হটলাইনঃ +৮৮০ ৯৬১৩ ০০০ ২০০ |
Saturday, September 5, 2026
- বিজ্ঞাপন-spot_img
Homeজাতীয়এনআইডিসহ সকল পরিচয়পত্রের পরিবর্তে আসছে ‘এক-আইডি’: বদলাচ্ছে নাগরিক সেবার চিত্র
spot_img

এনআইডিসহ সকল পরিচয়পত্রের পরিবর্তে আসছে ‘এক-আইডি’: বদলাচ্ছে নাগরিক সেবার চিত্র

বাংলাদেশের নাগরিক সেবায় এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন হতে যাচ্ছে। এখন থেকে একজন নাগরিকের পরিচয় নিশ্চিত করতে আর একাধিক কার্ড বা সনদের পেছনে ছুটতে হবে না। জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), জন্মনিবন্ধন সনদ, ফ্যামিলি কার্ড কিংবা কৃষক কার্ড এসবের স্থান দখল করতে আসছে একটিমাত্র স্মার্ট পরিচয়পত্র, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘এক-আইডি’ (Unified Digital Identity)।

সরকারের এই নতুন উদ্যোগটি বাস্তবায়ন হলে জন্মের পরপরই দেশের প্রতিটি শিশু একটি স্থায়ী ও স্বতন্ত্র ডিজিটাল পরিচয় পাবে। এই একটি আইডি কার্ড দিয়েই শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং বিভিন্ন সরকারি সেবা গ্রহণ করা সম্ভব হবে। ফলে বারবার একই তথ্য সরকারি অফিসে জমা দেওয়ার দীর্ঘদিনের ভোগান্তি ও জটিলতা থেকে মুক্তি পাবেন সাধারণ মানুষ।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ ইতিমধ্যেই এই যুগান্তকারী পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বড় ধরনের প্রকল্প গ্রহণ করেছে। এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো দেশের প্রায় ১৮ কোটি মানুষকে একটি সুসংগঠিত এবং আধুনিক ডিজিটাল ব্যবস্থার অধীনে নিয়ে আসা।

কী এই ‘এক-আইডি’ বা ইউনিফাইড ডিজিটাল আইডেনটিটি?

‘এক-আইডি’ মূলত একটি সর্বজনীন ও একীভূত ডিজিটাল পরিচয়পত্র। সহজ কথায়, এটি এমন একটি ব্যবস্থার সূচনা করবে যেখানে দেশের প্রতিটি মানুষের জন্য কেবল একটিই ডিজিটাল প্রোফাইল থাকবে।

বর্তমানে আমাদের দৈনন্দিন কাজে বা সরকারি সেবা নিতে গিয়ে নানা ধরনের কার্ড বা নম্বরের প্রয়োজন হয়। যেমন:

  • জন্মনিবন্ধন সনদ
  • জাতীয় পরিচয়পত্র (NID)
  • পাসপোর্ট
  • ড্রাইভিং লাইসেন্স
  • ই-টিআইএন (TIN)
  • ফ্যামিলি বা রেশনের কার্ড

এই একাধিক কার্ড ব্যবহারের বদলে ‘এক-আইডি’ চালু হলে নাগরিকের জীবনের প্রথম দিন থেকে শেষ দিন পর্যন্ত কেবল একটি পরিচয় নম্বর ব্যবহার করা হবে। এতে প্রশাসনিক কাজ অনেক গতিশীল হবে এবং নাগরিকদের তথ্য জালিয়াতি বা প্রতারণার হাত থেকে রক্ষা করা সহজ হবে।

কেন প্রয়োজন এই নতুন ব্যবস্থা?

আমাদের দেশে বর্তমানে যেকোনো সেবা নেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো বারবার তথ্যের সত্যতা যাচাই করা। একজন নাগরিককে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা, পাসপোর্ট আবেদন বা জমি রেজিস্ট্রি করার জন্য আলাদা আলাদাভাবে একই বায়োমেট্রিক ও ব্যক্তিগত তথ্য জমা দিতে হয়।

নতুন এই ব্যবস্থা বাস্তবায়িত হলে:

১. ভোগান্তি কমবে: সরকারি কিংবা বেসরকারি দফতরে সেবার আবেদন করতে আর ফাইল বা কাগজের স্তূপ জমা দিতে হবে না।

২. হয়রানি বন্ধ হবে: দালালচক্রের প্রভাব কমবে এবং সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এক ক্লিকেই নাগরিকের তথ্য নিশ্চিত করতে পারবে।

৩. দুর্নীতি রোধ: সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর ভাতা বা সরকারি সাহায্য সরাসরি সঠিক ব্যক্তির কাছে পৌঁছাবে, ফলে ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে সুবিধা নেওয়ার সুযোগ বন্ধ হবে।

‘ডি-স্টার’ প্রকল্প: কীভাবে বাস্তবায়িত হবে এই পরিকল্পনা?

‘এক-আইডি’ বাস্তবায়নের জন্য তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ যে বিশেষ প্রকল্প হাতে নিয়েছে, তার নাম ‘ডি-স্টার’ (D-STAR) বা ‘ডিজিটাল সার্ভিস ট্রান্সফরমেশন ফর অ্যাকসেস অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স’।

এই বিশাল কর্মযজ্ঞের দায়িত্বে থাকছে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (BCC)। প্রকল্প বাস্তবায়নের মূল সময়কাল নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৬ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত। অর্থাৎ, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের সার্বিক ডিজিটাল সেবা খাতকে সম্পূর্ণ নতুন রূপ দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। ইতিমধ্যেই এই প্রকল্পের খসড়া প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।

প্রকল্পের খরচ এবং অর্থায়ন ব্যবস্থা

ডিজিটাল বাংলাদেশের এই নতুন ধাপ বাস্তবায়নে বিশাল অঙ্কের বাজেট নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পটির মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৯,১৯৩ কোটি টাকা।

বাজেটের উৎস

  • সরকারি তহবিল (গোব): ৭,৬৬৩ কোটি টাকা।
  • বিশ্বব্যাংকের উন্নয়ন সহায়তা (ঋণ): ১,৫৩০ কোটি টাকা।

প্রকল্পের বড় অংশ ব্যয় হবে মূলত দেশের সকল নাগরিকের উন্নত মানের বায়োমেট্রিক তথ্য (আঙুলের ছাপ, আইরিশ স্ক্যান, ছবি) সংগ্রহ, চিপযুক্ত ডিজিটাল কার্ড তৈরি এবং তা নিরাপদে বিতরণ করার কাজে।

একটি কার্ডের পেছনে খরচ কত এবং কতগুলো কার্ড ছাপা হবে?

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) সর্বশেষ জনশুমারি ও গৃহগণনার হিসাব অনুযায়ী দেশের বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি। তবে ভবিষ্যৎ চাহিদার কথা চিন্তা করে ও জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য মোট ২০ কোটি বিশেষ পলিকার্বোনেট চিপ কার্ড তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

একটি বিশেষ চিপভিত্তিক ‘এক-আইডি’ কার্ড তৈরি ও সরবরাহের খরচকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে:

কাজের বিবরণখরচের পরিমাণ (মার্কিন ডলার)আনুমানিক খরচ (বাংলাদেশি টাকা)
কার্ড উৎপাদন ও প্রিন্টিং$২.০০ ডলারপ্রায় ২৪৬ টাকা
বিতরণ ও ডেলিভারি$১.০০ ডলারপ্রায় ১২৩ টাকা
প্রতিটি কার্ডের মোট খরচ$৩.০০ ডলারপ্রায় ৩৬৯ টাকা

এই কার্ডগুলো সাধারণ প্লাস্টিক কার্ডের মতো হবে না। এগুলোতে থাকছে উন্নত পলিকার্বোনেট উপাদান এবং সিকিউর মাইক্রোচিপ, যা সহজে নকল বা বিকৃত করা সম্ভব নয়।

বিশ্বমানের অভিজ্ঞতা ও আন্তর্জাতিক মডেল অনুসরণ

হুট করেই কিন্তু এই উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বিশ্বমঞ্চে যেসব দেশ ইতিমধ্যেই তাদের নাগরিক সেবা পুরোপুরি ডিজিটাল করতে সফল হয়েছে, তাদের অভিজ্ঞতাকে এখানে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।

বিশেষ করে নিচের দেশগুলোর আইডেন্টিটি মডেল গবেষণা করা হচ্ছে:

  • যুক্তরাষ্ট্র (USA): তাদের সর্বজনীন সোশ্যাল সিকিউরিটি ও সার্ভিস ব্যবস্থা।
  • সিঙ্গাপুর (Singapore): তাদের বিখ্যাত ‘Singpass’ ডিজিটাল আইডি ব্যবস্থা।
  • এস্তোনিয়া (Estonia): বিশ্বজুড়ে সুপরিচিত ‘e-Estonia’ মডেল, যেখানে ৯৯% সরকারি সেবা অনলাইনে পাওয়া যায়।
  • ভারত (India): প্রতিবেশীদের সফল ‘আধার’ (Aadhaar) কার্ডের কার্যকারিতা।

তথ্য ও প্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ নতুন এই ব্যবস্থার মূল ভাবনাকে সংজ্ঞায়িত করেছেন এভাবে “একজন নাগরিক, একটি ডিজিটাল পরিচয়, একটি ওয়ালেট”। অর্থাৎ, আইডি কার্ডের সাথে সাথে ডিজিটাল লেনদেন বা আর্থিক ট্রানজেকশনের সুবিধাও যেন নাগরিকরা একই প্ল্যাটফর্মে পান, সেই চেষ্টা করা হচ্ছে।

জন্মের পর থেকেই মিলবে সেবা: বয়স আর বাধা নয়

বর্তমানে আমাদের দেশে শিশুদের জন্ম হলে জন্মনিবন্ধন করা হয়। কিন্তু তারা কোনো পরিচয়পত্র বা ডিজিটাল আইডি পায় না। জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডির জন্য ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।

তবে ‘এক-আইডি’ ব্যবস্থায় কোনো বয়সের সীমা থাকবে না।

  • শিশু জন্মগ্রহণের সাথে সাথেই হাসপাতালে বা নিবন্ধকের কার্যালয়ে তার তথ্য ডিজিটালি প্রবেশ করানো হবে।
  • শিশুকে একটি ইউনিক বা একক আইডেন্টিফিকেশন নম্বর দিয়ে দেওয়া হবে।
  • বয়সের সাথে সাথে শিশুটির স্বাস্থ্যরক্ষা, টিকাদান কর্মসূচি এবং স্কুলে ভর্তির সকল তথ্য ওই একই আইডি নম্বরে যুক্ত হতে থাকবে।
  • ১৮ বছর পূর্ণ হলে পুনরায় নতুন করে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে এনআইডি করার কোনো প্রয়োজন না, কেবল বায়োমেট্রিক আপডেট করলেই চলবে।

বিদ্যমান এনআইডি, ফ্যামিলি কার্ড ও অন্যান্য কার্ডের কী হবে?

এই মুহূর্তে বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের কাছেই একাধিক সরকারি কার্ড রয়েছে। প্রশ্ন উঠতে পারে নতুন এই ‘এক-আইডি’ এলে আগের কার্ডগুলোর কী হবে?

আইসিটি বিভাগের সূত্রমতে, রাতারাতি সব পুরনো কার্ড বন্ধ করা হবে না। এটি হবে একটি পর্যায়ক্রমিক রূপান্তর বা ফেইজ-বাই-ফেইজ প্রসেস।

১. প্রথম ধাপে নতুন এই আইডির ডাটাবেজ তৈরি হবে।

২. দ্বিতীয় ধাপে জাতীয় পরিচয়পত্র (NID), টিসিবি বা ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ইত্যাদি সেবাকে এই এক-আইডির সাথে ইন্টারকানেক্ট বা সংযুক্ত করা হবে।

৩. চূড়ান্ত ধাপে সকল কার্ডের কার্যকারিতা ধীরে ধীরে এই একক ডিজিটাল আইডিতে একীভূত হয়ে যাবে।

এর ফলে পকেটে ডজন ডজন প্লাস্টিক কার্ড নিয়ে ঘোরাঘুরির দিন চিরতরে শেষ হবে।

বিশেষজ্ঞ মতামত ও সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের সরকারি ও বেসরকারি সেবা প্রদান ব্যবস্থায় এক বিরাট পরিবর্তন আসবে। এতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমার পাশাপাশি সরকারি কাজের স্বচ্ছতা বহুলাংশে বেড়ে যাবে।

তবে এই প্রকল্পের সামনে কিছু বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে:

  • তথ্য সুরক্ষা ও প্রাইভেসি (Data Privacy): ১৮ কোটি মানুষের সংবেদনশীল বায়োমেট্রিক ও ব্যক্তিগত তথ্য সাইবার হামলাকারীদের হাত থেকে সুরক্ষিত রাখা প্রধান চ্যালেঞ্জ।
  • ডাটাবেজ ইন্টিগ্রেশন: বিভিন্ন সরকারি মন্ত্রণালয়ের আলাদা আলাদা ডাটাবেজকে একটি কেন্দ্রীয় সিস্টেমের আওতায় আনা একটি কঠিন কাজ।
  • সচেতনতা বৃদ্ধি: প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষকে এই ডিজিটাল কার্ডের ব্যবহারে অভ্যস্ত করে তোলা এবং সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়া।

সরকার যদি উপযুক্ত সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করে এবং নিখুঁত ডাটাবেজ তৈরি করতে পারে, তবে ‘এক-আইডি’ সত্যিই একটি স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার পথে মাইলফলক হয়ে থাকবে।

দেশের প্রতিটি নাগরিককে ঝামেলামুক্ত সেবা দিতে এবং ডিজিটাল ব্যবস্থার পূর্ণ সুবিধা নিশ্চিত করতে ‘এক-আইডি’ বা ইউনিফাইড ডিজিটাল আইডেনটিটি প্রকল্পের বিকল্প নেই। ২০২৬ থেকে ২০৩১ সালের মধ্যে পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ শেষ হলে বাংলাদেশ প্রবেশ করবে এক আধুনিক ডিজিটাল যুগে, যেখানে একজন নাগরিকের একমাত্র ডিজিটাল পরিচয়ই হবে তার সকল নাগরিক অধিকার ও সেবার চাবিকাঠি।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সর্বাধিক জনপ্রিয়

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সাম্প্রতিক মন্তব্য

- বিজ্ঞাপন-spot_img
error: Content is protected !!