বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে আসন্ন সংসদ নির্বাচন যখন দোরগোড়ায়, ঠিক তখনই প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে ভেসে আসছে নতুন ষড়যন্ত্রের আভাস। জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে স্বৈরাচারী হাসিনা সরকারের পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে দেশ যখন ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে, তখন দিল্লির নীতিনির্ধারকরা যেন কিছুতেই স্বস্তি পাচ্ছেন না। নির্বাচনের আর মাত্র তিন সপ্তাহ বাকি, অথচ এই নাজুক সময়ে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে এবং বিশ্বমঞ্চে হেয় করতে নতুন খেলায় মেতেছে দিল্লি।
দিল্লির বুকে বসে বাংলাদেশবিরোধী তৎপরতা
গত কয়েকদিনে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে যা ঘটছে, তা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের জন্য অশনিসংকেত। সেখানে প্রকাশ্যে সংবাদ সম্মেলন করছেন পলাতক আওয়ামী লীগ নেতারা। বাংলাদেশ সরকারকে সরাসরি হুমকি দিয়ে তারা বলছেন, আওয়ামী লীগ ছাড়া বাংলাদেশে কোনো স্থিতিশীলতা আসবে না।
গত ১৭ জানুয়ারি দিল্লি প্রেস ক্লাবে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এবং সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে তারা দম্ভোক্তি করে বলেন, “আমরা শিগগির শেখ হাসিনাকে নিয়ে দেশে ফিরব এবং ক্ষমতায় যাব।” প্রশ্ন জাগে, একটি স্বাধীন দেশের পলাতক অপরাধীদের দিয়ে ভিনদেশি মাটিতে বসে এমন হুমকি দেওয়ার সাহস তারা পায় কোথায়? এর পেছনে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার (ডিপস্টেট) সরাসরি ইন্ধন রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সাম্প্রদায়িকতার তকমা ও ভারতের দ্বিচারিতা
দিল্লির বর্তমান মোদি সরকার বাংলাদেশকে চাপে ফেলতে পুরনো সেই ‘মৌলবাদ’ কার্ড খেলছে। ২০ জানুয়ারি দিল্লিতে ‘সিডস অব হেট’ বা ‘ঘৃণার বীজ’ শীর্ষক একটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে বক্তারা বাংলাদেশকে ‘মৌলবাদী রাষ্ট্র’ হিসেবে চিত্রিত করার অপচেষ্টা চালান। সেখানে সাবেক ভারতীয় মন্ত্রী এমজে আকবর ও সাবেক হাই কমিশনার পংকজ সরণ দাবি করেন, বাংলাদেশে নাকি উগ্রবাদের উত্থান ঘটছে যা ভারতের জন্য হুমকি।
এখানে সবচেয়ে বড় পরিহাসের বিষয় হলো, একটি কট্টর মৌলবাদী শক্তি এখন নিজেরা ভারত শাসন করছে, অথচ তারাই আবার কল্পিত মৌলবাদের ইস্যু সামনে এনে বাংলাদেশের দিকে আঙুল তুলছে। ভারতের বর্তমান শাসকগোষ্ঠী যখন নিজ দেশে সাম্প্রদায়িক বিভাজন তৈরি করছে, তখন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পালাবদলকে তারা ‘মৌলবাদ’ বলে অপপ্রচার চালাচ্ছে।
শেখ হাসিনাকে নিয়ে নতুন নাটক
সবচেয়ে উদ্বেগজনক খবর হলো, ৫ আগস্ট পালিয়ে যাওয়ার পর প্রথমবারের মতো শেখ হাসিনাকে প্রকাশ্যে আনার প্রস্তুতি চলছে। নির্ভরযোগ্য কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, দিল্লিতে কর্মরত আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সামনে হাসিনাকে হাজির করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। সেই অনুষ্ঠানে হাসিনাকে এখনো ‘বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার ধৃষ্টতা দেখানো হয়েছে আমন্ত্রণপত্রে।
ঢাকার পক্ষ থেকে বারবার আপত্তি জানানো হলেও দিল্লি তা কানে তুলছে না। মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত এবং মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত একজন পলাতক আসামিকে দিয়ে এমন অনুষ্ঠান আয়োজন করা সরাসরি ঢাকার বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার শামিল।
কী বলছেন বিশ্লেষকরা?
বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ এ বিষয়ে বলেন, “সময়টা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ভারত তাদের কূটনীতিকদের পরিবারকে ফিরিয়ে নিচ্ছে, যা একটি বড় বার্তা। তারা আসলে বড় কোনো ষড়যন্ত্র পাকাচ্ছে।”
অন্যদিকে অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী মনে করেন, আসন্ন নির্বাচনে ইসলামি দলগুলোর ভালো করার সম্ভাবনা দেখে দিল্লি বিচলিত। তাই তারা আগাম বাংলাদেশকে মৌলবাদী ট্যাগ দিয়ে চাপে ফেলতে চাইছে। তিনি বলেন, “আমাদের দুর্ভাগ্য, ভারতের এই আগ্রাসী আচরণের বিরুদ্ধে অনেকেই চুপ করে আছেন।”
সতর্ক থাকার সময় এখনই
নির্বাচন বানচাল করতে এবং দেশকে অস্থিতিশীল করতে নানামুখী উসকানি আসবে। আওয়ামী লীগকে মাঠে নামানো এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করাই এখন দিল্লির প্রধান লক্ষ্য। তবে দেশের সরকার, রাজনৈতিক দল এবং সাধারণ জনগণকে এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সজাগ থাকতে হবে। কোনোভাবেই ভিনদেশি ফাঁদে পা দেওয়া যাবে না। জুলাইয়ের বিপ্লবকে সফল পরিণতির দিকে নিতে হলে এই কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ সাহসের সাথে মোকাবিলা করতে হবে।








