমা রহমান ও নজরুল ইসলাম খান এবার নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন না। তবে জমির উদ্দিন সরকারের স্থলে তাঁর ছেলে মোহাম্মদ নওশাদ জমির পঞ্চগড়-১ আসনে প্রার্থী হয়েছেন।
ঢাকা ও অন্যান্য এলাকায় প্রার্থী
ঢাকার ২০টি আসনের মধ্যে ১৩টিতে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে।
বাকি ৭টি আসন এখনো খালি রাখা হয়েছে। দলীয় সূত্র বলছে, এর মধ্যে কিছু আসন জোট ও সমমনা দলগুলোর জন্য সংরক্ষিত থাকবে।
বিশেষ করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), গণতন্ত্র মঞ্চ, বিজেপি ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সঙ্গে সমঝোতা হলে সেসব আসন তাদের দেওয়া হতে পারে।
ঢাকা-১৪ আসনে এবার বিশেষভাবে আলোচিত প্রার্থী ‘মায়ের ডাক’ সংগঠনের সানজিদা ইসলাম।
গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁর প্রার্থী হওয়া রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
নারীদের অংশগ্রহণে ইতিবাচক বার্তা
ঘোষিত ২৩৭ প্রার্থীর মধ্যে ১০ জন নারী প্রার্থী রয়েছেন, যাদের মধ্যে অন্যতম খালেদা জিয়া নিজে।
এ ছাড়া সিলেট-২ আসনে তাহসিনা রুশদীর, ফরিদপুর-২ আসনে শামা ওবায়েদ ইসলাম, ঝালকাঠি-২ আসনে ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো, ঢাকা-১৪ আসনে সানজিদা ইসলামসহ আরও কয়েকজন নারী প্রার্থী হয়েছেন।
রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর এ সিদ্ধান্তকে অনেকে বিএনপির ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
মাঠে নামছেন প্রার্থীরা, তৈরি হচ্ছে উৎসবের পরিবেশ
বিএনপি নেতারা বলছেন, এই ঘোষণা শুধু প্রার্থীদের নয়, নির্বাচনী উৎসবের সূচনাও বটে।
দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “দীর্ঘ সময় মানুষ ভোট দিতে পারেনি। এবার বিএনপির প্রার্থী ঘোষণায় নতুন করে ভোটের উচ্ছ্বাস তৈরি হবে।”
তিনি আরও বলেন, “মানুষের ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে বিএনপি এই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। মাঠে ইতিমধ্যে অনেকে কাজ শুরু করেছেন। শিগগিরই সারা দেশে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হবে।”
কিছু আসনে অসন্তোষ, তবুও আশাবাদী বিএনপি
ঘোষিত তালিকায় কিছু মনোনয়ন প্রত্যাশী প্রার্থী বাদ পড়ায় কিছু এলাকায় অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
যেমন—মাদারীপুর-১ ও চট্টগ্রাম-৪ আসনে মনোনয়ন নিয়ে বিক্ষোভ হয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, এসব সমস্যা সাময়িক এবং দ্রুত সমাধান করা হবে।
দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, স্থায়ী কমিটি প্রয়োজনে প্রার্থিতা পরিবর্তন করতে পারবে।
তবে সার্বিকভাবে বিএনপি নেতারা আশাবাদী যে এই নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরে আসবে।
বিএনপি এখন আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনের পথে যাত্রা শুরু করেছে।
দীর্ঘ সময় পর খালেদা জিয়ার নির্বাচনে অংশগ্রহণ শুধু রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেই নয়, সাধারণ ভোটারদের মাঝেও নতুন প্রত্যাশা জাগিয়েছে।
তারেক রহমানের নেতৃত্বে এই নির্বাচনী প্রচারণা দেশের রাজনীতিতে একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।








