পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির কাছে বড় ব্যবধানে পরাজিত হওয়ার পর এক নজিরবিহীন অনড় অবস্থান নিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সাধারণত নির্বাচনের ফলাফল স্পষ্ট হওয়ার পর বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যপালের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন, কিন্তু মমতা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন তিনি পদত্যাগ করবেন না। তাঁর দাবি, তৃণমূল হারেনি, বরং নির্বাচন কমিশনের সহায়তায় বিজেপি ‘ভোট লুট’ করেছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই ঘোষণার পর পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তৈরি হয়েছে আইনি ও সাংবিধানিক ধোঁয়াশা।
কেন পদত্যাগ করতে চান না মমতা
মঙ্গলবার কালীঘাটে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেন, কমিশনকে ‘ভিলেন’ বানিয়ে বিজেপি একশর বেশি আসন ছিনিয়ে নিয়েছে। তিনি বলেন, “কেন পদত্যাগ করব? আমরা হারিনি। ওরা ভোট লুট করেছে। আমি এখন মুক্ত বিহঙ্গ, সব অত্যাচারের বিরুদ্ধে রাস্তায় থেকে লড়াই করব।”
মমতার এই অবস্থানে দলের শীর্ষ নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, ফিরহাদ হাকিম ও ডেরেক ও’ব্রায়েনরা পাশে থাকলেও রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে আইনিভাবে তিনি কি পদে টিকে থাকতে পারবেন?
পদত্যাগ না করলে কী ঘটবে? (সাংবিধানিক বিশ্লেষণ)
ভারতের সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই অবস্থান সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে এক নতুন ও বিরল পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। তবে ইস্তফা না দিলেও তাঁর হাতে সময় অত্যন্ত সীমিত:
- মেয়াদ শেষ হওয়া: পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বর্তমান মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ৭ মে বৃহস্পতিবার। পদত্যাগ না করলেও এই দিন পার হওয়ার সাথে সাথেই মমতার মুখ্যমন্ত্রীর পদের বৈধতা আর থাকবে না। তাঁর নামের আগে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘প্রাক্তন’ শব্দটি যুক্ত হয়ে যাবে।
- রাজ্যপালের ভূমিকা: ইস্তফা দেওয়াটা একটি সাংবিধানিক ‘শিষ্টাচার’। যদি বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী ইস্তফা না দেন এবং নতুন বিজয়ীর দল (বিজেপি) সরকার গঠনের দাবি জানায়, তবে রাজ্যপাল নতুন মুখ্যমন্ত্রীকে শপথ গ্রহণের আমন্ত্রণ জানাতে পারেন। সেক্ষেত্রে পুরোনো মন্ত্রিসভা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
- বরখাস্ত ও রাষ্ট্রপতি শাসন: আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা ইতিমধ্যেই মমতাকে বরখাস্ত করার দাবি জানিয়েছেন। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি ৭ মে’র মধ্যে নতুন সরকার গঠিত না হয়, তবেই কেবল রাষ্ট্রপতি শাসন জারির প্রয়োজন হতে পারে।
তৃণমূলের পরবর্তী কৌশল কী
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, তিনি এখন থেকে ‘রাস্তার লোক’ হিসেবে লড়াই করবেন। সোনিয়া গান্ধী, রাহুল গান্ধী এবং অরবিন্দ কেজরিওয়ালের মতো ‘ইন্ডিয়া’ জোটের নেতারা তাঁকে সমবেদনা জানিয়েছেন। আপাতত তাঁর রাজনৈতিক কৌশল তিনি গোপন রেখেছেন, তবে তাঁর হুঁশিয়ারি “এতদিন অনেক কিছু সহ্য করেছি, এবার সব অত্যাচারের বদলা নেওয়া হবে।”
শপথ গ্রহণের প্রস্তুতি বিজেপির
এদিকে ৯ মে রবীন্দ্রজয়ন্তীর দিন নতুন বিজেপি সরকার শপথ গ্রহণ করতে পারে বলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভাষণ থেকে ইঙ্গিত মিলেছে। ফলে মমতার পদত্যাগ না করার ঘোষণাটি রাজনৈতিকভাবে চাঞ্চল্য তৈরি করলেও তা বিজেপির সরকার গঠনে আইনি বাধা হতে পারবে না বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বা জ্যোতি বসুর মতো বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রীরা পরাজয় মেনে নিয়ে দ্রুত ইস্তফা দেওয়ার যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলেছিলেন, মমতার এই অনড় অবস্থান তা ভেঙে দিল। আগামী ৪৮ ঘণ্টা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এই নাটকীয়তা শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে থামে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।








