ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী বিএনপি প্রার্থীদের শপথ গ্রহণ সম্পন্ন হলেও রাজনীতির মাঠ এখন উত্তপ্ত। একদিকে বিএনপির সংসদ সদস্যরা শপথ নিয়েছেন, অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এই শপথকে সরাসরি ‘জনরায়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
আসিফ মাহমুদের কড়া সমালোচনা
মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) শপথ অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পরপরই নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে একটি পোস্ট দেন আসিফ মাহমুদ। সেখানে তিনি অত্যন্ত কড়া ভাষায় লেখেন, “গণভোটের জনরায়কে প্রথম দিনেই বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে শুরু হলো নতুন সংসদের যাত্রা। এবার বিরোধী দলের সিদ্ধান্ত দেখার পালা।”
আসিফ মাহমুদের এই বক্তব্যের মূলে রয়েছে গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হওয়া গণভোট এবং ‘জুলাই জাতীয় সনদ’। এনসিপি নেতাদের দাবি, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় জুলাই সনদের সংস্কারগুলো বাস্তবায়নের দায়িত্ব এখন সংবিধান সংস্কার পরিষদের। আর এই পরিষদের সদস্য হিসেবে সংসদ সদস্যদের আলাদাভাবে শপথ নেওয়া বাধ্যতামূলক।
সংবিধান বনাম সংস্কার: সালাহউদ্দিন আহমদের পাল্টা যুক্তি
এর আগে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, বিএনপি সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন না। তিনি যুক্তি দেন যে, বর্তমানে সংবিধানে এমন কোনো শপথের বিধান নেই।
সালাহউদ্দিন আহমদের এই বক্তব্যের জবাবে আসিফ মাহমুদ ফেসবুকে পাল্টা প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি লিখেছেন, “২০২৬ সালের নির্বাচন কোন সংবিধানে ছিল জনাব সালাহউদ্দিন আহমদ?” অর্থাৎ, সংবিধানের দোহাই দিয়ে সংস্কার এড়িয়ে যাওয়াকে তিনি দ্বিচারিতা হিসেবে দেখছেন।
“সংবিধানে নেই মর্মে যদি সংবিধান সংস্কার পরিষদ সদস্য হিসেবে শপথ না নিতে চান, তাহলে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথেরও কোনো মানে নেই।”
আসিফ মাহমুদ।
সংকটের মূলে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’
এনসিপি এবং জুলাই বিপ্লবের পক্ষের শক্তির দাবি হলো, এবারের নির্বাচন শুধু সরকার গঠনের জন্য নয়, বরং রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য। গণভোটে জনগণ জুলাই সনদের সংস্কার প্রস্তাবগুলোর পক্ষে রায় দিয়েছে। তাদের মতে:
- সংসদ সদস্যদের এমপি হিসেবে শপথের পাশাপাশি সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নিতে হবে।
- এই পরিষদই সংবিধানের মৌলিক পরিবর্তনগুলো নিশ্চিত করবে।
অন্যদিকে, বিএনপি মনে করছে বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী শপথ নেওয়াই যথেষ্ট। বাড়তি কোনো পরিষদের অধীনে শপথ নেওয়া আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে।
জনগণের প্রতিক্রিয়া ও আগামী দিনের রাজনীতি
সংসদ ভবনের বাইরে সাধারণ মানুষের মধ্যে এই বিতর্ক নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই মনে করছেন, নির্বাচনের পর নতুন সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে এমন দ্বন্দ্ব দেশের স্থিতিশীলতার জন্য চ্যালেঞ্জ হতে পারে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আসিফ মাহমুদের এই বক্তব্য সংসদের ভেতরে ও বাইরে বিরোধী দলের ভূমিকার ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করবে।
নতুন সংসদের যাত্রা শুরু হলেও সংস্কার এবং সংবিধান নিয়ে বিএনপি ও এনসিপির মধ্যকার এই দূরত্ব কোথায় গিয়ে ঠেকে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। রাজপথের আন্দোলনের পর এখন কি সংসদীয় বিতর্কেও উত্তাপ ছড়াবে? উত্তর মিলবে আগামী কয়েক দিনে।








