বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনীর সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা এবং বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। দীর্ঘদিন বিদেশে পলাতক থাকার পর আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের সহযোগিতায় তাকে আটক করা হয়।
রোববার (১৪ জুন ২০২৬) জাতীয় সংসদে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এই ঐতিহাসিক গ্রেফতারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি একে বাংলাদেশ পুলিশের একটি বিরাট সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এর মাধ্যমে দেশ বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে সক্ষম হবে।
সাবেক এই পুলিশ প্রধানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও পাসপোর্ট জালিয়াতিসহ দেশে একাধিক মামলা রয়েছে। এমতাবস্থায় তাকে ঠিক কী উপায়ে এবং কতদিনের মধ্যে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
দুবাই থেকে কোন প্রক্রিয়ায় দেশে ফিরিয়ে আনা হবে?
জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাবেক এই পুলিশ কর্মকর্তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার আইনি ও আন্তর্জাতিক এক্সট্রাডিশন (অপরাধী প্রত্যর্পণ) প্রক্রিয়ার একটি স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়েছেন:
- ৩০ দিনের সময়সীমা: গত ১২ জুন বাংলাদেশ পুলিশ দুবাই থেকে একটি অফিশিয়াল মেইল পেয়ে বেনজীর আহমেদের গ্রেফতারের বিষয়টি নিশ্চিত হয়। এনসিবি আবুধাবি জানিয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ‘ইউএই ফেডারেল ল নাম্বার ৩৯ (২০০৬)’ অনুযায়ী, গ্রেফতারের তারিখ থেকে পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক ‘এক্সট্রাডিশন রিকোয়েস্ট’ বা অপরাধী প্রত্যর্পণের আবেদন পাঠাতে হবে।
- স্বরাষ্ট্র ও কূটনৈতিক চ্যানেলের সমন্বয়: ইতিমধ্যেই দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় মামলা, আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও তদন্ত সংক্রান্ত যাবতীয় দলিলাদি প্রস্তুত করেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এই প্রত্যর্পণ প্রস্তাব অনুমোদন করে অতি দ্রুত কূটনৈতিক চ্যানেলে এনসিবি আবুধাবির কাছে পাঠানো হবে।
- এনসিবি ঢাকার ফলোআপ: বর্তমানে এনসিবি ঢাকা রেড নোটিশ প্রকাশ, আন্তর্জাতিক সমন্বয় এবং গ্রেফতার পরবর্তী ফলোআপ কার্যক্রমগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে সম্পন্ন করছে, যাতে দ্রুততম সময়ে তাকে বিমানের ফ্লাইটে ঢাকায় আনা যায়।
অন্তর্বর্তী সরকারের তৎপরতা ও দুদকের মামলা
২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নিলে বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর কার্যক্রমে ব্যাপক গতি আসে। এর আগে ২০২৪ সালেই তিনি দেশ ছেড়ে দুবাই পালিয়ে যান। পরবর্তীতে ২০২৫ সালে বর্তমান সরকারের আমলে তার বিরুদ্ধে ইন্টারপোলে রেড নোটিশ জারির আবেদন পাঠানো হয়েছিল।
রোববার দুদকের পক্ষ থেকে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থার জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আকতারুল ইসলাম জানান, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে বর্তমানে দুদকের দায়ের করা ৬টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের একটি মামলায় ইতিমধ্যেই চার্জশিট দেওয়া হয়েছে এবং আদালতে বিচার চলছে। এছাড়া পাসপোর্ট জালিয়াতিসহ আরও ৫টি মামলার তদন্ত কাজ চলমান রয়েছে।
সম্পত্তি ক্রোক: আদালতের নির্দেশে ইতিমধ্যেই বেনজীর আহমেদের মালিকানাধীন গোপালগঞ্জের সাভানা রিসোর্ট ও ন্যাচারাল পার্কের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে জেলা প্রশাসন। এছাড়া তার বিপুল পরিমাণ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও সম্পত্তি ফ্রিজ করা হয়েছে।
এক নজরে বেনজীর আহমেদের আলোচিত ও বিতর্কিত অতীত
বেনজীর আহমেদ বাংলাদেশ পুলিশের অন্যতম ক্ষমতাধর এবং দীর্ঘ মেয়াদে শীর্ষ পদে থাকা কর্মকর্তা ছিলেন। তবে দায়িত্ব পালনকালে তার নানা কর্মকাণ্ড এবং রাজনৈতিক বক্তব্য তাকে বারবার কঠোর সমালোচনার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে:
- র্যাব ও আইজিপি পদের মেয়াদ: তিনি ২০১৫ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত র্যাবের মহাপরিচালক (DG) হিসেবে এবং ২০২০ থেকে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
- মার্কিন নিষেধাজ্ঞা: র্যাবের প্রধান থাকাকালীন ‘বিচারবহির্ভূত হত্যা’ এবং মারাত্মক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। যদিও তিনি সবসময় বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে ‘সস্তা প্রচারণা’ বলে উড়িয়ে দিতেন।
- বোট ক্লাব বিতর্ক: ২০২১ সালে বোট ক্লাবের একটি অপ্রীতিকর ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রকাশ পায় যে, সরকারি কর্মকর্তা হয়েও তিনি একটি বিলাসবহুল বাণিজ্যিক ক্লাবের সভাপতি। একজন পুলিশ অফিসারের এমন বিপুল অর্থের উৎস নিয়ে তখন সংসদেও প্রশ্ন উঠেছিল।
- রাজনৈতিক ভূমিকা: ২০১৩ সালে শাপলা চত্বরে হেফাজতের সমাবেশ ছত্রভঙ্গ করা এবং গুলশানে খালেদা জিয়ার বাসার সামনে বালুর ট্রাক দিয়ে রাস্তা আটকে রাখার ঘটনায় ডিএমপি কমিশনার হিসেবে বেনজীর আহমেদের ভূমিকা চরম রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল।
আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়েও শেষ রক্ষা হলো না একসময়ের এই প্রতাপশালী পুলিশ কর্মকর্তার। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সব ধরনের আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে খুব দ্রুতই বেনজীর আহমেদকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে। ডিজিটাল যুগে এই হাই-প্রোফাইল মামলার প্রতিটি আপডেট জানতে আমাদের পোর্টালের সাথেই থাকুন।








