ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর খবরে বিশ্বজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। রোববার ভোরে ইরানের পক্ষ থেকে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। এই শোকাবহ পরিস্থিতির মাঝে আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে খামেনির সেই জ্বালাময়ী ভাষণ, যা তিনি মৃত্যুর মাত্র ১১ দিন আগে জনসম্মুখে দিয়েছিলেন।
প্রতিরোধের শক্তি ও অস্ত্রের প্রয়োজনীয়তা
জেনেভায় যখন ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা শুরু হয়েছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে খামেনি তার দেশের শক্তি প্রদর্শনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কথা বলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি জাতির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই।
তিনি বলেছিলেন, “আমাদের প্রতিরোধক অস্ত্র থাকতেই হবে। যদি কোনো দেশের কাছে পর্যাপ্ত প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্র না থাকে, তবে সেই দেশ শত্রুদের পায়ের তলায় পিষ্ট হতে বাধ্য হয়।” তার এই বক্তব্য স্পষ্ট করে দেয় যে, ইরান কেন তাদের মিসাইল প্রোগ্রাম নিয়ে এত অনড় ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ নিয়ে খামেনির কড়া জবাব
যুক্তরাষ্ট্র বারবার ইরানের মিসাইল রেঞ্জ এবং সামরিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আসছে। খামেনি তার শেষ বক্তৃতায় এই হস্তক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি সরাসরি ওয়াশিংটনকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “আমেরিকানরা কোনো কারণ ছাড়াই আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাচ্ছে। তারা ঠিক করে দিতে চায় আমাদের মিসাইলের রেঞ্জ কতটুকু হবে! এটা তো ইরানি জাতির নিজস্ব সিদ্ধান্ত, এখানে তাদের সমস্যা কোথায়?”
তিনি মনে করতেন, নিজের দেশকে সুরক্ষিত রাখার অধিকার প্রতিটি জাতির আছে এবং এতে অন্য কোনো দেশের খবরদারি করার সুযোগ নেই।
শক্তিশালী ‘থাপ্পড়’ খাওয়ার হুঁশিয়ারি
খামেনির বক্তৃতার সবচেয়ে আলোচিত অংশটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীকে দেওয়া তার সেই কঠোর হুঁশিয়ারি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট যেখানে নিজেদের সেনাবাহিনীকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বলে দাবি করেন, সেখানে খামেনি বলেছিলেন এক ভিন্ন কথা।
তিনি যোগ করেন, “তাদের মনে হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী; কিন্তু বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাবাহিনীও কখনো কখনো এমন শক্তিশালী থাপ্পড় খেতে পারে যে, এরপর আর তারা উঠে দাঁড়াতে পারবে না।” এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের দম্ভকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন।
কেন এই ভাষণটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল
খামেনির এই ভাষণটি ছিল মূলত ইরানের জনগণের মনোবল চাঙা করার একটি প্রচেষ্টা। যখন আন্তর্জাতিক মহলে ইরানকে কোণঠাসা করার চেষ্টা চলছিল, তখন তিনি দেশবাসীকে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন যে, দমে যাওয়ার নাম ইরান নয়। তার সেই ‘প্রতিরোধক অস্ত্র’ বা ডিটারেন্স থিওরি এখন মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
খামেনির মৃত্যু ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে প্রভাব
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যু শুধু ইরানের জন্য নয়, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যের জন্য একটি বড় ধাক্কা। তার দেখানো পথে ইরান কতটা অটল থাকবে কিংবা আগামী দিনে ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের সমীকরণ কী হবে, তা নিয়ে সারা বিশ্বের নজর এখন তেহরানের দিকে।
খামেনি তার শেষ বার্তায় একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী ইরানের স্বপ্ন দেখেছিলেন। তার সেই বক্তব্যের প্রতিটি শব্দ আজ ইরানের জনগণের মনে এক নতুন সংগ্রামের প্রেরণা জোগাচ্ছে।








