বুলগেরিয়ার সেই রহস্যময়ী নারী, যাকে বিশ্ব চেনে ‘বাবা ভাঙ্গা’ নামে, মৃত্যুর প্রায় তিন দশক পরেও তিনি ফের খবরের শিরোনামে। কথিত আছে, এই অন্ধ নারী জীবদ্দশায় যা যা বলে গিয়েছিলেন, তার অনেকটাই নাকি পরবর্তীকালে অক্ষরে অক্ষরে মিলে গেছে। এবার নতুন বছরকে সামনে রেখে ফের আলোচনায় উঠে এসেছে বাবা ভাঙার ভবিষ্যদ্বাণী ২০২৬।
সোশ্যাল মিডিয়া এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের দাবি অনুযায়ী, ২০২৬ সাল নিয়ে এক ভয়াবহ সতর্কবার্তা দিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। তার গণনা অনুসারে, এই বছরটি হতে পারে পৃথিবীর জন্য ‘যুদ্ধ ও ধ্বংসের বছর’। এমনকি বিশ্বজুড়ে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজে ওঠার আশঙ্কাও নাকি তিনি প্রকাশ করেছিলেন।স্বাভাবিকভাবেই, বর্তমান বিশ্বের অস্থির পরিস্থিতিতে এমন দাবি নতুন করে মানুষের মনে আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে।
আজকের এই প্রতিবেদনে আমরা জানবো কে এই বাবা ভাঙ্গা, ২০২৬ সাল নিয়ে ঠিক কী রটেছে এবং এই সব দাবির পেছনে আদৌ কোনো সত্যতা আছে কি না।
২০২৬ সাল নিয়ে কী বলেছিলেন রহস্যময়ী বাবা ভাঙ্গা?
বর্তমানে ইন্টারনেটে ভাইরাল হওয়া বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, বাবা ভাঙ্গা বলে গিয়েছিলেন যে ২০২৬ সালে বিশ্ব এক বড় ধরনের সংঘাতের মুখোমুখি হবে। এই সংঘাত এতটাই ভয়াবহ রূপ নিতে পারে যে, একে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরু হিসেবেও গণ্য করা হতে পারে।
শুধু যুদ্ধই নয়, কিছু কিছু সূত্র দাবি করছে যে, তিনি এই বছর মানুষের সঙ্গে প্রথম ভিনগ্রহী বা এলিয়েনদের যোগাযোগের সম্ভাবনার কথাও বলেছিলেন। যদিও এই দাবিগুলো কতটা তার নিজের বলা আর কতটা মানুষের মুখে মুখে রটে যাওয়া গুজব, তা নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। তবুও, ৯/১১ এর মতো বড় ঘটনার পূর্বাভাস তিনি দিয়েছিলেন বলে মানুষ তার কথাগুলো সহজে উড়িয়ে দিতে পারে না।
কে এই বাবা ভাঙ্গা? তার উত্থানের কাহিনী
বাবা ভাঙ্গার আসল নাম ভ্যানগেলিয়া পাদেভা দিমিত্রোভা। তিনি ১৯১১ সালে বর্তমান নর্থ মেসিডোনিয়ার স্ট্রমিকায় জন্মগ্রহণ করেন। তার জীবন ছিল বেশ নাটকীয়। কথিত আছে, মাত্র ১২ বছর বয়সে এক ভয়াবহ ঝড়ের কবলে পড়ে তিনি তার দৃষ্টিশক্তি হারান। কিন্তু দৃষ্টিশক্তি হারানোর পরই নাকি তার মধ্যে এক অদৃশ্য শক্তির উন্মেষ ঘটে, যার মাধ্যমে তিনি ভবিষ্যৎ দেখতে পেতেন।
১৯৯৬ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি মানুষকে ব্যক্তিগত সমস্যা থেকে শুরু করে বিশ্ব রাজনীতি নিয়ে নানা পরামর্শ ও ভবিষ্যদ্বাণী করতেন। তার এই অদ্ভুত ক্ষমতার জন্য তিনি বিশ্বব্যাপী ‘নস্ট্রাদামুস অফ দ্য বলকান’ নামেও পরিচিতি পান।
অতীত এবং ভবিষ্যতের অদ্ভুত সমীকরণ: যা মিলেছে আর যা মেলেনি
বাবা ভাঙ্গাকে নিয়ে মানুষের এই বিপুল আগ্রহের মূল কারণ হলো তার কিছু সফল পূর্বাভাস। তার অনুসারীদের দাবি, তিনি আমেরিকার ৯/১১ টুইন টাওয়ার হামলা, বারাক ওবামার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়া, চেরনোবিল পারমাণবিক বিপর্যয় এবং রাশিয়ান সাবমেরিন কুরস্ক দুর্ঘটনার মতো বড় বড় ঘটনার সঠিক পূর্বাভাস দিয়েছিলেন।
তবে তার সব কথাই যে ফলেছে, তা কিন্তু নয়। মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, তিনি ২০১০ সালে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার কথা বলেছিলেন, যা ঘটেনি। আবার ২০২৫ সালের মধ্যে কোনো এক ক্রীড়া আসরে ভিনগ্রহীদের আবির্ভাবের কথাও শোনা গিয়েছিল, যার কোনো বাস্তব ভিত্তি পাওয়া যায়নি।
তার ভবিষ্যদ্বাণীর কথিত সময়রেখা শুনলে যে কেউ চমকে উঠবেন। প্রচলিত দাবি অনুযায়ী ২০২৮ সালে মানুষ শক্তির খোঁজে শুক্র গ্রহে যাবে, ২০৩৩ সালে মেরু অঞ্চলের বরফ গলে বিশ্ব প্লাবিত হবে, এমনকি ৫০০৫ সালে মঙ্গলগ্রহের সভ্যতার সঙ্গে পৃথিবীর যুদ্ধ হবে এবং ৫০৭৯ সালে পৃথিবীর সমাপ্তি ঘটবে!
বিশেষজ্ঞদের মতামত: বিশ্বাস নাকি নিছক গুজব?
এত সব চাঞ্চল্যকর তথ্যের ভিড়ে আসল সত্যটা কী? বিশ্লেষকদের মতে, বাবা ভাঙ্গার নামে যেসব ভবিষ্যদ্বাণী বাজারে প্রচলিত আছে, তার বেশিরভাগেরই কোনো নির্ভরযোগ্য বা প্রামাণ্য ভিত্তি নেই।
তিনি নিজে কখনো কোনো বই লিখে যাননি বা তার কোনো সুনির্দিষ্ট রেকর্ড নেই। বর্তমানে যা শোনা যায়, তা মূলত লোকমুখে প্রচলিত পুরনো কথাবার্তা, সোশ্যাল মিডিয়ার গুজব এবং আধুনিক সময়ের ব্যাখ্যার এক মিশ্রণ মাত্র। তাই বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করছেন যে, বাস্তব বিশ্বের ঘটনাকে এসব ভিত্তিহীন ভবিষ্যদ্বাণীর সঙ্গে মিলিয়ে দেখাকে কোনোভাবেই বৈজ্ঞানিক বা নির্ভরযোগ্য হিসেবে ধরা ঠিক নয়।
তবুও, মানুষের অজানাকে জানার চিরন্তন আগ্রহের কারণে বাবা ভাঙ্গা আজও এক সাংস্কৃতিক আইকন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ হোক বা ভূরাজনীতি যেকোনো বড় সংকটের সামনে মানুষ তার পুরনো কথাগুলো নতুন করে ঝালিয়ে নিতে ভালোবাসে।








