মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরাইল যুদ্ধের উত্তাপ এখন বাংলাদেশের জ্বালানি বাজারে। ঢাকার ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন আর জ্বালানি না পাওয়ার শঙ্কায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার ‘সাশ্রয়ী ব্যবহার’ এবং ‘বিকল্প উৎস’ খোঁজার ওপর জোর দিচ্ছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানিয়েছেন, সংকট সাময়িক এবং এটি কাটিয়ে উঠতে বিভিন্ন দেশের সাথে যোগাযোগ চলছে।
ভারতের কাছে অতিরিক্ত ডিজেল সরবরাহের প্রস্তাব
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশী ভারতের কাছে অতিরিক্ত ৫০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে ঢাকা। বুধবার (১১ মার্চ) ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় কুমার ভার্মার সাথে বৈঠকে এই প্রস্তাব দেন জ্বালানি মন্ত্রী। উল্লেখ্য, নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে ৫ হাজার টন ডিজেল বুধবারই বাংলাদেশে পৌঁছেছে।
চীনের সহায়তা ও দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি
ভারত ছাড়াও সরকার জ্বালানি আমদানির জন্য চীনের শরণাপন্ন হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির আওতায় জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের সাথে আলোচনা হয়েছে। চীন ছাড়াও ব্রুনেই, আফ্রিকা এবং আমেরিকার সাথেও বিকল্প উৎসের বিষয়ে কথাবার্তা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার।
জ্বালানি রেশনিং ও সাশ্রয়ী ব্যবহারের নির্দেশ
জ্বালানি তেলের মজুদ ধরে রাখতে গত ৫ মার্চ সরকার ১১ দফা নির্দেশনা জারি করেছে। এর মধ্যে রয়েছে:
- অপ্রয়োজনে গাড়ির ব্যবহার সীমিত করা।
- বড় ধরণের আলোকসজ্জা পরিহার।
- যানবাহন ভেদে দৈনিক জ্বালানি নেওয়ার সীমা নির্ধারণ।
- বিভাগীয় শহরগুলোতে জ্বালানি বরাদ্দ ১৫ শতাংশ কমিয়ে সমন্বয় করা।
একনজরে বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতি ও বাংলাদেশের প্রস্তুতি
| বিষয় | বর্তমান অবস্থা | পদক্ষেপ/প্রভাব |
| বিশ্ববাজারে তেলের দাম | ব্যারেল প্রতি ৮৮-৯০ ডলার | স্পট মার্কেট থেকে তেল কেনার চেষ্টা |
| ভারত থেকে আমদানি | ৫ হাজার টন এসেছে | অতিরিক্ত ৫০ হাজার টনের প্রস্তাব |
| হরমুজ প্রণালি সংকট | ইরানের নিষেধাজ্ঞা ও যুদ্ধ | বিকল্প সমুদ্রপথের সন্ধান |
| বিপিসির মজুদ | পর্যাপ্ত পেট্রোল ও অকটেন আছে | ডিজেল আমদানিতে বাড়তি গুরুত্ব |
হরমুজ প্রণালি ও সাপ্লাই চেইন ঝুঁকি
বিশ্বের জ্বালানি পরিবহনের প্রধান রুট হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা শুরু হওয়ায় জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে। বিপিসির তথ্যমতে, প্রতি মাসে গড়ে ১৫টি জাহাজ জ্বালানি নিয়ে বাংলাদেশে আসে। তবে চলতি মাসে এখন পর্যন্ত মাত্র ৬টি জাহাজ পৌঁছেছে। বাকি জাহাজগুলো সময়মতো পৌঁছাবে কি না, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ রয়েছে।
এলএনজি সংকটে গ্যাসের বাজারে অস্থিরতা
তেলের পাশাপাশি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির বাজারও উত্তপ্ত। বিশ্বের বৃহত্তম এলএনজি উৎপাদক কাতার উৎপাদন বন্ধ রাখায় দাম দ্রুত বাড়ছে। এর ফলে ভারত ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলোও শিল্প কারখানায় গ্যাস সরবরাহ কমাতে বাধ্য হয়েছে। বাংলাদেশও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রেখে গ্যাস ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
বিশেষজ্ঞের মত
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. বদরুল ইমাম মনে করেন, আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে বাংলাদেশের হাতে বিকল্প খুব কম। তিনি বলেন, “সরকারকে কিছুটা কঠোর পদক্ষেপ তো নিতেই হতো। এই মুহূর্তে স্পট পারচেজ এবং মিত্র দেশগুলোর সাথে সুসম্পর্কই সংকটের সমাধান দিতে পারে।”
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকার বহুমুখী কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে। বিপিসি জানিয়েছে, পেট্রোল বা অকটেন নিয়ে ভয়ের কিছু নেই কারণ এগুলো দেশেই উৎপাদিত হয়। তবে ডিজেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখাই এখন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। মজুদ বৃদ্ধি এবং বিকল্প উৎস নিশ্চিত হওয়া সাপেক্ষে রেশনিং ব্যবস্থা ধীরে ধীরে শিথিল করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।








