হটলাইনঃ +৮৮০ ৯৬১৩ ০০০ ২০০ |
বৃহস্পতিবার, জুলাই ৯, ২০২৬
- বিজ্ঞাপন-spot_img
Homeইসলাম ও জীবনজামাইকে স্বর্ণের আংটি উপহার দেওয়া কি জায়েজ? জেনে নিন ইসলামের সঠিক বিধান
spot_img

জামাইকে স্বর্ণের আংটি উপহার দেওয়া কি জায়েজ? জেনে নিন ইসলামের সঠিক বিধান

বিয়ে কেবল দুটি মানুষের মিলন নয়, বরং দুটি পরিবারের মধ্যকার ভালোবাসা, সম্মান ও সৌহার্দ্যের এক মজবুত বন্ধন। আমাদের বাঙালি সমাজে বিয়ের উৎসবকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের নিয়ম-কানুন ও সামাজিক প্রথা জড়িয়ে রয়েছে। এর মধ্যে একটি অন্যতম প্রচলিত প্রথা হলো বর বা নতুন জামাইকে বিভিন্ন ধরনের মূল্যবান উপহার দেওয়া।

অনেক পরিবার অত্যন্ত আনন্দ ও ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে নতুন জামাইয়ের হাতে সোনার বা স্বর্ণের আংটি পরিয়ে দেন। শ্বশুর-শাশুড়ি বা আত্মীয়-স্বজনরা অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে এই উপহারটি কিনে থাকেন। তবে একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের প্রতিটি সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান ইসলামের নিয়ম অনুযায়ী হওয়া জরুরি। তাই অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে—ইসলামের দৃষ্টিতে জামাইকে স্বর্ণের আংটি উপহার দেওয়া কি বৈধ? আর যদি উপহার দেওয়া যায়, তবে জামাই কি সেটি ব্যবহার করতে বা আঙুলে পরতে পারবেন? এই বিষয়ে ইসলামী শরীয়তের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা কী? চলুন আজকের এই প্রতিবেদনে বিষয়টি সহজ ভাষায় বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।

জামাইকে স্বর্ণের আংটি উপহার দেওয়া কি জায়েজ?

এই প্রশ্নের উত্তরটি খুবই স্পষ্ট ও সহজ। ইসলামে পুরুষদের জন্য স্বর্ণের তৈরি যেকোনো ধরনের অলংকার বা গহনা পরিধান করা বা ব্যবহার করা সম্পূর্ণ হারাম বা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে এখানে একটি সূক্ষ্ম বিষয় আমাদের বুঝতে হবে পুরুষের জন্য স্বর্ণের গহনা ‘পরা’ বা ব্যবহার করা হারাম হলেও, স্বর্ণের ‘মালিক’ হওয়া কিন্তু হারাম নয়।

এর মানে হলো, কোনো পুরুষকে যদি কেউ স্বর্ণ উপহার হিসেবে দেয়, তবে সেই উপহারটি দেওয়া এবং পুরুষের জন্য তা গ্রহণ করা সম্পূর্ণ বৈধ বা জায়েজ।

সুতরাং, বিয়ের সময় শ্বশুর-শাশুড়ি যদি তাদের মনের আনন্দ, ভালোবাসা ও সম্মানের প্রতীক হিসেবে জামাইকে একটি স্বর্ণের আংটি উপহার দেন, তবে এতে শরীয়তের দৃষ্টিতে কোনো গুনাহ বা সমস্যা নেই। উপহার হিসেবে আংটিটি আদান-প্রদান করা সম্পূর্ণ জায়েজ। কিন্তু আসল বিষয়টি প্রকাশ পায় উপহারটি গ্রহণ করার পর। উপহার নেওয়ার পর জামাই কোনোভাবেই সেই স্বর্ণের আংটিটি নিজের আঙুলে পরতে পারবেন না।

উপহার পাওয়ার পর জামাই আংটিটি কী করবেন?

যেহেতু জামাই আংটিটি নিজে ব্যবহার করতে পারবেন না, তাই স্বভাবতই প্রশ্ন আসে যে তাহলে তিনি এই উপহারটি নিয়ে কী করবেন? ইসলামে এর খুব সুন্দর ও সহজ সমাধান রয়েছে। উপহার পাওয়ার পর জামাই আংটিটি নিজের মালিকানায় রাখবেন এবং তিনি নিচের যেকোনো একটি উপায় বেছে নিতে পারেন:

  • স্ত্রীকে ব্যবহার করতে দেওয়া: জামাই চাইলে উপহার পাওয়া স্বর্ণের আংটিটি তার স্ত্রী অর্থাৎ আপনার কন্যাকে পরার জন্য দিয়ে দিতে পারেন। কারণ ইসলামে নারীদের জন্য স্বর্ণ ব্যবহার করা সম্পূর্ণ জায়েজ।
  • অন্য কাউকে উপহার দেওয়া: তিনি চাইলে আংটিটি তার মা, বোন বা অন্য কোনো আত্মীয়কে উপহার হিসেবে দিয়ে দিতে পারেন।
  • বিক্রি করে দেওয়া: জামাই চাইলে আংটিটি বাজারে বিক্রি করে সেই টাকা নিজের যেকোনো প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারেন।
  • সম্পদ হিসেবে জমা রাখা: তিনি আংটিটি নিজের কাছে ভবিষ্যৎ সম্পদ বা সঞ্চয় হিসেবে রেখে দিতে পারেন, যা বিপদের সময় কাজে লাগবে।

পুরুষদের জন্য স্বর্ণ ব্যবহার কেন নিষিদ্ধ?

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এখানে প্রতিটি আদেশের পেছনে যেমন কল্যাণ রয়েছে, তেমনি প্রতিটি নিষেধের পেছনেও মানুষের জন্য মঙ্গল রয়েছে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর উম্মতের পুরুষদের জন্য স্বর্ণ এবং রেশমি কাপড় ব্যবহার করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন। এই বিষয়ে ইসলামের অত্যন্ত শক্তিশালী কিছু হাদিস রয়েছে, যা আমাদের গভীরভাবে সতর্ক করে।

১. জ্বলন্ত অঙ্গার ধারণ করার সমান

হাদিস শরিফে এসেছে, একবার এক ব্যক্তি হাতে স্বর্ণের আংটি পরেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) তা দেখে অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হলেন। তিনি নিজে সেই ব্যক্তির হাত থেকে আংটিটি খুলে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন এবং বললেন: “তোমাদের কেউ কি জাহান্নামের জ্বলন্ত অঙ্গার নিজের হাতে ধারণ করতে চায়?” (সহীহ মুসলিম: ২০৯০)

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, একজন পুরুষের জন্য স্বর্ণের আংটি পরা কতটা মারাত্মক এবং গুনাহের কাজ। রাসূলুল্লাহ (সা.) স্বয়ং এটি হাত থেকে ফেলে দিয়ে আমাদের সতর্ক করেছেন।

২. ঈমানদারদের জন্য নিষেধাজ্ঞা

অন্য আরেকটি হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) আরও স্পষ্ট করে বলেছেন: “যে ব্যক্তি আল্লাহ এবং শেষ দিবসের (আখিরাতের) প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন রেশম ও স্বর্ণ ব্যবহার না করে।” (মুসনাদে আহমদ: ২২২৪৮)

অর্থাৎ, একজন প্রকৃত মুমিন বা ঈমানদার পুরুষ কখনই স্বর্ণ ব্যবহার করতে পারেন না। এটি কেবল নারীদের সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে।

বিশেষ প্রয়োজনে কি পুরুষরা স্বর্ণ ব্যবহার করতে পারবেন?

ইসলাম একটি সহজ ও মানবিক ধর্ম। সাধারণ অবস্থায় পুরুষদের জন্য স্বর্ণের অলংকার ব্যবহার করা নিষিদ্ধ হলেও, বিশেষ কিছু পরিস্থিতিতে বা চিকিৎসাগত প্রয়োজনে ইসলাম এতে শিথিলতা বা অনুমতি দিয়েছে।

ইসলামের ইতিহাসের একটি বিখ্যাত ঘটনা থেকে এটি জানা যায়। সাহাবি হযরত আরফাজা ইবনে আসআদ (রা.)-এর নাক একটি যুদ্ধের সময় কেটে গিয়েছিল। নিজের কাটা নাক ঢাকার জন্য তিনি প্রথমে রূপা দিয়ে একটি কৃত্রিম নাক তৈরি করে ব্যবহার শুরু করেন। কিন্তু কিছুদিন পর সেই রূপার নাকে দুর্গন্ধের সৃষ্টি হয়, যা তার জন্য অত্যন্ত কষ্টদায়ক ছিল।

এই সমস্যার কথা জানতে পেরে রাসূলুল্লাহ (সা.) তাকে রূপার পরিবর্তে স্বর্ণের নাক ব্যবহার করার বিশেষ অনুমতি দেন। কারণ স্বর্ণে সহজে মরিচা পড়ে না বা দুর্গন্ধ তৈরি হয় না। (মুসনাদে আহমদ: ১৮৫২৭, আবু দাউদ: ৪২৩২)

এই ঘটনা থেকে প্রমাণিত হয় যে, শখ করে বা সৌন্দর্যের জন্য পুরুষরা স্বর্ণ পরতে না পারলেও, যদি কোনো অঙ্গহানি ঘটে বা চিকিৎসার জন্য একান্ত প্রয়োজন হয়, তবে চিকিৎসকের পরামর্শে স্বর্ণ ব্যবহার করা যাবে। তবে বিয়ের অনুষ্ঠান বা সামাজিক লোকদেখানো কোনো ফ্যাশনের জন্য এটি কখনই গ্রহণযোগ্য নয়।

বিয়েতে উপহার দেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের করণীয়

আমরা যারা সমাজে বসবাস করি, আমাদের উচিত এমন উপহার নির্বাচন করা যা অপরপক্ষের জন্য কল্যাণকর হয় এবং যা ব্যবহার করতে কোনো ধর্মীয় বাধা থাকে না। যেহেতু জামাইকে স্বর্ণের আংটি দিলে তিনি তা পরতে পারেন না, তাই বিয়ের উপহার দেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের কিছুটা সচেতন হওয়া দরকার।

আমরা চাইলে জামাইকে স্বর্ণের আংটির পরিবর্তে রূপার আংটি উপহার দিতে পারি। কারণ পুরুষদের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণের মধ্যে রূপার আংটি পরা জায়েজ রয়েছে। এছাড়া সুন্দর একটি হাতঘড়ি, জায়নামাজ, সুগন্ধি (আতর) বা অন্য কোনো প্রয়োজনীয় জিনিস উপহার দেওয়া যেতে পারে, যা জামাই সানন্দে সরাসরি ব্যবহার করতে পারবেন। এতে উপহারের মূল উদ্দেশ্য বা সার্থকতা বজায় থাকে।


একজন মুসলিমের জন্য আসল সৌন্দর্য ও মর্যাদা দামী সোনা-দানা বা অলংকারের মধ্যে লুকিয়ে নেই। মানুষের আসল মর্যাদা প্রকাশ পায় তার তাকওয়া, আল্লাহর বিধান মেনে চলা এবং সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন গড়ার মাধ্যমে। বিয়ের মতো একটি পবিত্র বন্ধনের শুরুতে আমরা যেন এমন কোনো কাজ না করি যা আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ হয়। তাই উপহার দেওয়া এবং নেওয়ার ক্ষেত্রে সর্বদা শরীয়তের নিয়মকে সবার আগে প্রাধান্য দেওয়া উচিত।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সর্বাধিক জনপ্রিয়

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সাম্প্রতিক মন্তব্য

- বিজ্ঞাপন-spot_img
error: Content is protected !!