বর্তমানে আমাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে সাইবার অপরাধের ঝুঁকি। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর ও কৌশলী অপরাধের নাম হলো ‘হানি ট্র্যাপ’। সম্প্রতি রাজধানীর যাত্রাবাড়ী ও ডেমরা এলাকায় অভিযান চালিয়ে পুলিশ এমন একটি চক্রের ১২ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে। এই চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে তাদের অর্থ ও সম্মান কেড়ে নিচ্ছিল।
রাজধানীতে হানি ট্র্যাপ চক্রের ১২ সদস্য গ্রেফতার
ওয়ারী বিভাগের পুলিশ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে দুই নারীসহ মোট ১২ জন অপরাধীকে আটক করেছে। গ্রেফতারকৃতরা হলো তুলিয়া আক্তার ওরফে সুমি, দুলালী ওরফে মীম, ওমর ফারুক, শফিকুল ইসলাম শান্ত এবং আরও ৮ জন। ডেমরা ও যাত্রাবাড়ী থানায় করা দুটি মামলার প্রেক্ষিতে পুলিশ তদন্ত চালিয়ে এই চক্রটিকে আইনের আওতায় আনে।
পুলিশ জানায়, এই চক্রটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে কাজ করে। এদের মধ্যে নারী সদস্যরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে টার্গেট করা ব্যক্তিদের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলে এবং পরে নির্জন স্থানে ডেকে নিয়ে জিম্মি করে।
যেভাবে পাতা হয় এই মরণফাঁদ: চক্রের কাজের কৌশল
হানি ট্র্যাপ চক্রের কাজ করার ধরন খুবই পেশাদার। তারা মূলত তিনটি ধাপে তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে:
১. সামাজিক মাধ্যমে বন্ধুত্ব ও প্রেমের অভিনয়
চক্রের নারী সদস্যরা ফেসবুক বা অন্য কোনো সামাজিক মাধ্যমে ভুয়া বা আকর্ষণীয় প্রোফাইল ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যক্তিকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠায়। এরপর শুরু হয় নিয়মিত চ্যাটিং। একপর্যায়ে তারা ভুক্তভোগীর সাথে প্রেমের অভিনয় করে এবং দেখা করার জন্য ব্যাকুলতা দেখায়।
২. নির্জন স্থানে বা বাসায় আমন্ত্রণ
যখন ভুক্তভোগী নারী সদস্যের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করে, তখন তাকে কোনো একটি নির্দিষ্ট বাসায় বা নির্জন স্থানে দেখা করার জন্য ডাকা হয়। অনেক সময় কফিশপ বা শপিং মলে দেখা করার কথা বলে কৌশলে নিজেদের আস্তানায় নিয়ে যাওয়া হয়।
৩. আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও ধারণ
ভুক্তভোগী বাসায় ঢোকা মাত্রই আগে থেকে ওত পেতে থাকা চক্রের পুরুষ সদস্যরা সেখানে হাজির হয়। তারা নিজেদের ডিবি পুলিশ বা সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে ভয় দেখায়। এরপর জোরপূর্বক নারী সদস্যের সাথে ভুক্তভোগীর আপত্তিকর ছবি বা ভিডিও তুলে রাখে। এটিই হয় তাদের ব্ল্যাকমেইলের মূল অস্ত্র।
জিম্মি করে লাখ লাখ টাকা ও সম্পদ লুট
পুলিশের দেওয়া তথ্যমতে, এই চক্রটি সম্প্রতি দুই ব্যক্তিকে অপহরণ করে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছিল। টাকা দিতে অস্বীকার করলে সেই আপত্তিকর ছবিগুলো সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে নগদ টাকা, স্বর্ণের চেইন, হীরা এবং এটিএম বুথ থেকে কয়েক লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় তারা।
আরেকটি ঘটনায়, সুমি নামের এক নারী সদস্য জনৈক ব্যক্তিকে ডেমরার একটি বাসায় ডেকে নিয়ে মারধর করে এবং তার পরিবার থেকে বিকাশের মাধ্যমে কয়েক লাখ টাকা আনতে বাধ্য করে। সম্মান হারানোর ভয়ে অনেক ভুক্তভোগী শুরুতে মুখ না খুললেও, পরবর্তীতে পুলিশের হস্তক্ষেপে চক্রটি ধরা পড়ে।
হানি ট্র্যাপ থেকে বাঁচতে আপনার যা করা উচিত
প্রযুক্তির যুগে নিজেকে নিরাপদ রাখতে সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। এই ধরনের ফাঁদ থেকে বাঁচতে নিচের পরামর্শগুলো মেনে চলুন:
- অপরিচিত রিকোয়েস্ট গ্রহণ করবেন না: সামাজিক মাধ্যমে অপরিচিত কোনো সুন্দরীর রিকোয়েস্ট দেখে আবেগপ্রবণ হবেন না। প্রোফাইল যাচাই না করে বন্ধুত্ব করবেন না।
- ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ারে সতর্কতা: ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর, ঠিকানা বা আর্থিক অবস্থার কথা চ্যাটিংয়ে প্রকাশ করবেন না।
- হুট করে দেখা করতে যাবেন না: সামাজিক মাধ্যমে পরিচয় হওয়া কারো সাথে হুট করে কোনো নির্জন স্থান বা কারো বাসায় দেখা করতে যাওয়া বোকামি। দেখা করতে হলে জনাকীর্ণ পাবলিক প্লেসে করুন।
- আইনের আশ্রয় নিন: যদি কখনো এমন পরিস্থিতির শিকার হন, তবে ভয় না পেয়ে দ্রুত নিকটস্থ থানায় যোগাযোগ করুন অথবা ৯৯৯-এ কল দিন। মনে রাখবেন, গোপন রাখলে অপরাধীরা আরও সাহসী হয়ে ওঠে।
পুলিশের বিশেষ বার্তা ও আইনি পদক্ষেপ
ওয়ারী বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মল্লিক আহসান উদ্দীন সামি সংবাদ সম্মেলনে জানান, এই চক্রের অন্য সদস্যদের ধরতেও অভিযান অব্যাহত আছে। পুলিশ বলছে, এই ধরনের অপরাধ দমনে সাধারণ মানুষের সচেতনতা সবচেয়ে বেশি জরুরি। কোনো প্রলোভনে পড়ে নিজের জীবন ও সম্পদ ঝুঁকিতে ফেলবেন না।
‘হানি ট্র্যাপ’ শুধু একটি অপরাধ নয়, এটি একটি সাজানো নাটক যা মানুষের সরলতাকে পুঁজি করে চলে। আপনার একটু সতর্কতা আপনাকে এই বড় বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারে। ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবসময় সজাগ থাকুন।








