দেশের স্বর্ণবাজারে আবারও দামের পরিবর্তন হয়েছে। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) নতুন মূল্যসূচি ঘোষণা করেছে, যা আজ থেকে দেশের বাজারে কার্যকর হয়েছে। সর্বোচ্চ মানের ২২ ক্যারেট সোনার ভরি প্রতি দাম আবারও বেড়ে নতুন রেকর্ড ছুঁয়েছে। খুচরা বাজারে ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক স্বর্ণবাজার ও ডলার–সংকটের কারণে স্বর্ণের দাম স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হচ্ছে না, ফলে দেশীয় বাজারে প্রায় প্রতিদিনই দামের ওঠানামা দেখা যাচ্ছে।
আজকের বাজারদর (ভরি প্রতি)
আজ দেশের স্বর্ণবাজারে নতুন মূল্যতালিকা অনুযায়ী দর নির্ধারণ করা হয়েছে নিম্নরূপঃ
| ক্যারেট | ভরি প্রতি দাম |
|---|---|
| ২২ ক্যারেট | ১,৭১,৬০১ টাকা |
| ২১ ক্যারেট | ১,৬৩,৭৯৮ টাকা |
| ১৮ ক্যারেট | ১,৪০,৪০০ টাকা |
| ট্র্যাডিশনাল (সনাতনী) | ১,১৭,২২০ টাকা |
এর আগে গত দফায় ২২ ক্যারেট সোনার দাম ছিল ভরি প্রতি ১,৬৯,৯২১ টাকা। নতুন দামে ভরি প্রতি প্রায় ১,৬৮০ টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে।
বাজুসের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের মূল্যবৃদ্ধি, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, ডলার–সংকট এবং শুল্ক কাঠামোর ওঠানামার কারণে এই সমন্বয় করা হয়েছে।
দামের পরিবর্তনের কারণ
স্বর্ণের দামের সমন্বয় এখন নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত তিন মাসে দেশের বাজারে সোনার দাম প্রায় ৮ বার বাড়ানো হয়েছে। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক চাপ, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের নিরাপদ বিনিয়োগ মাধ্যম হিসেবে চাহিদা বৃদ্ধি এবং স্থানীয়ভাবে ডলারের সরবরাহ সংকট—এই সব মিলিয়ে স্বর্ণের দাম প্রতিনিয়ত উপরের দিকে চাপ পাচ্ছে।
স্বর্ণের দামের ওপর প্রভাব ফেলছে যে বিষয়গুলো:
- আন্তর্জাতিক বাজার প্রভাব: যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সুদের হার নীতি পরিবর্তন, বিশ্ববাণিজ্যের অনিশ্চয়তা ও বিনিয়োগ ঝুঁকি বৃদ্ধির কারণে বৈশ্বিক বাজারে সোনার চাহিদা বেড়েছে। এর প্রভাব সরাসরি বাংলাদেশি বাজারেও পড়ছে।
- ডলার–সংকট: আমদানিকৃত ধাতু হিসেবে স্বর্ণ কেনায় ডলার প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশে আন্তঃব্যাংক ডলার বাজার সংকুচিত থাকায় সোনার আমদানি ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। ফলে ব্যবসায়ীরা দাম সমন্বয়ে বাধ্য হচ্ছেন।
- শুল্ক ও ভ্যাট: আমদানি পর্যায়ে শুল্ক, ভ্যাট ও উৎসে কর নিয়মিত প্রযোজ্য থাকায় খুচরা পর্যায়ে সোনার গহনার দাম আরও বৃদ্ধি পায়। বাজুসের পূর্ববর্তী নীতিমালা অনুযায়ী ভরিপ্রতি গহনায় প্রস্তুতিমূল্য বা মজুরি যোগ হয়, যা ডিজাইন অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়।
- স্থানীয় বাজারে চাহিদা বৃদ্ধিঃ শীতকালীন বিয়ে মৌসুম ঘনিয়ে আসায় ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়ছে। বিশেষ করে উচ্চমানের হলমার্ক ২২ ক্যারেট সোনার কদর সবচেয়ে বেশি থাকায় সেটির দাম আরও দ্রুত বাড়ছে।
ব্যবসায়ীদের মতামত
ঢাকার বায়তুল মোকাররম স্বর্ণ ব্যবসায়ী সমিতির একাধিক সদস্য জানান, বাজারে গ্রাহকের ভিড় থাকলেও ক্রেতারা দামের কারণে সোনার গহনা কেনায় দ্বিধায় রয়েছেন। অনেকেই গহনা কেনার পরিবর্তে সোনা বিনিয়োগ হিসেবে কিনে ব্যাংকে মর্টগেজ বা আর্থিক সুরক্ষা হিসেবে রেখে দিচ্ছেন।
একজন স্বর্ণ ব্যবসায়ী বলেন,
“আন্তর্জাতিক বাজারে দাম না কমা পর্যন্ত দেশীয় বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরবে না। বর্তমানে ব্যবসা খুব অনিশ্চয়তায় চলছে। যারা বিনিয়োগ করার জন্য সোনা কিনছেন তারা লাভবান হতে পারেন, তবে গহনা ক্রেতাদের ওপর চাপ বাড়ছে।”
বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ছে
বিশ্লেষকদের মতে, বাজারে মুদ্রাস্ফীতি ও টাকার ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় অনেকে সোনা কেনাকে নিরাপদ বিনিয়োগ মনে করছেন। অতীতের তুলনায় এখন সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারেও সোনা শুধুই অলংকার নয়, বরং একটি আর্থিক সুরক্ষা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি হিসেবে সোনা স্থিতিশীল সম্পদ—এই বিশ্বাস থেকেই বিনিয়োগকারীদের সোনা কেনার প্রবণতা বাড়ছে।
সোনা কেনাবেচায় সতর্কতা
বিশেষজ্ঞরা সোনা কেনার আগে কয়েকটি বিষয়ে সতর্ক থাকতে বলেন:
- বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) কর্তৃক অনুমোদিত ও বাজুসের সদস্যভুক্ত দোকান থেকেই গহনা কিনতে হবে।
- হলমার্ক সিল ও ক্যারেট যাচাই ছাড়া সোনা কেনা ঝুঁকিপূর্ণ।
- গহনার ভর, মজুরি ও ভ্যাট আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে কি না তা বুঝে নিতে হবে।
- ক্রয় রশিদ ও গ্যারান্টি কার্ড অবশ্যই সংগ্রহ করতে হবে।
আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব আগামীতেও থাকবে
মুদ্রা বাজারের অস্থিরতা এবং রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত পরিস্থিতির কারণে আগামী কয়েক সপ্তাহও স্বর্ণের দাম বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে বলে বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন। বিশেষত ডলার সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে তা সরাসরি দেশীয় স্বর্ণবাজারকে চাপে রাখবে।
বাজার পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, স্বর্ণের বাজার এখনো বিনিয়োগকারীকেন্দ্রিক, ফলে দাম কমার সম্ভাবনা আপাতত কম। ব্যবসায়ীদের দাবি, দাম বাড়লেও বাজার সক্রিয় রয়েছে এবং গ্রাহক প্রবাহ বজায় আছে।
আজকের ঘোষণায় আবারও পরিষ্কার হলো যে স্বর্ণবাজার অনিশ্চয়তার মধ্যেই চলছে। অর্থনৈতিক মন্দা, বৈশ্বিক সংকট এবং স্থানীয় আর্থিক চাপে সোনার দাম আরও বাড়তে পারে। ক্রেতা ও বিনিয়োগকারী—দু’শ্রেণির মানুষই বর্তমানে বাজার পর্যবেক্ষণ করে সাবধানী সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
উল্লেখ্য, বাজুস সাধারণত আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি বিবেচনা করে দেশের সোনার দাম সমন্বয় করে থাকে। তাই দামের পরিবর্তনের ক্ষেত্রে প্রতিদিন নতুন সিদ্ধান্ত আসতে পারে।








