হটলাইনঃ +৮৮০ ৯৬১৩ ০০০ ২০০ |
বুধবার, জুন ২৪, ২০২৬
- বিজ্ঞাপন-spot_img
Homeলাইফ স্টাইলআম খাওয়ার নিয়ম: দিনে কতটুকু আম খাওয়া আমাদের শরীরের জন্য ভালো?
spot_img

আম খাওয়ার নিয়ম: দিনে কতটুকু আম খাওয়া আমাদের শরীরের জন্য ভালো?

গ্রীষ্মকাল মানেই মধুমাস, আর মধুমাস মানেই বাজারে রসালো ও মিষ্টি আমের সমাহার। আম পছন্দ করেন না, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া সত্যিই কঠিন। বাজারে এখন হিমসাগর প্রায় শেষের পথে হলেও ফজলি, ল্যাংড়াসহ আরও নানা জাতের আম দেদারসে বিক্রি হচ্ছে। আমের মিষ্টি সুবাস আর চমৎকার স্বাদ আমাদের সবাইকে লোভাতুর করে তোলে। অনেকেই আছেন যারা আম দেখলে নিজেদের সামলাতে পারেন না এবং একসঙ্গে বেশ কয়েকটি আম খেয়ে ফেলেন।

আম অত্যন্ত পুষ্টিকর এবং উপকারী একটি ফল। এতে শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় অনেক উপাদান রয়েছে। তবে পুষ্টিবিদদের মতে, যেকোনো উপকারী খাবারও যদি অতিরিক্ত পরিমাণে খাওয়া হয়, তবে তা শরীরের জন্য উপকারের চেয়ে ক্ষতিই বেশি করে। তাই সুস্থ থাকতে হলে আমাদের জানতে হবে দিনে ঠিক কতটুকু আম খাওয়া উচিত এবং অতিরিক্ত আম খেলে কী কী সমস্যা হতে পারে।

আমের পুষ্টিগুণ এবং মানবশরীরে এর উপকারিতা

আমকে ফলের রাজা বলা এমনি এমনি বলা হয় না। এর মধ্যে রয়েছে নানাবিধ পুষ্টিগুণ যা আমাদের শরীরকে সতেজ ও রোগমুক্ত রাখতে সাহায্য করে। আসুন জেনে নেওয়া যাক আম আমাদের শরীরে কী কী উপকার করে:

ভিটামিন ও খনিজের দারুণ উৎস

আমে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ‘সি’ এবং ভিটামিন ‘এ’ রয়েছে। ভিটামিন ‘সি’ আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং ত্বকের উজ্জ্বলতা ধরে রাখতে সাহায্য করে। অন্যদিকে, ভিটামিন ‘এ’ আমাদের চোখের দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখে। এ ছাড়া আমে বিভিন্ন ধরনের খনিজ বা মিনারেল রয়েছে, যা শরীরের পুষ্টির ঘাটতি পূরণ করে।

দ্রুত শক্তি এবং পানির জোগান দেয়

গরমে আমাদের শরীর থেকে প্রচুর পানি ঘামের মাধ্যমে বের হয়ে যায়। আমে থাকা জলীয় অংশ শরীরের পানির অভাব দূর করতে সাহায্য করে। পাশাপাশি আমে প্রাকৃতিক শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট থাকার কারণে এটি খাওয়ার সাথে সাথে আমাদের শরীরে দ্রুত শক্তি জোগাতে সাহায্য করে। তীব্র গরমে এক গ্লাস আমের রস বা একটি গোটা আম আপনাকে নিমেষেই চাঙ্গা করে তুলতে পারে।

অ্যান্টি-অক্সিডেন্টের কার্যকারিতা

আমে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট। এই উপাদানটি আমাদের শরীরের কোষগুলোকে ক্ষতিকর ভাইরাসের হাত থেকে রক্ষা করে এবং ক্যানসারের মতো মারাত্মক রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে।

দিনে কয়টি আম খাওয়া নিরাপদ?

আম উপকারী ফল হলেও দিনে এটি কতটুকু খাওয়া উচিত, তা জানা জরুরি। একটি বড় আকারের আম খাওয়া আর একবেলা ভরপেট খাবার খাওয়া প্রায় সমান কথা। তাহলে একজন সুস্থ মানুষ দিনে কয়টি আম খেতে পারেন?

পুষ্টিবিদদের মতে, একজন সুস্থ মানুষের জন্য দিনে এক থেকে দুটির বেশি মাঝারি আকারের আম খাওয়া একদমই উচিত নয়। আপনি যদি সুস্থ থাকতে চান এবং আমের সম্পূর্ণ পুষ্টি পেতে চান, তবে এই নিয়মটি মেনে চলা ভালো। অতিরিক্ত আম খেলে শরীরে ক্যালোরির মাত্রা অনেক বেড়ে যায়, যা পরবর্তীতে বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার সৃষ্টি করে।

আম খাওয়ার ক্ষেত্রে ক্যালোরির হিসাব: পুষ্টিবিদদের মতামত

আম খাওয়ার ক্ষেত্রে আমরা কয়টি আম খাচ্ছি, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো আমের আকার এবং তাতে থাকা ক্যালোরির পরিমাণ। বিশেষ করে যারা নিজেদের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে চান, তাদের জন্য ক্যালোরির হিসাব জানা খুবই জরুরি।

পুষ্টিবিদ জুহি কাপুরের পরামর্শ

এই বিষয়ে বিখ্যাত পুষ্টিবিদ জুহি কাপুর বলেছেন, আমের সংখ্যা দিয়ে বিচার না করে আমাদের আমের আকার ও ক্যালোরির দিকে নজর দেওয়া উচিত। কারণ একেক জাতের আমের মিষ্টত্ব এবং ফাইবারের পরিমাণ একেক রকম হয়।

তিনি আমের ক্যালোরির একটি সহজ হিসাব দিয়েছেন:

  • ছোট আকারের আম: একটি ছোট আকারের আম বা একটি বড় আমের অর্ধেক অংশ থেকে আমাদের শরীর প্রায় ১২৫ থেকে১৩০ কিলোক্যালোরি পায়।
  • মাঝারি থেকে বড় আম: একটি মাঝারি বা বড় মাপের আম থেকে প্রায় ২৫০ থেকে ৩৫০ কিলোক্যালোরি পর্যন্ত মিলতে পারে।

তাই আপনি যদি ডায়েট বা ওজন কমানোর জার্নিতে থাকেন, তবে আম খাওয়ার সময় অবশ্যই এর আকারের দিকে খেয়াল রাখবেন।

অতিরিক্ত আম খাওয়ার অপকারিতা বা ক্ষতি

আম যতই সুস্বাদু হোক না কেন, এটি অতিরিক্ত মাত্রায় খেলে শরীরে বেশ কিছু নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। আসুন জেনে নিই বেশি আম খাওয়ার ফলে কী কী বিপদ হতে পারে:

হজমের সমস্যা ও পেট খারাপ

আমে প্রচুর পরিমাণে প্রাকৃতিক শর্করা বা ফ্রুক্টোজ থাকে। এর পাশাপাশি এতে ডায়েটরি ফাইবারও রয়েছে। অল্প পরিমাণে খেলে এটি কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে এবং হজমে সাহায্য করে। কিন্তু কেউ যদি একবারে ২-৩টি বড় আম খেয়ে ফেলেন, তবে শরীরে ফ্রুক্টোজের পরিমাণ অনেক বেড়ে যায়। এর ফলে পেটে গ্যাস, পেটব্যথা এবং বদহজমের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। এমনকি অতিরিক্ত আম খাওয়ার কারণে পেট খারাপ বা ডায়রিয়াও হতে পারে।

রক্তে শর্করার বা সুগারের মাত্রা বৃদ্ধি

আমে থাকা প্রাকৃতিক চিনি বা ফ্রুক্টোজ রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা দ্রুত বাড়িয়ে দিতে পারে। যারা অতিরিক্ত আম খান, তাদের রক্তে শর্করার মাত্রা আচমকা বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। এটি দীর্ঘমেয়াদে শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

ওজন বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি

যেহেতু আমে উচ্চ মাত্রায় ক্যালোরি থাকে, তাই প্রতিদিন প্রয়োজনের চেয়ে বেশি আম খেলে শরীরের ওজন দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। যারা ওজন কমাতে চাচ্ছেন, তাদের অবশ্যই পরিমিত পরিমাণে আম খাওয়া উচিত।

ডায়বেটিস রোগীরা কি আম খেতে পারবেন?

অনেকের মনেই একটি সাধারণ প্রশ্ন থাকে যে, ডায়বেটিস রোগীরা আম খেতে পারবেন কি না। যেহেতু আম অনেক মিষ্টি, তাই অনেকেই মনে করেন ডায়বেটিস রোগীদের জন্য আম খাওয়া সম্পূর্ণ নিষেধ। তবে আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞান ভিন্ন কথা বলে।

পুষ্টিবিদ অনন্যা ভৌমিকের নির্দেশিকা

এই বিষয়ে পুষ্টিবিদ অনন্যা ভৌমিক অত্যন্ত সুন্দর একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, দিনে কেউ ঠিক কয়টি আম খেতে পারবেন, তা এককথায় বলা সম্ভব নয়। এটি একেকজন মানুষের শারীরিক অবস্থা এবং দৈনন্দিন ক্যালোরির চাহিদার ওপর নির্ভর করে।

ডায়বেটিস রোগীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ডায়বেটিস রোগীরাও আম খেতে পারবেন। তবে তা খেতে হবে নিয়ম মেনে। বিকেলের বা সকালের হালকা খাবার বা ‘স্ন্যাক্স’ হিসেবে ডায়বেটিস রোগীরা আম খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন। তবে এর একটি নির্দিষ্ট মাত্রা থাকা দরকার। একজন ডায়বেটিস রোগী দিনে বড় জোর একটি মাঝারি আকারের আম খেতে পারেন, তার বেশি কোনোভাবেই নয়। আর আম খাওয়ার দিন অন্যান্য মিষ্টি জাতীয় খাবার বা কার্বোহাইড্রেট একটু কমিয়ে দেওয়া ভালো।

আমের বিভিন্ন জাত ও পুষ্টির ভিন্নতা

আমাদের দেশে হরেক রকমের আম পাওয়া যায়। ল্যাংড়া, গোপালভোগ, হিমসাগর, ফজলি, আম্রপালি ইত্যাদি জাতের আমের স্বাদ ও গন্ধ সম্পূর্ণ আলাদা। পুষ্টিবিদদের মতে, আমের প্রজাতি বা জাত ভেদে এর ভেতরের শর্করার পরিমাণ, মিষ্টি ভাব এবং ফাইবারের মাত্রার মধ্যেও কম-বেশি পার্থক্য দেখা যায়। কিছু আমে আঁশ বা ফাইবার বেশি থাকে যা হজমের জন্য ভালো, আবার কিছু আমে রসের পরিমাণ বেশি থাকে। তবে জাত যাই হোক না কেন, সব আমেই কম-বেশি একই ধরণের ভিটামিন ও খনিজ পাওয়া যায়। তাই নিজের পছন্দ অনুযায়ী যেকোনো আমই আপনি খেতে পারেন, তবে তা যেন পরিমিত হয়।

সুস্থভাবে আম খাওয়ার কিছু জরুরি টিপস

আমের স্বাদ সম্পূর্ণ উপভোগ করার পাশাপাশি শরীরকে সুস্থ রাখতে নিচের টিপসগুলো মেনে চলতে পারেন:

১. খাবারের পরপরই আম খাবেন না: দুপুরের বা রাতের ভারী খাবার খাওয়ার পরপরই আম খাওয়া উচিত নয়। এতে শরীরে একসাথে অনেক বেশি ক্যালোরি ও শর্করা প্রবেশ করে, যা হজমে ব্যাঘাত ঘটায়। ভারী খাবার খাওয়ার অন্তত এক থেকে দুই ঘণ্টা পর আম খাওয়া সবচেয়ে ভালো।

২. আমের জুস বা রসের চেয়ে আস্ত আম ভালো: আম চিবিয়ে খেলে এর ভেতরের ফাইবার বা আঁশ সরাসরি আমাদের শরীরে প্রবেশ করে, যা রক্তে সুগারের মাত্রা একবারে বাড়তে দেয় না। কিন্তু আমের জুস বা রস করে খেলে ফাইবার নষ্ট হয়ে যায় এবং সুগারের মাত্রা দ্রুত বেড়ে যায়।

৩. বিকেলের নাস্তা হিসেবে খান: আম খাওয়ার সবচেয়ে ভালো সময় হলো সকাল বা বিকেলের নাস্তার সময়। এই সময়ে আম খেলে তা শরীরে শক্তি জোগাতে দারুণ কাজ করে।


আম প্রকৃতির এক অনন্য উপহার। এর চমৎকার স্বাদ ও পুষ্টিগুণ আমাদের শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী। তবে সুস্থ থাকার মূল চাবিকাঠি হলো পরিমিতিবোধ। পুষ্টিবিদদের পরামর্শ মেনে দিনে এক থেকে দুটির বেশি আম না খেয়ে আমরা যেমন এর স্বাদ উপভোগ করতে পারি, তেমনি নিজেদের শরীরকেও রাখতে পারি সম্পূর্ণ সুস্থ ও নিরাপদ।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সর্বাধিক জনপ্রিয়

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সাম্প্রতিক মন্তব্য

- বিজ্ঞাপন-spot_img
error: Content is protected !!