সময়ের আবর্তন মানবসভ্যতার এক অনিবার্য বাস্তবতা। বাংলা সনের সূচনা হয়েছিল মূলত প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক প্রয়োজনে। মুঘল সম্রাট আকবর কর আদায়ের সুবিধার্থে হিজরি ও সৌর সনের সমন্বয়ে ‘ফসলি সন’ প্রবর্তন করেন। কালের পরিক্রমায় সেই ফসলি সনই আজকের বাংলা নববর্ষে রূপ নিয়েছে। তবে বর্তমান সময়ে এই উদযাপনের ধরণ এবং ইসলামের আকিদা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন রয়েছে।
উৎসবের পরিচয় ও ইসলামের মূলনীতি
ইসলামে উৎসব কেবল আনন্দের মাধ্যম নয়, বরং এটি একটি জাতির বিশ্বাস ও পরিচয়ের প্রতিফলন। ইসলামি শরীয়তে মুসলমানদের জন্য নির্ধারিত উৎসব মাত্র দুটি ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা।
রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় হিজরত করার পর দেখলেন সেখানকার মানুষ বছরে দুটি উৎসবে আনন্দ করে। তিনি সেগুলোকে পরিমার্জিত করে মুসলমানদের জন্য দুই ঈদের ঘোষণা দেন। ইসলামের একটি মৌলিক নীতি হলো “যে ব্যক্তি কোনো জাতির অনুকরণ করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হবে।” (আবু দাউদ)। এই হাদিস কেবল পোশাক নয়, বরং বিজাতীয় সংস্কৃতি ও উৎসব অনুসরণের ক্ষেত্রেও সতর্ক করে।
ইমাম ও ফকিহদের অবস্থান
ইসলামি ফিকহের চার ইমাম আবু হানিফা, মালিক, শাফেয়ী এবং আহমদ ইবনে হাম্বল (র.) সকলেই দ্বীনের মধ্যে নতুন উৎসব সংযোজন এবং অন্য ধর্মের অনুকরণ সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। প্রখ্যাত আলেম ইবনে তাইমিয়্যাহ দেখিয়েছেন যে, অন্যের উৎসব গ্রহণ করার অর্থ হলো ধীরে ধীরে নিজের বিশ্বাস ও পরিচয়ের প্রভাব ক্ষুণ্ণ করা।
যেসব উদযাপন ইসলামে নিষিদ্ধ
বাংলা নববর্ষের এমন কিছু অনুষঙ্গ রয়েছে যা সরাসরি ইসলামের শিক্ষার সাথে সাংঘর্ষিক। একজন সচেতন মুসলমানের জন্য নিচের বিষয়গুলো পরিহার করা আবশ্যক:
- মূর্তি বা প্রতিকৃতি সংস্কৃতি: মঙ্গল শোভাযাত্রার মতো আয়োজন যেখানে বিভিন্ন প্রাণীর প্রতিকৃতি বহন করা হয়।
- অবাধ মেলামেশা: নারী-পুরুষের অবাধ সংমিশ্রণ ও পর্দার বিধান লঙ্ঘন।
- অপচয় ও অশ্লীলতা: উদ্দাম নাচ-গান, সময়ের অপচয় এবং অর্থের অপব্যয়।
- অন্য ধর্মের অনুকরণ: উল্কি আঁকা, রং খেলা বা বিশেষ কোনো ধর্মীয় আচার যা ইসলামের স্বকীয়তা নষ্ট করে।
কেননা, ইসলামের দৃষ্টিতে যেসব কাজে ফরজ ইবাদত (যেমন: নামাজ) লঙ্ঘিত হয় বা হারামের সংস্পর্শ থাকে, তা কবীরা গুনাহ।
একজন মুমিনের করণীয়
ইসলাম সময়কে কেবল উৎসব হিসেবে নয়, বরং একটি আমানত হিসেবে দেখে। ক্যালেন্ডারের পরিবর্তন বা নতুন বছর আসাকে একজন মুসলমান স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে পারে, কিন্তু উৎসবের নামে এমন কিছু করা উচিত নয় যা ঈমানকে ঝুঁকিতে ফেলে।
একজন সচেতন মুসলমানের দায়িত্ব হলো নিজেকে প্রশ্ন করা তিনি কি কেবল সময়ের পরিবর্তনকে স্বীকার করছেন, নাকি এমন এক উৎসবের অংশ হচ্ছেন যার ভেতর অন্য বিশ্বাসের ছাপ ও ইসলামের সীালঙ্ঘন নিহিত?
পহেলা বৈশাখ আমাদের জন্য সচেতনতার আহ্বান। সংস্কৃতিকে অবশ্যই আমাদের ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে ধারণ করা যেতে পারে, তবে তা যেন কখনোই ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসের সীমানা অতিক্রম না করে। নববর্ষের এই ক্ষণে আমাদের অঙ্গীকার হোক সংস্কৃতি নয়, বরং ইসলামের সত্য ও সুন্দর পথেই হোক আমাদের পথচলা।








