সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের দেশে পর পর কয়েকটি ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে। সবচেয়ে চিন্তার বিষয় হলো, প্রতিবারই দেখা যাচ্ছে এসব ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ঢাকার খুব কাছাকাছি এলাকায়। গত সোমবার হঠাৎ করেই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে একটি মৃদু ভূমিকম্প অনুভূত হয়। ৪ মাত্রার এই ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকার ঠিক পার্শ্ববর্তী জেলা নারায়ণগঞ্জে, যা ঢাকার আগারগাঁও থেকে মাত্র ১৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এর আগের কয়েকটি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল গাজীপুর ও নরসিংদী এলাকায়। ঢাকার এত কাছে ভূমিকম্পের প্রধান কেন্দ্র বা উৎপত্তিস্থল হওয়ায় নগরবাসীর মনে নতুন করে তীব্র উদ্বেগ ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ১লা জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ২২শে জুন পর্যন্ত বাংলাদেশ এবং এর সীমান্তবর্তী এলাকায় যতগুলো ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়েছে, তার মধ্যে বেশ কয়েকটির উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকার একদম কাছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, চলতি বছরের ১লা ফেব্রুয়ারি গাজীপুরের কালিয়াকৈরে ৩.২ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়, যার দূরত্ব ঢাকা থেকে ছিল মাত্র ৪২ কিলোমিটার।
নরসিংদীর সেই শক্তিশালী কাঁপন ও ক্ষয়ক্ষতি
ঢাকার কাছে হওয়া ভূমিকম্পগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসেছিল গত বছর। ২০২৫ সালের ২১শে নভেম্বর ৫.৭ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা। এই ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদীর মাধবদীতে, যা ঢাকা থেকে মাত্র ১৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এটিকে দেশের গত কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম শক্তিশালী ভূমিকম্প হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।
মাধব্দীর এই ভূমিকম্পে ঢাকায় ৪ জন, নরসিংদীতে ৫ জন এবং নারায়ণগঞ্জে ১ জনসহ মোট ১০ জন প্রাণ হারান এবং সাড়ে চার শতাধিক মানুষ আহত হন। এই ঘটনার ঠিক পরদিন, ২২শে নভেম্বর নরসিংদীর পলাশে ৩.৩ মাত্রার এবং একই দিনে ঢাকার বাড্ডায় ৩.৭ মাত্রার আরও দুটি ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়।
কেন ঢাকার আশপাশে এত ভূমিকম্প হচ্ছে?
ঢাকার আশপাশে কেন বারবার এমন কম্পন হচ্ছে, তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবায়েত কবীর। তাঁর মতে, মাটির নিচে টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়ার কারণেই এটি হচ্ছে:
- ইন্ডিয়ান প্লেটের চাপ: বাংলাদেশের উত্তর দিকে থাকা হিমালয়ের নিচে ইউরেশিয়ান প্লেটের ওপর ইন্ডিয়ান প্লেট অনবরত চাপ তৈরি করছে। এই কারণে ওই পুরো অঞ্চলটি প্রচণ্ড ভূমিকম্পপ্রবণ।
- বার্মা প্লেটের প্রভাব: এর বাইরে তুলনামূলকভাবে ছোট আকারের ‘বার্মা প্লেট’ বাংলাদেশের ভূখণ্ডে ক্রমাগত চাপ দিয়ে যাচ্ছে। এই দুই প্লেটের মধ্যকার চাপের কারণেই মূলত আমাদের এখানে ঘন ঘন ছোটখাটো ভূমিকম্প হচ্ছে।
এগুলো কি রাজধানীতে বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস?
ঢাকার আশপাশে একের পর এক ভূমিকম্পের সৃষ্টি হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে এগুলো কি রাজধানীতে বড় কোনো ভূমিকম্পের পূর্বাভাস বা সংকেত? তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার আশপাশের এই ছোটখাটো ভূমিকম্প নিয়ে এখনই অতিরিক্ত আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও খ্যাতনামা ভূমিকম্প গবেষক মেহেদি আহমেদ আনসারী জানান, সম্প্রতি ঢাকার কাছাকাছি যেসব ছোট বা মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প হচ্ছে, সেগুলো থেকে বড় ধরনের ভবনধস বা ব্যাপক প্রাণহানির সরাসরি কোনো আশঙ্কা নেই।
তাঁর মতে, ঢাকা শহরের ভেতরে সেভাবে বড় কোনো ফল্ট লাইন (মাটির নিচের ফাটল) নেই। ঢাকার আশপাশে যেগুলো হচ্ছে, সেগুলো মূলত ছোট ও স্থানীয় ফল্ট লাইনের কারণে হচ্ছে। যেহেতু ঐতিহাসিকভাবে এই অঞ্চলে অতীতে বড় কোনো ভূমিকম্প হওয়ার রেকর্ড নেই, তাই আমরা এখনই বলতে পারি না যে এটি সামনে আমাদের জন্য খুব বড় ঝুঁকি তৈরি করবে।
আসল বিপদ যেখানে: ৭ মাত্রার ভূমিকম্পের হুমকি
ঢাকার আশপাশে বড় ফল্ট লাইন না থাকলেও অধ্যাপক মেহেদি আহমেদ আনসারী সতর্ক করে বলেছেন, দেশের অন্যান্য প্রান্ত বা প্রতিবেশী দেশগুলোর বড় ফল্ট লাইন থেকে কিন্তু ঢাকার জন্য বড় বিপদের আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, ঐতিহাসিকভাবে ৭ বা তার চেয়ে বেশি মাত্রার ভূমিকম্প সৃষ্টি করতে সক্ষম ফল্টগুলো। ভবিষ্যতে বড় ধরনের ভূমিকম্পের আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি রয়েছে দুটি এলাকায়:
- শ্রীমঙ্গল এলাকা: ১৯১৮ সালে সিলেটের শ্রীমঙ্গলে ৭.৬ মাত্রার একটি প্রলয়ঙ্কারী ভূমিকম্প হয়েছিল।
- বগুড়ার শেরপুর এলাকা: ১৮৮৫ সালে বগুড়ার শেরপুর এলাকায় ৭.১ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়েছিল।
বুয়েটের এই অধ্যাপক আরও জানান, প্রতিটি বড় ভূমিকম্পের একটি নির্দিষ্ট ‘রিটার্ন পিরিয়ড’ বা ফিরে আসার সময়কাল থাকে। ঢাকা থেকে ২৩০ কিলোমিটার দূরে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে যে বিশাল ভূমিকম্প হয়েছিল, তার রিটার্ন পিরিয়ড প্রায় সাড়ে ৩০০ বছর, যা হয়তো ২২৫০ সালের আশেপাশে পুনরায় হতে পারে। কিন্তু ৭ মাত্রার ভূমিকম্পগুলোর রিটার্ন পিরিয়ড সাধারণত ১৫০ থেকে ২০০ বছরের মাঝে হয়ে থাকে। সেই হিসাব অনুযায়ী, ৭ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প ঢাকায় শিগগিরই আসার বড় সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এটি ঠিক কবে হবে, তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়; এতে আরও ২০ বছরও লেগে যেতে পারে।
ভূমিকম্প হলে ঢাকার চিত্র কেমন হবে?
২০০৯ সালে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) এবং কমপ্রিহেনসিভ ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রাম (সিডিএমপি) যৌথভাবে একটি জরিপ পরিচালনা করেছিল। সেই জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় মোট বাসযোগ্য স্থাপনা বা ভবন রয়েছে প্রায় ২১ লাখ।
জরিপের ভয়ঙ্কর তথ্য: ২১ লাখ ভবনের মধ্যে ১৫ লাখই হলো ছোট বিল্ডিং বা টিনশেড ঘর, যা ভেঙে পড়লে ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কা কিছুটা কম। কিন্তু বাকি ৬ লাখ ভবন হলো ছয়তলার ওপরে। যদি কোনো কারণে দেশে ৭ মাত্রার একটি বড় ভূমিকম্প আঘাত হানে, তবে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা এই ৬ লাখ ভবনের মধ্যে প্রায় ৭২ হাজার ভবন মুহূর্তের মধ্যে ধসে পড়তে পারে!
আমাদের করণীয় ও ঝুঁকির কারণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, সঠিক বিল্ডিং কোড না মানা, দুর্বল নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার এবং দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতির চরম ঘাটতি আমাদের ভূমিকম্পের ঝুঁকিকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে তুলেছে। অত্যন্ত চিন্তার বিষয় হলো, ঢাকা শহরের মাত্র ৫ থেকে ৭ শতাংশ ভবন ভূমিকম্প সহনশীল বা আর্থকোয়েক প্রুফ হিসেবে তৈরি করা হয়েছে।
তাই এখনই আতঙ্কিত না হয়ে সরকারের উচিত দ্রুত ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো চিহ্নিত করা এবং ধাপে ধাপে সেগুলোকে রেট্রোফিটিং বা উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে শক্তিশালী ও ভূমিকম্প সহনশীল করে গড়ে তোলা। একমাত্র সঠিক প্রস্তুতি এবং সচেতনতাই পারে আমাদের এই বড় বিপদের হাত থেকে রক্ষা করতে।








