বর্তমান যুগে আমাদের জীবনযাত্রায় অনেক পরিবর্তন এসেছে। এখন অনেক নারীই নিজের ক্যারিয়ার গড়া, উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করা কিংবা আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার পর বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন। আর এই কারণে সন্তান নেওয়ার বয়সটাও আগের চেয়ে কিছুটা পিছিয়ে যাচ্ছে। আজকাল অনেক নারীর ক্ষেত্রেই প্রথমবার মা হওয়ার বয়স ৩০ বা তার চেয়ে বেশি হয়ে যাচ্ছে।
দেরিতে সন্তান নেওয়া বা মাতৃত্বের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে আমাদের সমাজে নানা ধরনের কথা প্রচলিত আছে। অনেকের মনেই এটি নিয়ে নানা ভয়, উদ্বেগ এবং প্রশ্ন কাজ করে। চিকিৎসাবিজ্ঞান ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বয়স অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তবে বয়সই একমাত্র শেষ কথা নয়। সঠিক তথ্য জানা থাকলে এবং সঠিক সময়ে ডাক্তারের পরামর্শ নিলে অনেক জটিলতা এড়ানো সম্ভব। আজকের প্রতিবেদনে আমরা আলোচনা করব ৩০ বছরের পর সন্তান নিলে কী কী ধরনের প্রতিবন্ধকতা বা ঝুঁকি আসতে পারে এবং এই বিষয়ে আপনার কী করণীয়।
বয়স বাড়ার সাথে নারীর উর্বরতা কীভাবে কমে?
নারীদের মা হওয়ার ক্ষমতার সাথে তাদের বয়সের একটি সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। এটি সম্পূর্ণ একটি প্রাকৃতিক বিষয়। ভারতের নামকরা গাইনোকোলজিস্ট এবং আইভিএফ (IVF) বিশেষজ্ঞরা এই বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য দিয়েছেন, যা প্রতিটি নারীর জানা উচিত।
ডিম্বাণুর সংখ্যা ও গুণগত মান
একজন নারী যখন জন্ম নেন, তখন তিনি নির্দিষ্ট সংখ্যক ডিম্বাণু নিয়ে জন্মান। পুরুষদের শরীরে যেমন নিয়মিত নতুন শুক্রাণু তৈরি হয়, নারীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি তেমন নয়। জন্মের পর নারীদের শরীরে নতুন করে আর কোনো ডিম্বাণু তৈরি হয় না। তাই বয়স বাড়ার সাথে সাথে শরীরে থাকা ডিম্বাণুর সংখ্যা কমতে শুরু করে। শুধু সংখ্যাই নয়, বয়সের সাথে সাথে ডিম্বাণুর গুণগত মান বা কোয়ালিটিও খারাপ হতে থাকে। যার ফলে গর্ভধারণ করা আগের চেয়ে কঠিন হয়ে পড়ে।
বয়স অনুযায়ী গর্ভধারণের সম্ভাবনা
চিকিৎসকদের মতে, বয়স ভেদে প্রতি মাসে একজন নারীর স্বাভাবিকভাবে গর্ভধারণের ক্ষমতা ভিন্ন হয়। নিচে এর একটি গড় হিসাব দেওয়া হলো:
- ২০ বছরের শুরুতে: এই বয়সে একজন নারীর প্রজনন ক্ষমতা বা ফার্টিলিটি সবচেয়ে বেশি থাকে। প্রতি মাসে স্বাভাবিকভাবে গর্ভধারণের সম্ভাবনা থাকে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ।
- ৩০ বছরের পর: ৩০ বছর পার হওয়ার পর থেকে এই সম্ভাবনা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। বিশেষ করে ৩৫ বছর পার হয়ে যাওয়ার পর এই উর্বরতা কমার গতি অনেক বেশি বেড়ে যায়।
- ৪০ বছর বয়সে: যখন একজন নারীর বয়স ৪০ বছরে পৌঁছায়, তখন তার স্বাভাবিক নিয়মে গর্ভধারণের সম্ভাবনা মাত্র ৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে।
আইভিএফ (IVF) কি বয়সের ক্ষতিপূরণ করতে পারে?
আজকাল চিকিৎসা প্রযুক্তির অনেক উন্নতি হয়েছে। সন্তান হতে দেরি হলে বা স্বাভাবিকভাবে গর্ভধারণে সমস্যা হলে অনেকেই আইভিএফ (IVF) প্রযুক্তির কথা ভাবেন।
আইভিএফ কী এবং এটি কীভাবে কাজ করে?
আইভিএফ-এর পূর্ণ রূপ হলো ‘ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন’ (In Vitro Fertilization)। এটিকে সাধারণ ভাষায় অনেকেই ‘টেস্টটিউব বেবি’ বলে থাকেন। এটি এমন একটি আধুনিক পদ্ধতি, যেখানে ল্যাবরেটরির ভেতরে কৃত্রিম উপায়ে নারীর ডিম্বাণু এবং পুরুষের শুক্রাণুর মিলন ঘটিয়ে একটি ভ্রূণ তৈরি করা হয়। পরবর্তীতে সেই ভ্রূণটি সফলভাবে নারীর জরায়ুতে স্থাপন করা হয়।
বয়সভেদে আইভিএফ-এর সফলতার হার
অনেকের মনে একটি ভুল ধারণা রয়েছে যে, বয়স যতই হোক না কেন, আইভিএফ করলেই সন্তান পাওয়া সম্ভব। কিন্তু চিকিৎসকরা বলছেন, আইভিএফ প্রযুক্তিও বয়সের প্রভাবকে পুরোপুরি দূর করতে পারে না। বয়স বাড়লে আইভিএফ-এর সফলতার হারও কমতে থাকে। যেমন:
- ৩০ থেকে ৩৪ বছর বয়স: এই বয়সী নারীদের ক্ষেত্রে আইভিএফ-এর মাধ্যমে একটি সুস্থ ও জীবিত সন্তান জন্ম দেওয়ার সফলতার হার প্রায় ৪৩ শতাংশ।
- ৩৫ থেকে ৩৯ বছর বয়স: এই বয়সে সফলতার হার কমে গিয়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩১ শতাংশে।
- ৪০ থেকে ৪৪ বছর বয়স: এই বয়সে পৌঁছালে আইভিএফ-এর সফলতার হার আশঙ্কাজনকভাবে কমে মাত্র ১১ শতাংশে নেমে আসে।
তাই দেখা যাচ্ছে যে, আইভিএফ একটি দারুণ সহায়ক পদ্ধতি হলেও এটি বয়সজনিত সমস্যাকে ম্যাজিকের মতো দূর করতে পারে না।
৩৫ বছরের পর গর্ভধারণের প্রধান স্বাস্থ্যঝুঁকিগুলো কী কী?
চিকিৎসকদের মতে, কোনো নারী যদি ৩৫ বছর বয়সের পর গর্ভবতী হন, তবে তার এবং তার অনাগত সন্তানের শরীরে কিছু স্বাস্থ্যঝুঁকি সাধারণের তুলনায় একটু বেশি দেখা যায়। এই ঝুঁকিগুলো সম্পর্কে আগে থেকে সচেতন থাকা ভালো।
১. গর্ভপাতের উচ্চ আশঙ্কা
বয়স বেড়ে যাওয়ার কারণে ডিম্বাণুর মান দুর্বল হয়ে পড়ে। দুর্বল ডিম্বাণুর কারণে অনেক সময় গর্ভের ভ্রূণটি সঠিকভাবে বেড়ে উঠতে পারে না। এর ফলে গর্ভধারণের প্রথম কয়েক সপ্তাহের মধ্যে গর্ভপাত বা মিসক্যারেজ হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।
২. গর্ভকালীন ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ
দেরিতে মা হওয়ার কারণে গর্ভাবস্থায় শরীরে নানা ধরনের হরমোনজনিত সমস্যা দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ হলো গর্ভকালীন ডায়াবেটিস (Gestational Diabetes) এবং উচ্চ রক্তচাপ বা প্রেক্ল্যাম্পসিয়া। এই দুটি সমস্যা মা এবং শিশু উভয়ের জন্যই বিপজ্জনক হতে পারে।
৩. সিজারিয়ান বা সি-সেকশনের প্রয়োজনীয়তা
বয়স বাড়ার সাথে সাথে নারীদের জরায়ুর মাংসপেশির কার্যক্ষমতা কিছুটা কমে যেতে পারে। এছাড়া অন্যান্য শারীরিক জটিলতার কারণে দেরিতে সন্তান নিলে স্বাভাবিক প্রসব বা নরমাল ডেলিভারির সম্ভাবনা কমে যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের সিজারিয়ান অপারেশন বা সি-সেকশনের সাহায্য নিতে হয়।
৪. শিশুর ক্রোমোজোমজনিত বা জন্মগত জটিলতা
অধিক বয়সে গর্ভধারণ করলে শিশুর শরীরে কিছু জন্মগত ত্রুটি বা ক্রোমোজোমজনিত সমস্যা দেখা দেওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত হলো ‘ডাউন সিনড্রোম’। ডিম্বাণুর বয়স বেড়ে যাওয়ার কারণেই মূলত শিশুর এই ধরনের জিনগত ত্রুটি হয়ে থাকে।
একটি ইতিবাচক দিক: এসব ঝুঁকির কথা শুনে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। বর্তমান উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থার কারণে ৩০ বা ৩৫ বছরের পরেও পৃথিবীর লাখ লাখ নারী একদম সুস্থভাবে গর্ভধারণ করছেন এবং ফুটফুটে সুস্থ সন্তানের জন্ম দিচ্ছেন। ভয় না পেয়ে দরকার সঠিক পরিকল্পনা ও সচেতনতা।
শুধু নারী নয়, পুরুষের বয়সও কি গুরুত্বপূর্ণ?
সন্তান জন্মদানের কথা আসলেই সাধারণত সব দোষ বা গুণ নারীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, সন্তান নেওয়ার ক্ষেত্রে শুধু নারীর বয়স নয়, পুরুষের বয়সও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
সাধারণত ৪৫ বছর বয়সের পর থেকে পুরুষদের শুক্রাণুর বা স্পার্মের কার্যক্ষমতা এবং গুণগত মান ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। বয়স্ক পুরুষের শুক্রাণুর কারণেও গর্ভপাতের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। এছাড়া শিশুর সঠিক মানসিক ও শারীরিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই দেরিতে সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করলে স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের স্বাস্থ্যের দিকেই নজর দেওয়া উচিত।
দেরিতে সন্তান নিতে চাইলে আগে থেকে কী প্রস্তুতি নেবেন?
আপনি যদি আপনার ক্যারিয়ার বা অন্য কোনো কারণে ৩০ বা ৩৫ বছরের পর সন্তান নেওয়ার কথা ভাবেন, তবে আপনার জন্য চিকিৎসকরা কিছু বিশেষ পরামর্শ দিয়েছেন। এই প্রস্তুতিগুলো নিলে ভবিষ্যতের জটিলতা অনেকখানি কমিয়ে আনা সম্ভব।
নিয়মিত গাইনোকোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া
সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার অন্তত কয়েক মাস আগে থেকেই একজন ভালো গাইনোকোলজিস্ট বা বন্ধ্যাত্ব বিশেষজ্ঞের কাছে যান। আপনার শরীরের বর্তমান অবস্থা কেমন, তা পরীক্ষা করে নিন।
উর্বরতা বা ফার্টিলিটি পরীক্ষা করানো
ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী কিছু পরীক্ষা যেমন- এএমএইচ (AMH) টেস্ট এবং আল্ট্রাসোনোগ্রাফি করে জেনে নিন আপনার জরায়ু এবং ডিম্বাণুর অবস্থা কেমন আছে। এছাড়া আপনার পরিবারে যদি দেরিতে সন্তান হওয়া বা বন্ধ্যাত্বের কোনো ইতিহাস থাকে, তবে সেটিও ডাক্তারকে জানান।
ডিম্বাণু সংরক্ষণ বা এগ ফ্রিজিং
এটি বর্তমান যুগের একটি অত্যন্ত আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি। যদি কোনো নারী নিশ্চিত জানেন যে তিনি ৩৫ বা ৪০ বছর বয়সের আগে সন্তান নেবেন না, তবে তিনি তার ২৫ থেকে ৩০ বছর বয়সের মধ্যে সুস্থ ও উন্নত মানের ডিম্বাণু ল্যাবরেটরিতে সংরক্ষণ বা ফ্রিজ করে রাখতে পারেন। পরবর্তীতে তিনি এই ডিম্বাণু ব্যবহার করে আইভিএফ পদ্ধতির মাধ্যমে মা হতে পারবেন।
সুস্থ জীবনযাত্রা ও পুষ্টিকর খাবার
দেরিতে মা হতে চাইলে শরীরকে ফিট রাখা সবচেয়ে জরুরি। ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন, প্রতিদিন সুষম ও পুষ্টিকর খাবার খান। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ফলিক অ্যাসিড ও অন্যান্য ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট খাওয়া শুরু করুন। ধূমপান, মদ্যপান বা অতিরিক্ত চা-কফি খাওয়ার অভ্যাস থাকলে তা বর্জন করুন।
সচেতনতাই আসল সমাধান
পরিশেষে বলা যায়, ৩০ বা ৩৫ বছরের পর মা হওয়া কোনো ভুল বা অপরাধের সিদ্ধান্ত নয়। সমসাময়িক যুগে এটি অত্যন্ত সাধারণ একটি বিষয়। তবে এই সিদ্ধান্তটি নেওয়ার সময় অবশ্যই আপনাকে সচেতন এবং তথ্যভিত্তিক হতে হবে। নিজের বর্তমান বয়স, শারীরিক অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা মাথায় রেখে একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলুন। সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নিলে দেরিতেও মাতৃত্বের স্বাদ নেওয়া এবং একটি সুস্থ সুন্দর সন্তান পৃথিবীর আলোয় আনা পুরোপুরি সম্ভব।








