নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্যে এমনিতেই হিমশিম খাচ্ছিল নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো। আয় ও ব্যয়ের হিসাব মেলাতে যখন মানুষ দিশেহারা, ঠিক তখনই সরকার ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। জ্বালানি তেলের এই মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনে যেন ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দেখা দিয়েছে। তেলের দাম বাড়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই রাজধানীর কাঁচাবাজারগুলোতে সবজি, আটা-ময়দা, ভোজ্যতেলসহ অন্তত ১০টি নিত্যপণ্যের দামে আগুন লেগেছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে অর্থনৈতিক মন্দা, মূল্যস্ফীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এমনিতেই আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে। এখন জ্বালানির বাড়তি খরচের কারণে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় সব ধরনের পণ্যের দাম আরও এক ধাপ বাড়ল। এতে করে সবচেয়ে নাজুক পরিস্থিতিতে পড়েছেন দেশের নির্দিষ্ট আয়ের মধ্যবিত্ত শ্রেণি।
একদিনের ব্যবধানে বাজারে পণ্যের দামের চিত্র
রাজধানীর একাধিক খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, জ্বালানি তেলের দাম কার্যকরের পর থেকেই বিক্রেতারা প্রায় সব পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়:
- সবজি ও কাঁচামরিচ: একদিন আগেও যে বেগুন ৮০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হতো, তা এখন ৯০ থেকে ১৩০ টাকায় উঠেছে। শসার কেজি ৫০ থেকে ৮০ টাকা, যা আগে ছিল ৪০ টাকা। কাঁচামরিচের কেজি ১০০ থেকে বেড়ে ১৬০ টাকায় পৌঁছেছে।
- ডিম ও অন্যান্য পণ্য: প্রতি হালি ফার্মের ডিম বিক্রি হচ্ছে ৫৫ টাকায়, যা দুদিন আগেও ছিল ৫০ টাকা। ১ কেজি তেজপাতার দাম ১৯০-২৪০ টাকা থেকে বেড়ে ২৫০-৩০০ টাকা হয়েছে। আমদানি করা রসুনের দাম কেজিপ্রতি ২০ টাকা বেড়ে ১৮০ টাকা ছুঁয়েছে।
- ডাল, আটা ও তেল: বড় দানার মসুর ডাল কেজিতে ৯৫-১০০ টাকা, খোলা আটা ৫০ টাকা এবং খোলা ময়দা ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাশাপাশি পামঅয়েলের দাম লিটারে ৪ টাকা বেড়ে ১৭০ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রার সংকট ও খরচের বাস্তব চিত্র
সংসারের খরচ জোগাতে গিয়ে কীভাবে মানুষ ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছে, তার বাস্তব উদাহরণ রাজধানীর নয়াবাজারের বেসরকারি চাকরিজীবী মো. সোহাগ। ৪২ হাজার টাকা বেতনে মা-বাবা, স্ত্রী ও সন্তানসহ ৬ জনের সংসার চালানো তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
তার প্রতি মাসের নির্ধারিত খরচের হিসাব দেখলে দেশের মধ্যবিত্তের বাস্তব চিত্রটি পরিষ্কার বোঝা যায়:
| খরচের খাত | মাসিক আনুমানিক ব্যয় (টাকা) |
| ৫০ কেজি চালের বস্তা | ৪,০০০ |
| ৫ লিটার ভোজ্যতেল | ১,০০০ |
| বাসা ভাড়া | ১৪,০০০ |
| মাছ, মুরগি, সবজি ও মশলা | ৯,০০০ |
| এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার | ৩,০০০ |
| বিদ্যুৎ বিল | ২,০০০ |
| সাবান, ডিটারজেন্ট ও শ্যাম্পু | ৫০০ |
| অন্যান্য মুদি বাজার | ২,০০০ |
| মোবাইল রিচার্জ | ৫০০ |
| মা-বাবার হাতখরচ | ৫,০০০ |
| মোট মাসিক খরচ | ৪১,০০০ টাকা |
সোহাগ জানান, ৪২ হাজার টাকা বেতনের মধ্যে ৪১ হাজার টাকাই জীবনযাত্রার প্রাথমিক চাহিদায় চলে যায়। এরপর যাতায়াত বা জরুরি কোনো চিকিৎসা খরচ চালানোর মতো টাকা আর থাকে না। এখন নতুন করে তেলের দাম বাড়ায় সব পণ্যের দাম যেভাবে বাড়ছে, তাতে ঋণ নেওয়া ছাড়া তার কাছে আর কোনো উপায় থাকছে না।
পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি ও ক্যাবের উদ্বেগ
নয়াবাজারের মুদি ব্যবসায়ী মো. আমিনুল ইসলাম জানান, তেলের দাম বাড়ায় পণ্য পরিবহনের ট্রাক ভাড়া এক লাফে অনেকটাই বেড়ে গেছে। ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি তালুকদার মোহাম্মদ মনির জানান, জ্বালানি সংকটের সময় এমনিতেই ৫-৭ হাজার টাকা ভাড়া বেড়েছিল। এখন বগুড়া থেকে ঢাকায় একটি ট্রাক আসার ক্ষেত্রে নতুন করে আরও ২-৩ হাজার টাকা বাড়তি ভাড়া দিতে হচ্ছে।
কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন এই মূল্যবৃদ্ধিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “জ্বালানি তেলের দাম কেবল যাতায়াত খরচ বাড়ায় না, এটি পুরো অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলে। শিল্প-কারখানা থেকে শুরু করে বাসাবাড়ি সবখানেই খরচ বাড়ে। দিনশেষে এই বাড়তি খরচের পুরো বোঝা সাধারণ ভোক্তাকেই বইতে হয়।” তিনি অসাধু ব্যবসায়ীরা যাতে কৃত্রিম সংকট বা অজুহাত তৈরি করে অতিরিক্ত দাম না নিতে পারে, সে জন্য তদারকি জোরদার করার দাবি জানান।
স্থিতিশীলতা ফেরাতে সরকারের আশ্বাস
বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে সচিবালয়ে একটি বিশেষ বৈঠক করেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি জানান, নিত্যপণ্যের বাজার সহনীয় ও স্থিতিশীল রাখতে সরকার নজরদারি আরও জোরদার করবে।
বাণিজ্যমন্ত্রী যেসব উদ্যোগ ও ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করেছেন:
- যৌথ মনিটরিং: জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে বাজারে কঠোর তদারকি চালানো হবে।
- ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সমন্বয়: আমদানিকারক, উৎপাদক ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করে পণ্যের মজুত ও সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে।
- কর কাঠামো পর্যালোচনা: আন্তর্জাতিক বাজারের অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় এবং পণ্যের মূল্য সহনীয় রাখতে বিদ্যমান কর ব্যবস্থা ও এলসি (LC) সংক্রান্ত তথ্য পর্যালোচনা করবে সরকার।








