হটলাইনঃ +৮৮০ ৯৬১৩ ০০০ ২০০ |
সোমবার, জুন ২২, ২০২৬
- বিজ্ঞাপন-spot_img
Homeজাতীয়অপরাজিত থেকেই বিদায় নিলেন ‘আপোষহীন নেত্রী’ বেগম খালেদা জিয়া
spot_img

অপরাজিত থেকেই বিদায় নিলেন ‘আপোষহীন নেত্রী’ বেগম খালেদা জিয়া

বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে আজ এক গভীর শোকের দিন। দীর্ঘ অসুস্থতা আর জীবনের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে মহান আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে চলে গেলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। আজ ৩০ ডিসেম্বর, সোমবার সকাল ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।

তাঁর এই প্রয়াণে কেবল একটি রাজনৈতিক দলের নয়, বরং বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি বিশাল অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটলো। যিনি ছিলেন আপোষহীনতার প্রতীক, গণতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরী।

সাধারণ গৃহবধূ থেকে রাজনীতির ধ্রুবতারা

১৯৪৫ সালে অবিভক্ত ভারতের জলপাইগুড়িতে জন্ম নেওয়া বেগম খালেদা জিয়ার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে শান্ত ও সাধারণভাবে। ১৯৬০ সালে তিনি তৎকালীন সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তখন তিনি ছিলেন পুরোদস্তুর একজন গৃহবধূ। স্বামী আর সন্তানদের নিয়েই ছিল তাঁর জগত। কিন্তু ১৯৮১ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড তাঁর জীবনের মোড় পুরোপুরি ঘুরিয়ে দেয়।

স্বামীর মৃত্যুর পর বিএনপির অস্তিত্ব যখন সংকটে, ঠিক তখনই দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের অনুরোধে ১৯৮২ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি রাজনীতির কঠিন পথে পা বাড়ান। যেই হাতে সংসার সামলেছেন, সেই হাতেই তুলে নিলেন দলের পতাকাকে। এরপর ১৯৮৪ সালে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন এবং আমৃত্যু এই পদে আসীন ছিলেন।

স্বৈরাচার পতন ও ‘দেশনেত্রী’ উপাধি

রাজনীতিতে আসার পরপরই এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তিনি হয়ে ওঠেন প্রধান মুখ। ১৯৮৩ সালে তাঁর নেতৃত্বেই গঠিত হয় সাত দলীয় জোট। রাজপথে তাঁর আপোষহীন নেতৃত্ব তাকে জনগণের খুব কাছে নিয়ে যায়। স্বৈরাচারের সাথে কোনো প্রকার আপোষ না করার কারণে জনগণ তাকে ভালোবেসে ‘আপোষহীন নেত্রী’ ও ‘দেশনেত্রী’ উপাধিতে ভূষিত করে। দীর্ঘ ৯ বছরের সংগ্রামের পর ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারের পতন ঘটে এবং গণতন্ত্রের বিজয় অর্জিত হয়।

দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও উন্নয়নের রূপকার

১৯৯১ সালের নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি জয়লাভ করে এবং তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। এটি ছিল দেশের নারী জাগরণের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তাঁর শাসনামলে নারী শিক্ষা, কৃষি এবং অর্থনীতির সংস্কারে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে। পরবর্তীতে ২০০১ সালে তিনি আবারও প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। তিনি তিনবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

নির্বাচনে ‘অপরাজিত’ এক কিংবদন্তি

বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বিরল রেকর্ডের অধিকারী। তিনি তাঁর জীবদ্দশায় অংশ নেওয়া কোনো নির্বাচনেই পরাজিত হননি। তিনি যখনই যেখানে দাঁড়িয়েছেন, পাঁচটি আসনে একসঙ্গে নির্বাচন করেও সবকটিতে জয়লাভ করেছেন। ফেনী, বগুড়া কিংবা ঢাকা সব এলাকার মানুষ তাকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত করেছে। মৃত্যু তাকে থামিয়ে দিলেও ভোটের মাঠে তিনি চিরকাল ‘অপরাজিত’ হয়েই রইলেন।

১/১১, কারাবাস ও শেষ জীবনের সংগ্রাম

বেগম খালেদা জিয়ার জীবনের শেষ দুই দশক ছিল অত্যন্ত সংগ্রামের। ১/১১-এর সময় তাকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর ২০১০ সালে তাঁকে তাঁর দীর্ঘদিনের স্মৃতিবিজড়িত মঈনুল রোডের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়, যা ছিল তাঁর জন্য মানসিকভাবে বড় আঘাত।

২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি দুর্নীতি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে তিনি কারাগারে যান। দীর্ঘ সময় তিনি নির্জন কারাগারে অসুস্থ অবস্থায় দিন কাটিয়েছেন। পরিবারের বারবার আবেদনের পরেও উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশে যেতে দেওয়া হয়নি। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর তিনি পুরোপুরি মুক্তি পান। এরপর চলতি বছরের (২০২৫) শুরুতে তিনি চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যে যান এবং মে মাসে দেশে ফিরে আসেন।

শেষ বিদায়

যুক্তরাজ্য থেকে ফেরার পর তিনি গুলশানের বাসভবন ‘ফিরোজা’য় ছিলেন। কিন্তু গত নভেম্বরের শেষের দিকে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে আবারও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকদের প্রাণপণ চেষ্টার পরেও আজ ৩০ ডিসেম্বর ভোরে তিনি না ফেরার দেশে পাড়ি জমান।

বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে সারাদেশে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তাঁর রাজনৈতিক সহকর্মী, অনুসারী এবং সাধারণ জনগণ আজ শোকে মুহ্যমান। বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে তাঁর অবদান জাতি চিরদিন শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে। আমরা তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করি।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সর্বাধিক জনপ্রিয়

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সাম্প্রতিক মন্তব্য

- বিজ্ঞাপন-spot_img
error: Content is protected !!