হটলাইনঃ +৮৮০ ৯৬১৩ ০০০ ২০০ |
রবিবার, জুন ২৮, ২০২৬
- বিজ্ঞাপন-spot_img
Homeসাফল্যের গল্পএআই ও রোবোটিক্স দিয়ে বিশ্বজয়: নেপালে ‘এসডিজি চ্যাম্পিয়ন’ হলেন বাংলাদেশি তরুণ আসাদুজ্জামান...
spot_img

এআই ও রোবোটিক্স দিয়ে বিশ্বজয়: নেপালে ‘এসডিজি চ্যাম্পিয়ন’ হলেন বাংলাদেশি তরুণ আসাদুজ্জামান আপেল

বাংলাদেশের জন্য এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। বিশ্বমঞ্চে লাল-সবুজের পতাকাকে আবারও গর্বিত করলেন দেশের এক তরুণ স্বপ্নদ্রষ্টা। নেপালের কাঠমান্ডুতে অনুষ্ঠিত মর্যাদাপূর্ণ অনুষ্ঠানে ‘এসডিজি চ্যাম্পিয়ন প্রাইজ’ (SDG Champion Prize)-এ ভূষিত হয়েছেন বাংলাদেশের ২১ বছর বয়সী সামাজিক উদ্যোক্তা মো: আসাদুজ্জামান আপেল। গত ২৮ ডিসেম্বর, ২০২৫ তারিখে তাকে এই সম্মানে ভূষিত করা হয়।

গাইবান্ধা জেলার রংপুরের এই কৃতি সন্তান তার মেধা, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যতের দূরদর্শী চিন্তার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের অবস্থান শক্ত করে নিয়েছেন। তার প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান ‘ইনরোল-মেন্টর পাবলিক লিমিটেড’ (INROLL-MENTOR PUBLIC LIMITED)-এর মাধ্যমে তিনি এমন এক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছেন, যা হবে প্রযুক্তি নির্ভর, স্বাবলম্বী এবং মানবিক।

গাইবান্ধা থেকে বিশ্বমঞ্চে: এক স্বপ্নদ্রষ্টার গল্প

মাত্র ২১ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক সম্মাননা অর্জন করা মো: আসাদুজ্জামান আপেল সাধারণ কোনো তরুণ নন। মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা এই তরুণ ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখতেন দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের। তার এই যাত্রার মূল লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সামাজিক সমস্যাগুলোর সমাধান করা।

২০১৯ সাল থেকে তিনি নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তার মূল উদ্দেশ্য ছিল দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠন এবং সাধারণ মানুষের সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করা। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি তৈরি করেছেন তার মেগা-উদ্যোগ “AI & Robotics for Human Rights and Self-Reliant Bangladesh”। এই উদ্যোগটিই তাকে নেপালের মাটিতে ‘এসডিজি চ্যাম্পিয়ন’ হিসেবে স্বীকৃতি এনে দিয়েছে।

কী আছে এই মেগা-প্রকল্পে?

আসাদুজ্জামান আপেলের এই প্রজেক্টটি মূলত একটি জাতীয় উন্নয়ন কাঠামো। সহজ কথায়, এটি এমন একটি পরিকল্পনা যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং রোবোটিক্স ব্যবহার করে দেশের মানবাধিকার রক্ষা এবং অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা নিশ্চিত করবে। জাতিসংঘের ১৭টি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (SDGs) মধ্যে ১৬টি লক্ষ্যমাত্রাই এই প্রকল্পের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা সম্ভব।

এই প্রকল্পটি কীভাবে কাজ করবে এবং দেশের উপকারে আসবে, তা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি বাস্তবায়ন

জাতিসংঘের নির্ধারিত লক্ষ্যগুলোর সাথে আসাদুজ্জামান আপেলের প্রকল্পটি সরাসরি সামঞ্জস্যপূর্ণ। এর মধ্যে রয়েছে:

  • মৌলিক চাহিদা পূরণ: ক্ষুধা ও দারিদ্র্য দূরীকরণ (SDG 1 & 2), সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা (SDG 3) এবং মানসম্মত শিক্ষা প্রদান (SDG 4)।
  • সমতা ও পরিবেশ: নারী-পুরুষের সমতা (SDG 5), নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন (SDG 6) এবং দূষণমুক্ত জ্বালানি (SDG 7)।
  • অর্থনীতি ও শিল্প: বেকারত্ব দূর করে শোভন কাজ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি (SDG 8), নতুন উদ্ভাবন ও শিল্পায়ন (SDG 9) এবং সমাজের অসমতা কমানো (SDG 10)।
  • টেকসই সমাজ: নিরাপদ নগর গঠন, জলবায়ু রক্ষা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা।

২. সাংবিধানিক অধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচার

আসাদুজ্জামান আপেল বিশ্বাস করেন, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার ছাড়া ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা কঠিন। তার প্রকল্পের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের সংবিধানের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদ বাস্তবায়নের পথ দেখিয়েছেন। যেমন:

  • নাগরিকদের মৌলিক প্রয়োজন মেটানো (অনুচ্ছেদ ১৫)।
  • আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান এই নীতি প্রতিষ্ঠা করা (অনুচ্ছেদ ২৭)।
  • নারী ও শিশুদের সুরক্ষা এবং সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
  • বাক-স্বাধীনতা ও পেশার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।

উদ্ভাবনী চিন্তা: ‘টেন জিরোস ডকট্রিন’ ও স্বনির্ভরতা

আসাদুজ্জামান আপেলের গবেষণার অন্যতম চমকপ্রদ দিক হলো তার উদ্ভাবিত “The Ten Zeros Doctrine”। এটি একটি নৈতিক কাঠামো যা সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় আমূল পরিবর্তন আনতে পারে। এই দশটি ‘শূন্য’ বা জিরো হলো:

১. জিরো হার্ম (Zero Harm): কারো কোনো ক্ষতি না করা।

২. জিরো রিস্ক (Zero Risk): ঝুঁকি কমিয়ে আনা।

৩. জিরো লস (Zero Loss): অপচয় রোধ ও লোকসান কমানো।

৪. জিরো ওয়েষ্ট (Zero Waste): বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও রিসাইক্লিং।

৫. জিরো করাপশন (Zero Corruption): দুর্নীতিকে পুরোপুরি নির্মূল করা।

৬. জিরো ব্যাংক্রাপ্সি (Zero Bankruptcy): দেউলিয়া হওয়া রোধ করা।

৭. জিরো পাবলিক ডিমান্ড (Zero Public Demand): সরকারের ওপর জনগণের চাপ কমানো।

৮. জিরো সোশ্যাল প্রবলেমস (Zero Social Problems): সামাজিক সমস্যা শূন্যে নামিয়ে আনা।

৯. জিরো ডিপেন্ডেন্সি (Zero Dependency): পরনির্ভরশীলতা দূর করা।

১০. জিরো টলারেন্স (Zero Tolerance): অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপোষহীনতা।

এছাড়া, নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের “থ্রি জিরোস” ভিশন (শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব ও শূন্য কার্বন নিঃসরণ) বাস্তবায়নেও তার প্রকল্পটি কাজ করবে।

নিজের জমানো টাকায় গবেষণা ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা

সাফল্যের পথ কখনোই মসৃণ ছিল না। ২০২৩ সাল থেকে ভারতের আরআইএমটি ইউনিভার্সিটিতে বিএ-এলএলবি (BA-LLB) পড়ার সময় আপেল নিজের জমানো টাকা খরচ করে গবেষণা চালিয়ে গেছেন। তিনি বিশ্বের ১২টিরও বেশি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে ফিল্ড অবজারভেশন বা মাঠ পর্যায়ের কাজ পর্যবেক্ষণ করেছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পুঁথিগত বিদ্যার বাইরেও তিনি প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট, বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এবং এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তার এই কঠোর পরিশ্রম এবং একাগ্রতাই তাকে আজকের এই অবস্থানে নিয়ে এসেছে। তিনি প্রমাণ করেছেন, ইচ্ছা থাকলে নিজের চেষ্টাতেই বড় কিছু করা সম্ভব।

ইনরোল-মেন্টর: একটি সোশ্যাল হাইব্রিড এন্টারপ্রাইজ

আসাদুজ্জামান আপেলের প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান ‘ইনরোল-মেন্টর পাবলিক লিমিটেড’ গতানুগতিক কোনো কোম্পানি নয়। এটি একটি ‘সোশ্যাল হাইব্রিড এন্টারপ্রাইজ’ যা জি-২০ এবং ওইসিডি (G20/OECD) নীতিমালা মেনে চলে। প্রতিষ্ঠানটি তিনটি প্রধান ধাপে কাজ করবে:

১. ফ্র্যাঞ্চাইজি ভিত্তিক সেবা: দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সেবার শাখা ছড়িয়ে দেওয়া।

২. সফটওয়্যার ও প্রযুক্তি: অত্যাধুনিক সফটওয়্যার ও ডাটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া।

৩. গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D): একটি অত্যাধুনিক ‘সাইবার সিটি টাউনশিপ’ বা মেগা হেডকোয়ার্টার তৈরি করা।

এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি শিক্ষার্থীদের দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তুলছেন। তার নেতৃত্বে একদল তরুণ শিক্ষার্থী পেশাদার হিসেবে তৈরি হচ্ছে, যারা ভবিষ্যতে এই বৃহৎ প্রকল্পটি পরিচালনা করবে।

ভিশন ২০৩০ এবং আগামীর বাংলাদেশ

মো: আসাদুজ্জামান আপেলের স্বপ্ন অনেক বড়। তিনি ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি সম্পূর্ণ স্বনির্ভর রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চান। তার পাইলট প্রজেক্টের মাধ্যমে তিনি ‘শূন্য বেকারত্ব’ বা জিরো আনএমপ্লয়মেন্ট নিশ্চিত করতে চান।

ইতিমধ্যে তার লেখা একাধিক বই এবং জার্নাল প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে তিনি স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার রূপরেখা তুলে ধরেছেন। তার উল্লেখযোগ্য বইগুলোর মধ্যে রয়েছে “From Student to World” এবং “The Zero-Unemployment Axiom”।

নেপালে এই আন্তর্জাতিক পুরস্কার প্রাপ্তি শুধুমাত্র আসাদুজ্জামান আপেলের ব্যক্তিগত অর্জন নয়, এটি বাংলাদেশের তরুণ সমাজের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা। তার এই উদ্যোগ সফল হলে বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে একটি দুর্নীতিমুক্ত, স্বাবলম্বী এবং প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সর্বাধিক জনপ্রিয়

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সাম্প্রতিক মন্তব্য

- বিজ্ঞাপন-spot_img
error: Content is protected !!