বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন বইছে নির্বাচনী হাওয়া। আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচন নিয়ে শুধু দেশের ভেতরেই নয়, বরং সীমান্তের ওপারে দিল্লিতেও চলছে ব্যাপক চুলচেরা বিশ্লেষণ। দীর্ঘ দেড় দশক পর এমন এক নির্বাচন হতে যাচ্ছে, যেখানে আওয়ামী লীগ নেই আর এই নতুন বাস্তবতাই ভারতকে কিছুটা ভাবিয়ে তুলেছে। প্রতিবেশী দেশের নির্বাচন নিয়ে দিল্লির এমন সতর্ক নজরদারি অতীতে খুব একটা দেখা যায়নি।
ভারতের জন্য এই নির্বাচন কেন ব্যতিক্রমী
দিল্লির কূটনীতিক ও বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনটি ভারতের জন্য বেশ কিছু কারণে আলাদা এবং গুরুত্বপূর্ণ। এর পেছনে প্রধান তিনটি কারণ রয়েছে:
১. আওয়ামী লীগহীন সরকার: গত ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে ভারত ঢাকায় আওয়ামী লীগ সরকারের সাথে কাজ করতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। এবার আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায় ভারতকে সম্পূর্ণ নতুন একটি রাজনৈতিক শক্তির সাথে মানিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে।
২. বিএনপি ও জামায়াতের অবস্থান: তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি এককভাবে ক্ষমতায় আসবে, নাকি জামায়াতে ইসলামীকে সাথে নিয়ে কোয়ালিশন গড়বে সেদিকেও তীক্ষ্ণ নজর রাখছে দিল্লি। ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের তিক্ত অভিজ্ঞতা ভারত এখনো ভোলেনি।
৩. জামায়াতের প্রভাব: জামায়াতে ইসলামী সরকারে থাকুক বা বিরোধী দলে, তারা যে আগামী সংসদে অত্যন্ত প্রভাবশালী হবে, তা নিশ্চিত। দীর্ঘকাল জামায়াতকে ‘রেড লাইন’ মনে করা ভারত এখন তাদের সাথে কীভাবে যোগাযোগ রাখবে, তা বড় একটি প্রশ্ন।
উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তা: দিল্লির প্রধান মাথাব্যথা
ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো তাদের সেভেন সিস্টার্স বা উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা। শেখ হাসিনার আমলে উলফা (ULFA)-র মতো বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো বাংলাদেশে কোনো আশ্রয় পায়নি। এমনকি শীর্ষ নেতাদের ভারতের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল।
নিরাপত্তা নিয়ে ভারতের কঠোর অবস্থান: দিল্লির প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক স্ম্রুতি পট্টনায়কের মতে, ভারত অন্য সব বিষয়ে ছাড় দিলেও উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তা প্রশ্নে কোনো আপস করবে না। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, “বাংলাদেশের নতুন সরকার পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক বাড়াতে পারে, তাতে ভারতের সমস্যা নেই। কিন্তু সেটা যেন ভারতের নিরাপত্তার বিনিময়ে না হয়।”
বিএনপি কি এখন ভারতের কাছে ‘মন্দের ভালো’
এক সময় বিএনপিকে ভারত-বিরোধী দল হিসেবে দেখা হলেও, বর্তমান পরিস্থিতিতে দিল্লির মনোভাবে পরিবর্তন এসেছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের হাতে এখন খুব বেশি বিকল্প নেই।
- ওপেন আউটরিচ: বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর টুইট এবং বিএনপির সাথে ভারতের সাম্প্রতিক যোগাযোগ প্রমাণ করে যে, দিল্লি মানসিকভাবে একটি বিএনপি সরকারের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেছে।
- স্থিতিশীলতার আশা: ভারত মনে করছে বিএনপি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিণত এবং ২০২৫ সালের মাঝামাঝি থেকে তারা জামায়াতের সাথে কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখছে, যা ভারতের জন্য ইতিবাচক।
জামায়াতে ইসলামীর সাথেও কি যোগাযোগ করছে ভারত
দিল্লিতে গুঞ্জন রয়েছে যে, ভারত পর্দার আড়ালে জামায়াত নেতাদের সাথেও যোগাযোগ স্থাপন করেছে। জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান নিজেই দাবি করেছেন যে, ভারতীয় কূটনীতিকরা তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করেছেন।
সাবেক হাই কমিশনার রিভা গাঙ্গুলি দাসের মতে, কূটনীতিতে বাস্তবতাকে মেনে নিতে হয়। যেহেতু তারা প্রতিবেশী, তাই কে ক্ষমতায় আসবে তার চেয়ে বড় বিষয় হলো—সবার সাথে কাজের সম্পর্ক বজায় রাখা। ভারত আসলে বাংলাদেশে একটি ‘স্থিতিশীল এবং নির্বাচিত’ সরকার দেখতে চায়।
স্থিতিশীলতা ও আগামীর প্রত্যাশা
ভারতের সাবেক কূটনীতিকদের মতে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ের যে অনিশ্চয়তা, তার চেয়ে নির্বাচনের মাধ্যমে আসা একটি স্থায়ী সরকার দিল্লির জন্য অনেক বেশি স্বস্তির। তারা চায় এমন একটি সরকার আসুক যার জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা বা ‘ম্যান্ডেট’ থাকবে।
১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচন শুধু বাংলাদেশের ভাগ্য নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলবে। ভারত এখন চাইছে বাংলাদেশে একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ ফিরে আসুক। যদি নতুন সরকার ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগগুলো গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে, তবে দিল্লির সাথে ঢাকার সম্পর্কের বরফ গলতে খুব বেশি সময় লাগবে না।








