দেশের বাজারে আবারও রেকর্ড ভেঙে বৃদ্ধি পেয়েছে স্বর্ণের দাম। আপনি যদি বিয়ে বা অন্য কোনো অনুষ্ঠানের জন্য সোনা কেনার কথা ভাবছেন, তবে আপনার জন্য রয়েছে একটি বড় আপডেট। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) দেশের বাজারে নতুন করে স্বর্ণের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। নতুন এই সিদ্ধান্তের পর প্রতি ভরি ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম ইতিহাসের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।
ভোক্তা এবং ব্যবসায়ী উভয়ের জন্যই এই দামের পরিবর্তন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আজকের এই প্রতিবেদনে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব ক্যারেট অনুযায়ী সোনার বর্তমান দাম, পূর্বের দামের সাথে এর পার্থক্য এবং কেন এই দাম বারবার পরিবর্তিত হচ্ছে।
২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম কত?
বাজুসের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দেশের বাজারে প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) ২২ ক্যারেটের স্বর্ণের দাম ৫ হাজার ৪৮২ টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর ফলে বর্তমানে ২২ ক্যারেট প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৩০ হাজার ৪২২ টাকা।
বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, সোমবার (১৫ জুন) সকাল ১০টা থেকে এই নতুন দাম কার্যকর করা হয়েছে। আজ ১৮ জুন ২০২৬, বৃহস্পতিবারও দেশের বাজারে এই নির্ধারিত দামেই সোনা কেনাবেচা হচ্ছে। ফলে যারা সবচেয়ে ভালো মানের সোনা কিনতে চান, তাদের এখন থেকে প্রতি ভরির জন্য ২ লাখ ৩০ হাজার টাকার বেশি খরচ করতে হবে।
ক্যারেট অনুযায়ী আজকের স্বর্ণের দামের তালিকা
সাধারণ ক্রেতাদের সুবিধার্থে নিচে ২২ ক্যারেট, ২১ ক্যারেট, ১৮ ক্যারেট এবং সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণের বর্তমান দামের একটি তালিকা দেওয়া হলো। এই তালিকাটি দেখে আপনি খুব সহজেই আজকের বাজার দর বুঝতে পারবেন:
| স্বর্ণের ধরণ (ক্যারেট) | প্রতি ভরির বর্তমান দাম (টাকা) |
| ২২ ক্যারেট | ২,৩০,৪২২ টাকা |
| ২১ ক্যারেট | ২,১৯,৯৮৩ টাকা |
| ১৮ ক্যারেট | ১,৮৮,৫৪৯ টাকা |
| সনাতন পদ্ধতি | ১,৫৩,৫৫৭ টাকা |
পূর্বের দামের সাথে বর্তমান দামের তুলনা
স্বর্ণের দাম কত দ্রুত বাড়ছে তা বুঝতে হলে আমাদের এর আগের সপ্তাহের দামের দিকে তাকাতে হবে। বাজুস সবশেষ গত ১৩ জুন দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম সমন্বয় করেছিল। মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে আবারও দাম বাড়ানো হলো।
১৩ জুনের সমন্বয়ে ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম ৬ হাজার ৫৯০ টাকা বাড়িয়ে ২ লাখ ২৪ হাজার ৯৪০ টাকা করা হয়েছিল। আর ১৫ জুনের নতুন ঘোষণায় তা আরও ৫ হাজার ৪৮২ টাকা বেড়ে ২ লাখ ৩০ হাজার ৪২২ টাকা হয়েছে। নিচে আগের দামের একটি তালিকা দেওয়া হলো:
১৩ জুনের স্বর্ণের দামের তালিকা
- ২২ ক্যারেট: ২,২৪,৯৪০ টাকা
- ২১ ক্যারেট: ২,১৪,৭৩৪ টাকা
- ১৮ ক্যারেট: ১,৮৪,০৫৮ টাকা
- সনাতন পদ্ধতি: ১,৪৯,৮৮২ টাকা
মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে প্রতি ক্যারেটের সোনাতেই হাজার হাজার টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের জন্য বেশ বড় একটি ধাক্কা।
চলতি বছর কতবার পরিবর্তন হলো স্বর্ণের দাম?
আপনার মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, দেশে কেন এত ঘন ঘন স্বর্ণের দাম পরিবর্তন হয়? বাজুসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত দেশের বাজারে মোট ৭৫ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছে।
এই ৭৫ বারের মধ্যে:
- দাম বাড়ানো হয়েছে: ৩৯ দফা
- দাম কমানো হয়েছে: ৩৬ দফা
শুধু এই বছরই নয়, গত ২০২৩ এবং ২০২৪ সালের ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালেও স্বর্ণের বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা গিয়েছিল। ২০২৫ সালে দেশের বাজারে মোট ৯৩ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছিল। যার মধ্যে ৬৪ বার দাম বাড়ানো হয়েছিল এবং কমানো হয়েছিল মাত্র ২৯ বার। এই পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যায় যে, বাজারে স্বর্ণের দাম কমার চেয়ে বাড়ার প্রবণতাই অনেক বেশি।
কেন বারবার বাড়ছে স্বর্ণের দাম?
বাংলাদেশে স্বর্ণের দাম নির্ধারণের পেছনে মূলত আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব সবচেয়ে বেশি থাকে। বাজুস সাধারণত কয়েকটি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে দেশে সোনার দাম নির্ধারণ করে:
১. আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম বৃদ্ধি
বিশ্ব বাজারে যখনই ডলারের মান বা ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে সোনার দাম বাড়ে, তার সরাসরি প্রভাব পড়ে আমাদের দেশের বাজারে। আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ কম থাকলে বা চাহিদা বেশি থাকলে দাম দ্রুত বেড়ে যায়।
২. স্থানীয় বাজারে পাকা সোনার দাম
দেশের ভেতরে বুলিয়ন মার্কেট বা পোদ্দার বাজারে পাকা সোনার (Pure Gold) সরবরাহ এবং চাহিদার ওপর ভিত্তি করে বাজুস দাম পুনর্নির্ধারণ করে। স্থানীয় বাজারে যখন পাকা সোনার সংকট তৈরি হয়, তখন দাম বাড়ানো ছাড়া উপায় থাকে না।
৩. ডলারের বিনিময় হার
যেহেতু বাংলাদেশ সোনা আমদানি করে, তাই মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার মান কেমন থাকছে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডলারের দাম বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই সোনা আমদানির খরচ বেড়ে যায়, যা সাধারণ ক্রেতাদের পকেট থেকে দিতে হয়।
সাধারণ ক্রেতা ও জুয়েলারি ব্যবসায়ের ওপর এর প্রভাব
স্বর্ণের দাম ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা পার হয়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের বিয়ের কেনাকাটায় বড় প্রভাব পড়ছে। আগে যেখানে একটি মাঝারি পরিবার বিয়ের জন্য ৩ থেকে ৫ ভরি সোনা কেনার বাজেট রাখত, এখন দাম অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ায় তারা সোনার পরিমাণ কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে।
অনেক ক্রেতা এখন ২২ ক্যারেটের পরিবর্তে ২১ ক্যারেট বা ১৮ ক্যারেটের স্বর্ণের দিকে ঝুঁকছেন। আবার কেউ কেউ রুপা বা ইমিটেশনের গহনা দিয়ে সাময়িকভাবে কাজ চালাচ্ছেন। জুয়েলারি ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, দাম অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ার কারণে বাজারে ক্রেতার সংখ্যা আগের চেয়ে অনেকটাই কমে গেছে।
সোনা কেনার সময় কিছু জরুরি টিপস
বর্তমান বাজারে সোনা কেনার আগে কিছু বিষয় মাথায় রাখা অত্যন্ত জরুরি, যাতে আপনি প্রতারিত না হন:
- হলমার্ক দেখে নিন: গহনা কেনার সময় অবশ্যই তাতে ক্যারেটের হলমার্ক (যেমন- 22K, 21K) খোদাই করা আছে কিনা তা ভালো করে দেখে নিন।
- পাকা রসিদ সংগ্রহ করুন: সোনা কেনার পর দোকান থেকে ক্যাশ মেমো বা পাকা রসিদ বুঝে নিন। সেখানে সোনার ওজন, ক্যারেট এবং দাম পরিষ্কারভাবে লেখা থাকতে হবে।
- মজুরি ও ভ্যাট সম্পর্কে জানুন: বাজুস নির্ধারিত দামের সাথে প্রতি গ্রামে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ মজুরি এবং সরকারের ভ্যাট যুক্ত হয়। সোনা কেনার সময় এই হিসাবটি পরিষ্কার করে বুঝে নিন।
আজকের স্বর্ণের দাম অনুযায়ী সোনা কেনা এখন বেশ ব্যয়বহুল। আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা এবং স্থানীয় চাহিদার কারণে দামের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা আরও কিছুদিন বজায় থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাই আপনি যদি বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে বা প্রয়োজনের কারণে সোনা কিনতে চান, তবে প্রতিদিনের আপডেট বাজার দর জেনে সিদ্ধান্ত নেওয়াই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। নিয়মিত এমন সব প্রয়োজনীয় খবরের আপডেট পেতে আমাদের ওয়েবসাইটের সাথেই থাকুন।








