জাতীয় সংসদ ভবনের মূল কক্ষে দেশের শীর্ষ পদ অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়। সাধারণ নির্বাচনের মতো এই নির্বাচন রাস্তায় বা সাধারণ কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হয় না, বরং এটি পরিচালিত হয় জাতীয় সংসদের ভেতরে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সদস্যদের প্রকাশ্য ভোটের মাধ্যমেই নির্বাচিত হবেন দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ একটি বিষয়। তবে সংসদ সদস্যরা ঠিক কীভাবে এই ভোটে অংশ নেন, ব্যালট পেপারে কীভাবে নাম লেখেন এবং ভোট গণনার নিয়মগুলো কী তা অনেকের কাছেই স্পষ্ট নয়। চলুন সহজ ভাষায় জেনে নেওয়া যাক রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রক্রিয়া কীভাবে পরিচালিত হয়।
ভোট প্রদানের মূল নিয়মাবলী
সংসদ কক্ষে নির্ধারিত দিনে দুপুর ২টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। ভোট দেওয়ার জন্য সংসদ সদস্যদের কয়েকটি নির্দিষ্ট নিয়ম কঠোরভাবে মেনে চলতে হয়:
১. প্রবেশাধিকার ও পরিচয় নিশ্চিতকরণ
ভোটের দিন সংসদ কক্ষে প্রবেশের সময় প্রত্যেক সংসদ সদস্যকে (এমপি) সংসদ সচিবালয় থেকে সরবরাহ করা নিজস্ব অফিসিয়াল আইডি কার্ড সঙ্গে রাখতে হয়। কার্ড প্রদর্শন করেই কক্ষে প্রবেশ করতে হয়।
২. ব্যালট পেপার সংগ্রহ ও নাম প্রদান
নিজ আসনে বসার পর দায়িত্বপ্রাপ্ত সহায়তাকারী কর্মকর্তার কাছ থেকে এমপিরা একটি বিশেষ ব্যালট পেপার গ্রহণ করেন। এই ব্যালটে প্রতিটি এমপির নাম ও বিভক্তি নম্বর মুদ্রিত থাকে।
এরপর ব্যালট পেপারের সাথে থাকা ‘কাউন্টার ফয়েল’ বা চেকমুড়িতে নিজের পূর্ণ নাম লিখে তা ওই কর্মকর্তার কাছে ফেরত জমা দিতে হয়।
৩. যেভাবে দেবেন নিজের ভোট
স্বাভাবিক নির্বাচনে সিয়ামি সিল মারা হলেও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে নিয়ম কিছুটা ভিন্ন। এখানে ব্যালট পেপারের নির্ধারিত অংশে নিজ পছন্দের প্রার্থীর নামের পাশে ফাঁকা স্থানে এমপিকে নিজের পূর্ণ নাম লিখতে হয়। এরপর সেই ব্যালট পেপারটি ভাঁজ করে কক্ষে রক্ষিত নির্ধারিত স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সে জমা দিতে হয়।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: ব্যালটে এমপির পূর্ণ স্বাক্ষরের কথা বলা থাকলেও নিয়ম অনুযায়ী সেখানে স্বাক্ষরের বদলে স্পষ্টাক্ষরে পূর্ণ নাম লিখতে হয়।
ভুল ব্যালটের ক্ষেত্রে নিয়ম
ভোট দেওয়ার সময় কোনো কারণে যদি কোনো সংসদ সদস্যের ব্যালট পেপার নষ্ট বা ভুল হয়ে যায়, তবে সেটি ব্যালট বাক্সে ফেলা যাবে না। বাক্স ফেলার আগেই নষ্ট হওয়া ব্যালটটি প্রধান নির্বাচনকর্তার কাছে জমা দিতে হবে। পরবর্তীতে নির্বাচনকর্তা বিধি অনুযায়ী নতুন ব্যালটের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।
ভোটকক্ষে যেসব কাজ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ
সংসদ কক্ষের ভেতরে সুশৃঙ্খল পরিবেশ বজায় রাখতে নির্বাচন কমিশন কিছু নিয়ম নির্ধারণ করে থাকে:
- প্রচারণায় নিষেধাজ্ঞা: ভোট চলাকালীন সংসদ কক্ষের ভেতর কোনো প্রার্থী বা এমপির পক্ষে কোনো প্রকার নির্বাচনি প্রচারণা চালানো যাবে না।
- বক্তব্য দেওয়া বারণ: ভোটকক্ষে কোনো ধরনের ভাষণ বা বক্তব্য দেওয়া যাবে না।
- তাৎক্ষণিক সহায়তা: ভোট দেওয়ার সময় কোনো সংসদ সদস্য যদি কোনো সমস্যা বা জটিলতায় পড়েন, তবে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে চিফ হুইপ অথবা বিরোধীদলের চিফ হুইপের সহায়তা নিতে পারবেন।
ভোট গণনা ও ফল প্রকাশের নিয়ম
বিকাল ৫টায় ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর কোনো বিরতি ছাড়াই সংসদ কক্ষের ভেতরে সরাসরি ভোট গণনা শুরু হয়। গণনার কাজ কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন করা হয়:
১. উপস্থিতি ও বৈধতা যাচাই
প্রথমে কতজন সংসদ সদস্য ভোট প্রদান করেছেন, তার একটি চূড়ান্ত হিসাব তৈরি করা হয়। এরপর ব্যালট বাক্স খুলে কতটি ব্যালট বৈধ হয়েছে এবং কতটি নিয়ম না মানার কারণে বাতিল হয়েছে, তা আলাদা করা হয়। অব্যবহৃত বা থেকে যাওয়া ব্যালটগুলোর হিসাবও মেলানো হয়।
২. ফলাফল নির্ধারণ ও বিজয়ী ঘোষণা
বৈধ ব্যালটগুলো থেকে প্রার্থীরা কে কতটি ভোট পেলেন তা সততার সাথে আলাদাভাবে গণনা করা হয়। যে প্রার্থী সর্বোচ্চসংখ্যক বৈধ ভোট পাবেন, তাকে নির্বাচনকর্তা বিজয়ী ঘোষণা করবেন।
গণনা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই সংসদ ভবনে প্রাথমিক ফলাফল জানিয়ে দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে নির্বাচন কমিশন তা সরকারি গেজেট আকারে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করে।
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রক্রিয়ার প্রতিটি পদক্ষেপ অত্যন্ত স্বচ্ছ ও সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামোয় পরিচালিত হয়। সংসদ সদস্যদের দেওয়া প্রতিটি মূল্যবান ভোটই নির্ধারণ করে দেশের পরবর্তী অভিভাবক কে হবেন। এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে সাধারণ নাগরিক হিসেবে স্পষ্ট ধারণা থাকা আমাদের সকলের জন্যই ইতিবাচক।








