বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য ২০২৫ সালটি ছিল এক অবিস্মরণীয় বছর। সদ্য বিদায়ী এই বছরে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশজুড়ে মোট রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ৩৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। দেশের ইতিহাসে এক বছরে এত বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আগে কখনো আসেনি।
মূলত হুন্ডি ও অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং প্রবাসীদের বৈধ পথে টাকা পাঠানোর আগ্রহ বৃদ্ধি পাওয়ায় এই ঐতিহাসিক সাফল্য অর্জিত হয়েছে।
প্রবৃদ্ধির হার ও পরিসংখ্যান
বাংলাদেশ ব্যাংক বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি ২০২৬) রেমিট্যান্স প্রবাহের যে হালনাগাদ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা যায় গত বছরের তুলনায় এ বছর রেমিট্যান্স প্রবাহে উল্লম্ফন ঘটেছে।
- ২০২৫ সাল: মোট রেমিট্যান্স ৩৩ বিলিয়ন ডলার (প্রায়)।
- ২০২৪ সাল: মোট রেমিট্যান্স ছিল ২৬.৬০ বিলিয়ন ডলার।
- প্রবৃদ্ধি: আগের বছরের তুলনায় রেমিট্যান্স বেড়েছে ২৩.৩৪ শতাংশ।
এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে যে, দেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালী হয়েছে।
ডিসেম্বরে চমক ও একক মাসের রেকর্ড
বছরের শেষ মাস, অর্থাৎ ২০২৫ সালের ডিসেম্বরেও রেমিট্যান্স প্রবাহ ছিল ঊর্ধ্বমুখী। শুধুমাত্র ডিসেম্বর মাসেই দেশে এসেছে ৩.২২ বিলিয়ন ডলার। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একক মাস হিসেবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আহরণের রেকর্ড। এর আগে, একক মাসে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছিল ২০২৫ সালের মার্চ মাসে, যার পরিমাণ ছিল ৩.২৯ বিলিয়ন ডলার।
যদি আমরা ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের সাথে তুলনা করি, তবে দেখা যায়:
- ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে এসেছিল ২.৬৩ বিলিয়ন ডলার।
- ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তা বেড়ে হয়েছে ৩.২২ বিলিয়ন ডলার।
- এক বছরের ব্যবধানে ডিসেম্বর মাসে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২২.৩০ শতাংশ।
কেন বাড়ল প্রবাসী আয়?
হঠাৎ করে রেমিট্যান্স প্রবাহে এমন জোয়ার আসার পেছনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
১. বৈধ পথের ব্যবহার: বিগত বছরে অর্থ পাচার বা মানি লন্ডারিংয়ের বিরুদ্ধে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক কঠোর অবস্থান নিয়েছিল। ফলে হুন্ডির মতো অবৈধ মাধ্যমগুলো অনেকটাই সংকুচিত হয়েছে।
২. ডলারের যৌক্তিক দর: ব্যাংকিং চ্যানেলে ডলারের বিনিময় হার বাজারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করায় প্রবাসীরা বৈধ পথে টাকা পাঠাতে উৎসাহিত হয়েছেন।
৩. প্রবাসীদের সচেতনতা: দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে প্রবাসীরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। তারা ঝুঁকি এড়িয়ে ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা পাঠানোকেই নিরাপদ মনে করছেন।
অর্থনীতিতে স্বস্তি
রেমিট্যান্সের এই রেকর্ড পরিমাণ প্রবাহ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। ডলার সংকটের যে ধকল অর্থনীতিতে ছিল, তা কাটিয়ে উঠতে এই ৩৩ বিলিয়ন ডলার বড় ভূমিকা রাখবে। আমদানী দায় মেটানো এবং সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষায় এই অর্থ বড় শক্তি হিসেবে কাজ করবে।
প্রবাসীরা তাদের কষ্টার্জিত অর্থ দেশে পাঠিয়ে কেবল নিজেদের পরিবারকেই ভালো রাখছেন না, বরং জাতীয় অর্থনীতিকেও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়ে দিচ্ছেন। ২০২৬ সালেও এই ধারা অব্যাহত থাকবে বলে আশা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।








