ছোট শিশুদের খাবারদাবার নিয়ে বাবা-মায়ের চিন্তার শেষ নেই। বিশেষ করে ডিম, বাদাম বা দুধের মতো পুষ্টিকর খাবার খাওয়াতে গেলে অনেক অভিভাবকই ভয়ে থাকেন—এই বুঝি শিশুর শরীরে অ্যালার্জি বা র্যাশ দেখা দিল! তবে শিশুদের এই খাদ্য অ্যালার্জি নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে এবার অভিভাবকদের এক দারুণ আশার খবর দিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার একদল গবেষক।
নতুন একটি গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুর জীবনের প্রথম দিকেই (এক বছর বয়সের মধ্যে) ডিম খাওয়ানো শুরু করলে ভবিষ্যতে তাদের ডিমে অ্যালার্জি হওয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব কুইন্সল্যান্ড এবং মুরডক চিলড্রেনস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষকরা যৌথভাবে এই গবেষণাটি পরিচালনা করেন। তাদের মতে, অ্যালার্জি হতে পারে এমন পুষ্টিকর খাবার দেরিতে দেওয়া নয়, বরং সঠিক নিয়মে আগেভাগে পরিচয় করিয়ে দেওয়াই বেশি কার্যকর।
৭ হাজারেরও বেশি শিশুর ওপর পরীক্ষা: কী বলছেন বিজ্ঞানীরা?
বিশ্বখ্যাত চিকিৎসা সাময়িকী ‘জামা পেডিয়াট্রিকস’ (JAMA Pediatrics)-এ প্রকাশিত এই গবেষণায় প্রায় ৭,২০০টি শিশুর স্বাস্থ্য সংক্রান্ত তথ্য গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা হয়। ২০১৬ সালে অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় শিশু খাদ্য নির্দেশিকা পরিবর্তনের আগের ও পরের শিশুদের মধ্যে এই তুলনা করা হয়েছিল।
নতুন সেই নির্দেশিকায় বলা হয়েছিল, শিশুদের প্রথম এক বছরের মধ্যেই ডিম খাওয়ানো শুরু করতে হবে। গবেষকরা তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখতে পান, এই নিয়ম মেনে চলার পর শিশুদের মধ্যে ডিমে অ্যালার্জির হার প্রায় ১৭ শতাংশ কমে গেছে!
আগেভাগে ডিম খাওয়ালে কেন অ্যালার্জির ঝুঁকি কমে?
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, যে খাবারটিতে অ্যালার্জি হওয়ার ভয় আছে, সেটি আগেভাগে দিলে ঝুঁকি কমে কীভাবে? চিকিৎসকদের মতে, বিজ্ঞান এখন অনেক বদলে গেছে।
আগে ধারণা করা হতো, অ্যালার্জি সৃষ্টিকারী খাবারগুলো শিশুদের যত দেরিতে দেওয়া হবে, ততই ভালো। কিন্তু বর্তমান চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে ঠিক তার উল্টো কথা। বিজ্ঞানীরা জানান:
- জীবনের শুরুতেই (৬ মাস বয়সের পর থেকে) যখন এই খাবারগুলো অল্প অল্প করে শিশুর শরীরে প্রবেশ করে, তখন শিশুর ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা সেগুলোকে ‘নিরাপদ’ হিসেবে চিনতে শিখে যায়।
- নিয়মিত অল্প পরিমাণে ডিম খাওয়ালে শিশুর শরীর সেটিকে শত্রু মনে না করে তার প্রতি এক ধরনের সহনশীলতা (Tolerance) তৈরি করে। ফলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের অ্যালার্জির ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়।
একজিমা আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রেও মিলল জাদুকরী ফল!
যেসব শিশুর ত্বকে একজিমা বা খসখসে ভাব থাকে, তাদের নিয়ে বাবা-মায়েরা সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় থাকেন। কারণ, একজিমা থাকা শিশুদের ত্বকের মাধ্যমে অ্যালার্জেন শরীরের ভেতরে প্রবেশ করার ঝুঁকি বেশি থাকে।
তবে এই গবেষণায় একজিমা আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রেও দারুণ ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে। দেখা গেছে, আগেভাগে ডিম খাওয়ানোর ফলে একজিমা আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে ডিমের অ্যালার্জির হার ৩৫ শতাংশ থেকে কমে মাত্র ২২ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থাৎ, সঠিক সময়ে মুখে খাওয়ালে তাদের শরীরও ডিমের প্রতি সহনশীল হয়ে ওঠে।
নতুন স্বাস্থ্য নির্দেশিকায় চিকিৎসকদের পরামর্শ কী?
বর্তমান আন্তর্জাতিক ও অস্ট্রেলিয়ান স্বাস্থ্য নির্দেশিকা অনুযায়ী, শিশুদের খাদ্য তালিকায় ডিম যুক্ত করার বিষয়ে বিশেষ কিছু পরামর্শ দেওয়া হয়েছে:
| শিশুর বয়স | করণীয় | ডিমের ধরন |
| ৬ মাস বয়স থেকে | ধীরে ধীরে ডিমের সাথে পরিচয় করানো | ভালোভাবে সেদ্ধ বা রান্না করা ডিম |
| ১ বছর বয়সের মধ্যে | নিয়মিত খাদ্যাভ্যাসের অংশ করা | জোর করে নয়, অল্প অল্প করে অভ্যস্ত করা |
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুকে জোর করে বা একবারে বেশি পরিমাণে খাওয়ানো যাবে না। স্বাভাবিক খাবারের অংশ হিসেবে ডিমের কুসুম ও সাদা অংশ অল্প করে চটকে নিয়ে খাওয়ানো শুরু করা যেতে পারে।
অভিভাবকদের জন্য মূল বার্তা
গবেষকদের মতে, এই ফলাফল নতুন বাবা-মায়ের জন্য একটি বড় স্বস্তির খবর। যদিও আগেভাগে ডিম খাওয়ালেই যে শতভাগ শিশুর অ্যালার্জি পুরোপুরি দূর হয়ে যাবে—এমনটি ভাবা ঠিক হবে না, তবে ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রে এটি একটি চমৎকার এবং বৈজ্ঞানিক উপায়।
সব শিশুর শরীরের গঠন ও ইমিউন সিস্টেম এক রকম হয় না। তাই আপনার শিশুর যদি আগে থেকেই কোনো খাবারে তীব্র অ্যালার্জি কিংবা অন্যান্য জটিলতা থাকে, তবে যেকোনো নতুন খাবার শুরু করার আগে অবশ্যই একজন শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে।








