দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীদের উপচে পড়া ভিড় এবং শয্যাসংকট এক সাধারণ চিত্রে পরিণত হয়েছে। এই মানবিক সংকট ও ভোগান্তি নিরসনে বাংলাদেশ সরকার এক অভূতপূর্ব ও ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কোনো সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর জন্য শয্যা (বেড) বা প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা খালি না থাকলে, সেই রোগীকে সরাসরি তালিকাভুক্ত বেসরকারি হাসপাতালে পাঠিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হবে। আর এই চিকিৎসার যাবতীয় খরচের দায়িত্ব বহন করবে সরকার।
সচিবালয়ে আয়োজিত ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত এক জরুরি মতবিনিময় সভা শেষে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সরকারের এই জনকল্যাণমুখী ভাবনার কথা নিশ্চিত করেছেন।
বেসরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে ডেঙ্গু চিকিৎসা যেভাবে কার্যকর হবে
সাধারণ মানুষের চিকিৎসার সুযোগ সুনিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য বিভাগ ইতিমধ্যেই দেশের স্বনামধন্য ও মানসম্মত বেসরকারি হাসপাতালগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে একটি বিশেষ পাইলট প্রকল্প (Pilot Project) চালু করার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করেছে।
- রোগী স্থানান্তর: কোনো ডেঙ্গু রোগী সরকারি হাসপাতালে আসার পর যদি দেখা যায় যে কোনো বেড বা আইসিইউ খালি নেই, তখন স্বাস্থ্য বিভাগের সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনায় তাকে নিকটস্থ নির্ধারিত বেসরকারি হাসপাতালে পাঠানো হবে।
- সম্পূর্ণ বিনা খরচে চিকিৎসা: বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, বেড ভাড়া এবং ওষুধপত্রসহ রোগীর চিকিৎসার যাবতীয় খরচ সরাসরি সরকার পরিশোধ করবে। রোগীকে নিজের পকেট থেকে কোনো বাড়তি টাকা খরচ করতে হবে না।
হাসপাতালে স্যালাইন ও কিটের কোনো ঘাটতি নেই
ডেঙ্গু চিকিৎসায় বহুল ব্যবহৃত স্যালাইন ও টেস্ট কিটের কৃত্রিম সংকট নিয়ে বাজারে বহু গুঞ্জন তৈরি হলেও প্রতিমন্ত্রী জনগণকে আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন যে, পরিস্থিতি বর্তমানে পুরোপুরি সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
তিনি বলেন, স্বাস্থ্য বিভাগের দেওয়া সর্বশেষ তথ্যমতে দেশের সমস্ত সরকারি হাসপাতালে পর্যপ্ত পরিমাণে সাধারণ ও আইসিইউ স্যালাইন মজুত রয়েছে। পাশাপাশি দ্রুত ডেঙ্গু শনাক্তকরণের জন্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষা কিটও পর্যাপ্ত পরিমাণে সংরক্ষণ করা হয়েছে। কাজেই চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবে কোনো সেবা ব্যাহত হবে না।
গ্রাম ও উপজেলা পর্যায়েও দ্বিগুণ হচ্ছে চিকিৎসাসেবা
অতীতে দেখা গেছে গ্রামের কোনো মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে তাকে দ্রুত ঢাকায় বা বিভাগীয় শহরের বড় বড় হাসপাতালে ছুটতে হতো। এই প্রবণতা বন্ধে এবং সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিতে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত ডেঙ্গু চিকিৎসা ব্যবস্থা জোরালো করার নির্দেশ দিয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী।
১. রেড জোন চিহ্নিতকরণ: ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি রয়েছে এমন সব উপজেলাকে ‘রেড মার্কিং’ বা বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
২. শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধি: ঝুঁকিপূর্ণ এসব এলাকায় সাধারণ রোগীদের পাশাপাশি ডেঙ্গু রোগীদের জন্য যেন আলাদা চিকিৎসা নিশ্চিত হয়, সে লক্ষ্যে ডেঙ্গু ডেডিকেটেড বেড সংখ্যা দ্বিগুণ (যেমন: ৫টি বেড বাড়িয়ে ১০টি বা তার বেশি) করার নির্দেশনা বাস্তবায়িত হচ্ছে।
৩. ওষুধের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ: প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে পর্যাপ্ত চিকিৎসকের পাশাপাশি ওষুধ ও স্যালাইনের মজুত সবসময় প্রস্তুত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সাধারণ মানুষের মনে বড় স্বস্তি
প্রতিবছর ডেঙ্গু মৌসুমে সাধারণ ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে চিকিৎসার চড়া ব্যয় মেটাতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হতে হতো। সরকারি হাসপাতালে জায়গা না পেয়ে বাধ্য হয়ে প্রাইভেট ক্লিনিকে গিয়ে জমানো টাকা শেষ করতেন অনেকে।
সরকারের এই নতুন নীতির ফলে দেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষ অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা থেকে রেহাই পাবেন। সরকারি-বেসরকারি যৌথ এই উদ্যোগ বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে একটি বড় পরিবর্তন এনে দেবে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।








