একজন বাংলাদেশি নাগরিকের প্রথম রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি হলো জন্ম নিবন্ধন সনদ। স্কুল ভর্তি, পাসপোর্ট তৈরি কিংবা এনআইডি সব ক্ষেত্রেই এখন ডিজিটাল জন্ম নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। আগে সনদ যাচাইয়ের জন্য অফিসে ধরণা দিতে হলেও, বর্তমানে everify.bdris.gov.bd ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ঘরে বসেই তা যাচাই করা সম্ভব। আজকের প্রতিবেদনে জানুন জন্ম নিবন্ধন চেক করার নিয়ম, ১৬ ডিজিট থেকে ১৭ ডিজিটে রূপান্তর এবং অনলাইন কপি ডাউনলোডের সহজ নিয়মাবলী।
অনলাইনে জন্ম নিবন্ধন যাচাই করতে কী কী লাগে?
অনেকেই হুট করে ওয়েবসাইটে প্রবেশ করেন কিন্তু প্রয়োজনীয় তথ্য হাতের কাছে না থাকায় চেক করতে পারেন না। জন্ম নিবন্ধন যাচাই প্রক্রিয়াটি শুরু করার আগে আপনার হাতে কিছু নির্দিষ্ট তথ্য ও মাধ্যম থাকা প্রয়োজন। এগুলো হলো:
- ১৭ সংখ্যার জন্ম নিবন্ধন নম্বর: আপনার সনদের উপরে লেখা জন্ম নিবন্ধন নম্বরটি অবশ্যই ১৭ ডিজিটের হতে হবে। (আপনারটি যদি ১৬ ডিজিটের হয়, তবে কী করবেন তা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে)।
- সঠিক জন্ম তারিখ: জন্ম তারিখটি অবশ্যই YYYY-MM-DD (বছর-মাস-দিন) ফরম্যাটে জানা থাকতে হবে। সনদে যেভাবে আছে, ঠিক সেভাবেই দিতে হবে।
- ডিভাইস ও ইন্টারনেট: একটি স্মার্টফোন, ল্যাপটপ অথবা কম্পিউটার এবং তার সাথে সচল ইন্টারনেট সংযোগ।
অনলাইন জন্ম নিবন্ধন চেক করার নিয়ম (ধাপে ধাপে)
জন্ম নিবন্ধন যাচাই করার প্রক্রিয়াটি খুবই সহজ এবং এটি করতে মাত্র ১-২ মিনিট সময় লাগে। তবে সার্ভারের জটিলতা বা ভুল নিয়ম অনুসরণ করার কারণে অনেকেই ব্যর্থ হন। নিচে সঠিক নিয়মে অনলাইন জন্ম নিবন্ধন চেক করার নিয়ম ধাপে ধাপে বর্ণনা করা হলো:
ধাপ ১: সরকারি ওয়েবসাইটে প্রবেশ
প্রথমে আপনাকে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের সরকারি যাচাইকরণ ওয়েবসাইট বা বিডিআরআইএস (BDRIS)-এ প্রবেশ করতে হবে। আপনার ব্রাউজারের এড্রেস বারে লিখুন: everify.bdris.gov.bd। এটিই বাংলাদেশ সরকারের জন্ম নিবন্ধন যাচাইয়ের একমাত্র অফিশিয়াল ওয়েবসাইট।
ধাপ ২: তথ্য পূরণ করা
ওয়েবসাইটটি লোড হওয়ার পর আপনি দুটি ফাঁকা বক্স দেখতে পাবেন।
১. Birth Registration Number: প্রথম বক্সে আপনার জন্ম সনদে থাকা ১৭ সংখ্যার নম্বরটি হুবহু ইংরেজিতে লিখুন।
২. Date of Birth: দ্বিতীয় বক্সে জন্ম তারিখ নির্বাচন করতে হবে। এখানে অনেকেই ভুল করেন। ক্যালেন্ডার থেকে তারিখ সিলেক্ট করার সময় প্রথমে বছর (Year), তারপর মাস (Month) এবং শেষে দিন (Day) সিলেক্ট করুন।
উদাহরণস্বরূপ: আপনার জন্ম ২০০০ সালের ১লা জানুয়ারি হলে ফরম্যাটটি হবে 2000-01-01
ধাপ ৩: ক্যাপচা বা গাণিতিক প্রশ্নের সমাধান
তথ্য পূরণ করার পর নিচে একটি ছোট গাণিতিক সমস্যা বা ক্যাপচা দেওয়া থাকবে। এটি মূলত আপনি রোবট কিনা তা যাচাই করার জন্য।
উদাহরণস্বরূপ: যদি লেখা থাকে The answer is 12 + 5, তবে পাশের বক্সে আপনাকে যোগফল 17 লিখতে হবে। সংখ্যাটি অবশ্যই ইংরেজিতে লিখবেন।
ধাপ ৪: অনুসন্ধান বা Search
সব তথ্য এবং ক্যাপচা সঠিকভাবে পূরণ করার পর ‘Search’ বাটনে ক্লিক করুন।
- যদি আপনার তথ্য সঠিক থাকে এবং সার্ভারে আপলোড করা থাকে, তবে নিচে আপনার নাম, পিতা-মাতার নাম, জন্মস্থান এবং নিবন্ধন কার্যালয়ের নামসহ বিস্তারিত তথ্য ভেসে উঠবে।
- স্ট্যাটাস যদি “Verified” দেখায়, তবে বুঝবেন আপনার জন্ম নিবন্ধনটি সম্পূর্ণ ডিজিটাল এবং সঠিক আছে।

১৬ সংখ্যার জন্ম নিবন্ধন ১৭ সংখ্যা করার নিয়ম
অনেকের হাতে পুরনো বা ২০০৬-২০০৮ সালের দিকে করা হাতে লেখা জন্ম নিবন্ধন রয়েছে, যেগুলোর নম্বর ১৩ বা ১৬ ডিজিটের। বর্তমান সার্ভার বা BDRIS সিস্টেম শুধুমাত্র ১৭ ডিজিটের নম্বর গ্রহণ করে। ফলে পুরনো নম্বর দিয়ে সার্চ দিলে “No Record Found” দেখায়। চিন্তার কিছু নেই, আপনি নিজেই এটি ঠিক করে নিতে পারেন।
“জন্ম নিবন্ধন ১৬ ডিজিট থেকে ১৭ ডিজিট” করার নিয়মটি নিচে দেওয়া হলো:
জন্ম নিবন্ধন নম্বরটি মূলত ৩টি ভাগে বিভক্ত:
১. প্রথম ৫ ডিজিট = এরিয়া কোড (থানা বা উপজেলার কোড)।
২. পরবর্তী ৪ ডিজিট = আপনার জন্মের সাল (যেমন: 2000)।
৩. শেষ অংশ = ক্রমিক নম্বর।
আপনার নম্বর যদি ১৬ সংখ্যার হয়, তবে লক্ষ্য করুন শেষের ৫টি সংখ্যার দিকে। সাধারণত ১৬ ডিজিটের ক্ষেত্রে জন্মের সালের পরে এবং শেষের ৫টি সংখ্যার আগে একটি ‘0’ (শূন্য) যোগ করলেই সেটি ১৭ ডিজিটের হয়ে যায় এবং অনলাইনে শো করে।
উদাহরণ: আপনার ১৬ ডিজিটের নম্বর: 12345-2000-123456 (কাল্পনিক) ১৭ ডিজিট করতে হবে এভাবে: 12345-2000-0123456
তবে যদি এই ট্রিক কাজ না করে, তবে বুঝতে হবে আপনার তথ্য অনলাইনে আপডেট করা নেই। সেক্ষেত্রে আপনাকে দ্রুত সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভায় যোগাযোগ করে ডিজিটাল করার আবেদন করতে হবে।
জন্ম নিবন্ধন ডাউনলোড করার উপায়
অনলাইনে সফলভাবে চেক করার পর অনেকেই এই কপিটি সংরক্ষণ করতে চান। মনে রাখবেন, ওয়েবসাইট থেকে সরাসরি “Download PDF” বাটন সব সময় পাওয়া যায় না। তবে আপনি সহজেই এটি প্রিন্ট বা সেভ করতে পারেন।
১. তথ্যগুলো স্ক্রিনে আসার পর কি-বোর্ডের Ctrl + P চাপুন (কম্পিউটারে)।
২. মোবাইল হলে ব্রাউজারের মেনু থেকে ‘Share’ অপশনে গিয়ে ‘Print’ সিলেক্ট করুন।
৩. প্রিন্ট প্রিভিউ আসলে ‘Save as PDF’ নির্বাচন করে সেভ করে নিন।
সতর্কতা: এই অনলাইন কপিটি মূলত তথ্য যাচাইয়ের জন্য। পাসপোর্ট, ভিসা বা গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কাজে ব্যবহার করতে হলে ইউনিয়ন পরিষদ বা সিটি কর্পোরেশন থেকে দেওয়া সিল ও স্বাক্ষরযুক্ত মূল কপিটি প্রয়োজন হবে। তবে অনলাইন কপি দিয়ে স্কুল ভর্তি বা সাময়িক কাজ চালানো সম্ভব।
জন্ম নিবন্ধন অনলাইনে খুঁজে না পাওয়ার কারণ ও সমাধান
সঠিক তথ্য দেওয়ার পরেও অনেক সময় রেজাল্ট আসে না। “জন্ম নিবন্ধন অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে না” বা “No Record Found” দেখানোর পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ রয়েছে:
সার্ভার সমস্যা বা ‘No Record Found’
সরকারি এই ওয়েবসাইটে প্রায়ই অতিরিক্ত লোড থাকে। সার্ভার মেইনটেন্যান্স বা ডাউন থাকলে সঠিক তথ্য দিলেও “No Record Found” দেখাতে পারে।
- সমাধান: কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে বা রাতের দিকে পুনরায় চেষ্টা করুন।
ডিজিটালাইজেশন না হওয়া
আপনার কাছে জন্ম নিবন্ধনের হার্ড কপি থাকলেও সেটি হয়তো অনলাইন ডেটাবেসে এন্ট্রি করা হয়নি। বিশেষ করে ২০১২ সালের আগের হাতে লেখা সনদগুলোর ক্ষেত্রে এই সমস্যা বেশি হয়।
- সমাধান: যদি বারবার চেষ্টার পরেও তথ্য না আসে, তবে আপনার জন্ম সনদের ফটোকপি নিয়ে স্থানীয় কাউন্সিলর অফিস, ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভায় যোগাযোগ করুন। তারা এটি সার্ভারে এন্ট্রি করে দেবে।
জন্ম নিবন্ধন তথ্য ভুল থাকলে সংশোধনের উপায়
অনলাইনে চেক করার পর যদি দেখেন আপনার নিজের নামের বানান ভুল, পিতা-মাতার নাম ভুল, অথবা বয়সে গরমিল আছে, তবে ঘাবড়াবেন না। এটি সংশোধনযোগ্য।
“জন্ম নিবন্ধন সংশোধন” এর জন্য আপনাকে bdris.gov.bd লিংকে গিয়ে আবেদন করতে হবে। তবে অনলাইনে আবেদনের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্র (যেমন: এসএসসি সনদ, পিতা-মাতার এনআইডি, টিকা কার্ড ইত্যাদি) নিয়ে স্বশরীরে নিবন্ধন অফিসে জমা দিতে হবে। সাধারণত আবেদন করার ১৫ থেকে ২১ দিনের মধ্যে সংশোধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
একটি ডিজিটাল এবং নির্ভুল জন্ম নিবন্ধন সনদ আপনার নাগরিক অধিকার ও পরিচিতির চাবিকাঠি। আশা করি, আজকের এই নির্দেশিকা অনুসরণ করে আপনি খুব সহজেই অনলাইন জন্ম নিবন্ধন চেক করার নিয়ম আয়ত্ত করতে পেরেছেন। আপনার সনদে যদি কোনো ভুল থাকে বা অনলাইনে খুঁজে না পাওয়া যায়, তবে দেরি না করে দ্রুত স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বা নিবন্ধন অফিসের সহায়তা নিয়ে সমাধান করে নিন।
মনে রাখবেন, সন্তানের স্কুল ভর্তি থেকে শুরু করে আপনার পাসপোর্ট বা এনআইডি প্রতিটি ধাপেই একটি ভেরিফাইড জন্ম নিবন্ধনের প্রয়োজন হবে। তাই আজই bdris ওয়েবসাইটে গিয়ে আপনার ও আপনার পরিবারের সদস্যদের জন্ম নিবন্ধন যাচাই করে নিশ্চিত হয়ে নিন।
প্রযুক্তি বিষয়ক এমন আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এবং নাগরিক সেবার আপডেট পেতে আমাদের নিউজপেপার ওয়েবসাইটের সাথেই থাকুন।

জন্ম নিবন্ধন চেক করার নিয়ম ২০২৬ সম্পর্কিত প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ)
প্রশ্ন: জন্ম নিবন্ধন চেক করার অফিশিয়াল ওয়েবসাইট কোনটি?
উত্তর: বাংলাদেশ সরকারের জন্ম নিবন্ধন যাচাইয়ের একমাত্র অফিশিয়াল ওয়েবসাইট হলো everify.bdris.gov.bd
প্রশ্ন: জন্ম নিবন্ধন নম্বর দিয়ে কি নাম ও বয়স বের করা যায়?
উত্তর: হ্যাঁ, শুধুমাত্র ১৭ ডিজিটের জন্ম নিবন্ধন নম্বর এবং সঠিক জন্ম তারিখ ইনপুট দিলে ব্যক্তির নাম, বয়স এবং পিতা-মাতার নাম দেখা যায়।
প্রশ্ন: মোবাইল অ্যাপ দিয়ে কি জন্ম নিবন্ধন চেক করা যায়?
উত্তর: বর্তমানে জন্ম নিবন্ধন চেক করার জন্য সরকারি কোনো নির্দিষ্ট অ্যান্ড্রয়েড বা আইওএস অ্যাপ নেই। আপনাকে মোবাইল ব্রাউজার (Chrome, Firefox) দিয়েই ওয়েবসাইটে ঢুকে চেক করতে হবে।
প্রশ্ন: অনলাইন কপি কি পাসপোর্টের জন্য গ্রহণযোগ্য?
উত্তর: পাসপোর্টের আবেদনের সময় জন্ম নিবন্ধনের অনলাইন ভেরিফিকেশন কপিটি গ্রহণযোগ্য, তবে সাথে মূল কপিটিও দেখাতে হতে পারে। পাসপোর্টের জন্য জন্ম নিবন্ধন অবশ্যই অনলাইনে বা ইংরেজিতে থাকা জরুরি।
প্রশ্ন: জন্ম নিবন্ধন চেক করতে কি টাকা লাগে?
উত্তর: না, অনলাইনে জন্ম নিবন্ধন চেক বা যাচাই করতে সরকারিভাবে কোনো ফি বা টাকার প্রয়োজন হয় না। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।
প্রশ্ন: আমার জন্ম নিবন্ধন নম্বর ১৩ সংখ্যার, আমি কি চেক করতে পারবো?
উত্তর: না, বর্তমান সার্ভার ১৩ সংখ্যার নম্বর গ্রহণ করে না। আপনাকে ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে এটি ডিজিটাল বা ১৭ ডিজিটের করে নিতে হবে।
প্রশ্ন: জন্ম তারিখ ছাড়া কি জন্ম নিবন্ধন চেক করা যায়?
উত্তর: না, নিরাপত্তার স্বার্থে জন্ম নিবন্ধন নম্বর এবং জন্ম তারিখ উভয় তথ্যই প্রদান করা বাধ্যতামূলক। একটি ছাড়া অন্যটি দিয়ে চেক করা সম্ভব নয়।
প্রশ্ন: জন্ম নিবন্ধন সনদে নামের বানান ভুল থাকলে কী করবো?
উত্তর: বানান ভুল থাকলে অনলাইনে সংশোধনের আবেদন করতে হবে। আবেদন করার পর প্রিন্ট কপি ও প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট স্থানীয় নিবন্ধন অফিসে জমা দিতে হবে।
প্রশ্ন: নতুন জন্ম নিবন্ধনের আবেদন করার কত দিন পর অনলাইনে পাওয়া যায়?
উত্তর: সাধারণত আবেদন অনুমোদন হওয়ার এবং প্রিন্ট কপি হাতে পাওয়ার সাথে সাথেই তথ্যটি অনলাইনে আপডেট হয়ে যায়। তবে কিছু ক্ষেত্রে ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা সময় লাগতে পারে।
প্রশ্ন: জন্ম নিবন্ধন কি ইংরেজিতে দেখা যায়?
উত্তর: হ্যাঁ, যদি আপনার জন্ম নিবন্ধনটি ইংরেজি ভার্সনে করা থাকে, তবে সার্চ দিলে তথ্যগুলো ইংরেজিতে প্রদর্শিত হবে। আর বাংলায় করা থাকলে বাংলায় আসবে। পাসপোর্টের জন্য ইংরেজি ভার্সন প্রয়োজন হয়।








