বাংলাদেশের অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য একটি বড় খবর রয়েছে। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় এবং জাপানের সবচেয়ে বড় ব্যাংকিং গ্রুপ ‘মিতসুবিশি ইউএফজে ফিন্যান্সিয়াল গ্রুপ (এমইউএফজি)’ বাংলাদেশে তাদের একটি পূর্ণাঙ্গ শাখা স্থাপন করতে চায়। এতদিন ধরে তারা ঢাকায় একটি ছোট অফিসের মাধ্যমে কাজ করলেও, এখন তারা বড় পরিসরে ব্যাংকিং সেবা শুরু করার আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে এই আনন্দের খবরের পাশাপাশি একটি চিন্তার বিষয়ও সামনে এসেছে। জাপানের এই বিখ্যাত ব্যাংকটি বাংলাদেশের বর্তমান ব্যাংকিং খাতের উচ্চমাত্রার খেলাপি ঋণ পরিস্থিতি নিয়ে বেশ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
সম্প্রতি ব্যাংকটির একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও ডেপুটি গভর্নরের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন। সেই বৈঠকে বাংলাদেশে ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু করার ইচ্ছা প্রকাশের পাশাপাশি দেশের ঋণ আদায়ের পরিস্থিতি নিয়ে তারা নানা প্রশ্ন তোলেন।
এমইউএফজি ব্যাংক আসলে কী?
যাঁরা আন্তর্জাতিক অর্থনীতি সম্পর্কে খোঁজখবর রাখেন, তাঁরা ভালো করেই জানেন যে এমইউএফজি (MUFG) কোনো সাধারণ ব্যাংক নয়। এটি হলো জাপানের বৃহত্তম ব্যাংকিং গ্রুপ এবং পুরো পৃথিবীর অন্যতম সেরা ও শক্তিশালী আর্থিক প্রতিষ্ঠান। এই ব্যাংকটির মূল সদর দপ্তর জাপানের রাজধানী টোকিওতে অবস্থিত। জাপানের বেশ কয়েকটি বড় বড় ব্যাংক একসাথে একীভূত বা যুক্ত হয়ে এই বিশাল গ্রুপটি তৈরি করেছিল।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই ব্যাংকের চমৎকার উপস্থিতি রয়েছে। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা এবং ভিয়েতনামেও এই ব্যাংকের শাখা রয়েছে, যার মাধ্যমে তারা সফলভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছে। ১৯৯০ সাল থেকে, অর্থাৎ দীর্ঘ ৩৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে এমইউএফজি ব্যাংক ঢাকায় একটি ‘প্রতিনিধি অফিস’ বা রিপ্রেজেন্টেটিভ অফিস পরিচালনা করে আসছে। এখন তারা সেই ছোট অফিসটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক ব্যাংকে রূপান্তর করতে চাচ্ছে।
‘করিডোর ব্যাংকিং’ মডেলে কাজ করার পরিকল্পনা
জাপানের এই ব্যাংকটি বাংলাদেশে একটি বিশেষ পদ্ধতিতে কাজ করতে আগ্রহী, যাকে বলা হয় ‘করিডোর ব্যাংকিং’ (Corridor Banking)। সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, করিডোর ব্যাংকিং আসলে কী?
সহজ কথায় করিডোর ব্যাংকিং: করিডোর ব্যাংকিং হলো এমন একটি বিশেষ ব্যাংকিং ব্যবস্থা, যেখানে একটি দেশের ব্যাংক অন্য একটি নির্দিষ্ট দেশ বা অঞ্চলের সাথে বাণিজ্য, ব্যবসা, বিনিয়োগ এবং টাকা পয়সার লেনদেন সহজ করার জন্য কাজ করে। এটি মূলত দুটি দেশের অর্থনীতির মধ্যে একটি মজবুত আর্থিক সেতু বা ‘করিডোর’ হিসেবে কাজ করে।
এমইউএফজি ব্যাংক যদি বাংলাদেশে এই মডেলে কাজ শুরু করে, তবে জাপান এবং বাংলাদেশের মধ্যে ব্যবসা ও বিনিয়োগের একটি চমৎকার সেতু তৈরি হবে।
বাংলাদেশ ও জাপানের বাণিজ্য অর্থায়নে বড় উন্নতির আশা
বাংলাদেশে এমইউএফজি ব্যাংকের পূর্ণাঙ্গ শাখা চালু হলে আমাদের দেশের অর্থনীতিতে অনেক বড় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা। এর ফলে মূলত যে সুবিধাগুলো পাওয়া যাবে তা নিচে দেওয়া হলো:
১. জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে
বিদেশি বড় বড় কোম্পানিগুলো যখন কোনো দেশে ব্যবসা করতে যায়, তখন তারা সাধারণত তাদের নিজেদের দেশের বা পরিচিত ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেন করতে বেশি পছন্দ ও স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। বাংলাদেশে এই জাপানি ব্যাংকটি এলে এখানে কাজ করা জাপানি কোম্পানিগুলোর জন্য করপোরেট ঋণ নেওয়া, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন এবং বিনিয়োগ করা অনেক সহজ হবে। ফলে বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বহুগুণ বাড়বে।
২. আমদানি-রপ্তানি সহজ হবে
আমাদের দেশের ব্যবসায়ী বা আমদানি-রপ্তানিকারকদের জন্য লেটার অব ক্রেডিট (এলসি), ব্যাংক গ্যারান্টি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যান্য সুবিধাগুলো অনেক দ্রুত পাওয়া যাবে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের খরচ এবং সময় দুটোই অনেক কমে আসবে।
৩. জাইকা (JICA) এর সাথে লেনদেন সহজ হবে
জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন Agency বা জাইকা বাংলাদেশে অনেক বড় বড় উন্নয়নমূলক কাজ করছে। জাইকা তাদের আর্থিক লেনদেনের একটি বিশাল অংশ এই এমইউএফজি ব্যাংকের মাধ্যমেই করে থাকে। বাংলাদেশে এই ব্যাংকের শাখা থাকলে জাইকার অর্থায়নে চলা প্রকল্পগুলোর টাকা পয়সার লেনদেন খুব দ্রুত হবে এবং কোনো জটিলতা বা দীর্ঘসূত্রতা থাকবে না।
৪. দেশের ভাবমূর্তি উন্নত হবে
বিশ্বের এত বড় একটি ব্যাংক যখন বাংলাদেশে পূর্ণাঙ্গ শাখা খুলবে, তখন আন্তর্জাতিক বাজারে বিনিয়োগের গন্তব্য হিসেবে বাংলাদেশের সুনাম ও ভাবমূর্তি অনেক শক্তিশালী হবে। এটি দেখে অন্যান্য দেশের বড় বড় কোম্পানিও বাংলাদেশে আসতে উৎসাহিত হবে।
বর্তমানে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে বছরে প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন ডলারের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য হয়। এর মধ্যে বাংলাদেশ জাপানে প্রায় ১.৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য পাঠায় এবং জাপান থেকে ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি পণ্য আমদানি করে। এই নতুন ব্যাংকিং সুবিধা চালু হলে বাণিজ্যের পরিমাণ আরও অনেক বাড়বে।
খেলাপি ঋণ নিয়ে এমইউএফজি ব্যাংকের যত ভয় ও উদ্বেগ
সব ভালো খবরের মাঝেও জাপানি এই ব্যাংকটির একটি বড় চিন্তার কারণ হলো বাংলাদেশের বর্তমান খেলাপি ঋণ (Default Loan) পরিস্থিতি। বৈঠকে তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে জানতে চেয়েছে, বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা যেভাবে খেলাপি ঋণের চাপে রয়েছে, এই পরিস্থিতিতে নতুন করে শাখা খোলার সিদ্ধান্ত কতটা সঠিক বা উপযুক্ত হবে?
তারা আরও জানতে চেয়েছে, বাংলাদেশে বিদেশি ব্যাংকগুলোর ব্যবসা পরিচালনা এবং ভবিষ্যতে এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিকল্পনা আসলে কী।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের আশ্বাস
জাপানি প্রতিনিধি দলের এই উদ্বেগের জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর তাদের আশ্বস্ত করেছেন এবং দেশের বর্তমান পরিস্থিতি পরিষ্কার করে ব্যাখ্যা করেছেন।
- প্রকৃত চিত্র প্রকাশ: গভর্নর স্বীকার করেছেন যে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণের আসল তথ্য কিছুটা কম দেখানো হয়েছিল। তবে বর্তমানে চলমান ‘আসেট কোয়ালিটি রিভিউ’ (AQR)-এর মাধ্যমে প্রকৃত ও সঠিক চিত্রটি বের করে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।
- বিদেশি ব্যাংকগুলোর সাফল্য: গভর্নর প্রতিনিধি দলকে মনে করিয়ে দেন যে, বাংলাদেশে বর্তমানে যেসব বিদেশি ব্যাংক কাজ করছে, তাদের খেলাপি ঋণের হার কিন্তু আমাদের দেশি ব্যাংকগুলোর চেয়ে অনেক কম। তাই এমইউএফজি ব্যাংক এখানে শাখা খুললে সফলভাবেই ব্যবসা করতে পারবে।
- ভবিষ্যতে ঋণ কমার আশা: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে, আগামী বছরগুলোতে এই খেলাপি ঋণের হার কমে আসবে বলে তারা আশা করছেন। এছাড়া দুর্বল ব্যাংকগুলোর সমস্যাগ্রস্ত সম্পদ বা খেলাপি ঋণ সামলানোর জন্য বিদেশি বিনিয়োগের যে সুযোগ রয়েছে, সে বিষয়েও জাপানি দলকে জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জাপানের এই শীর্ষ ব্যাংকটিকে বাংলাদেশে পূর্ণাঙ্গ শাখা খুলতে এবং সাধারণ ব্যাংকিং সেবা শুরু করতে পুরো দমে উৎসাহিত করেছে। গভর্নর আশ্বস্ত করেছেন যে, এই ধরনের বড় উদ্যোগ সফল করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক সব ধরনের নীতিগত ও আইনি সহায়তা দিতে প্রস্তুত রয়েছে।








