নতুন বছরের শুরুতেই মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীদের জন্য আসছে বড় পরিবর্তন। সিম কার্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রে সরকার ও বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) আরও কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে। অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা রোধ, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড দমন এবং সিমের অপব্যবহার ঠেকাতে বিটিআরসি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, আগামী ১ জানুয়ারি থেকে একজন গ্রাহক তার জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ব্যবহার করে সর্বোচ্চ ৫টি সিম সক্রিয় রাখতে পারবেন।
এর আগে এক এনআইডিতে ১৫টি পর্যন্ত সিম নিবন্ধনের সুযোগ থাকলেও, নতুন বছরে সেই নিয়ম আর থাকছে না। আপনার নামে যদি ৫টির বেশি সিম থাকে, তবে এখনই সতর্ক হওয়ার সময়।
বিটিআরসির নতুন নির্দেশনা ও কঠোর অবস্থান
বিটিআরসি জানিয়েছে, দেশের টেলিযোগাযোগ খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগামী ১ জানুয়ারি থেকে এই নিয়ম কার্যকর হবে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী:
- একজন গ্রাহক তার এনআইডি দিয়ে সর্বোচ্চ ৫টি সিম সচল রাখতে পারবেন।
- যাদের নামে বর্তমানে ৬ থেকে ১০টি সিম রয়েছে, তাদের অতিরিক্ত সিমগুলো পর্যায়ক্রমে বন্ধ করে দেওয়া হবে।
- গ্রাহকদের ধাপে ধাপে সিমের সংখ্যা কমিয়ে ৫-এর কোঠায় নামিয়ে আনতে হবে।
যদিও মোবাইল ফোন অপারেটররা এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে আসছে, কারণ এতে তাদের সক্রিয় গ্রাহক সংখ্যা কমে যাবে এবং আয়ে প্রভাব পড়বে। কিন্তু বিটিআরসি জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে এই সিদ্ধান্তে অটল রয়েছে।
কেন এই কঠোর সিদ্ধান্ত?
বর্তমানে বিশ্বে মোবাইল সিম ব্যবহারের দিক দিয়ে বাংলাদেশ নবম অবস্থানে রয়েছে। বিটিআরসির তথ্যমতে, এই তালিকায় বাংলাদেশ পেছনে ফেলেছে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জাপান, জার্মানি, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের মতো উন্নত দেশগুলোকে।
জনসংখ্যার তুলনায় সিমের এই বিপুল সংখ্যা অনেক ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় এবং ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছে নিয়ন্ত্রণ সংস্থা। অনেক সময় দেখা যায়, একজনের এনআইডি দিয়ে তোলা সিম অন্য কেউ ব্যবহার করে অপরাধমূলক কাজ করছে। সিমের সংখ্যা কমিয়ে আনলে এই ধরনের জালিয়াতি এবং অনিয়ম নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে।
সিম ব্যবহারের বর্তমান পরিসংখ্যান
বিটিআরসির সর্বশেষ প্রকাশিত (অক্টোবর মাস) পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশের মোবাইল খাতের চিত্র বেশ বিশাল:
- মোট ব্যবহারকারী: দেশে বর্তমানে মোবাইল সিম ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি ৭৯ লাখ ৭০ হাজার।
- মোট নিবন্ধিত সিম: দেশে বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে নিবন্ধিত মোট সিমের সংখ্যা ২৬ কোটি ৬৩ লাখ।
- সক্রিয় বনাম নিষ্ক্রিয়: নিবন্ধিত সিমের মধ্যে প্রায় ১৯ কোটি সিম সক্রিয় আছে, বাকিগুলো নিষ্ক্রিয় অবস্থায় পড়ে আছে।
অপারেটর ভিত্তিক গ্রাহক সংখ্যা:
- গ্রামীণফোন: ৮ কোটি ৫৯ লাখ।
- রবি: ৫ কোটি ৭৫ লাখ।
- বাংলালিংক: ৩ কোটি ৭৯ লাখ।
- টেলিটক: ৬৬ লাখ ৭০ হাজার।
অতিরিক্ত সিম বাতিল কার্যক্রম ও সময়সীমা
বিটিআরসি গত আগস্ট মাসেই অতিরিক্ত সিম ব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দিয়েছিল। তখন বলা হয়েছিল, এক ব্যক্তির নামে ১০টির বেশি সক্রিয় সিম থাকলে অতিরিক্ত সিমগুলো ৩০ অক্টোবরের মধ্যে বাতিল বা মালিকানা পরিবর্তন করতে হবে।
সংস্থার তথ্যমতে:
- আগস্ট মাসে এক ব্যক্তির নামে ১০টির বেশি সক্রিয় সিম ছিল এমন গ্রাহকের সংখ্যা ছিল প্রায় ৬৭ লাখ।
- গত তিন মাসে নির্দেশনার পর প্রায় ১৫ লাখ সিম গ্রাহকরা স্বেচ্ছায় বাতিল করেছেন।
- তবে এখনো প্রায় ৫০ থেকে ৫৩ লাখ অতিরিক্ত সিম বাতিল করা হয়নি।
যারা নির্ধারিত ৩০ অক্টোবরের মধ্যে ১০টির বেশি থাকা অতিরিক্ত সিম বাতিল করেননি, তাদের সিমগুলো অপারেটরদের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে বন্ধ করে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আর ১ জানুয়ারি থেকে ৫টির বেশি সিম থাকার বিষয়টিতেও একই ধরনের কঠোরতা প্রয়োগ করা হবে।
আপনার নামে কয়টি সিম? চেক করবেন যেভাবে
অনেকেই জানেন না তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি দিয়ে আসলে কয়টি সিম তোলা হয়েছে। অনেক সময় অজান্তেই আপনার নামে সিম তোলা থাকতে পারে। ১ জানুয়ারি থেকে যেহেতু কড়াকড়ি শুরু হচ্ছে, তাই এখনই আপনার সিমের সংখ্যা যাচাই করে নেওয়া জরুরি।
খুব সহজেই ঘরে বসে এটি চেক করতে পারেন:
- আপনার মোবাইলের ডায়াল অপশনে গিয়ে টাইপ করুন *16001#
- ফিরতি মেসেজে আপনার এনআইডি কার্ডের শেষের ৪টি ডিজিট চাইবে।
- এনআইডির শেষের ৪টি সংখ্যা দিয়ে সেন্ড করুন।
- ফিরতি এসএমএসে আপনাকে জানিয়ে দেওয়া হবে, আপনার ওই এনআইডি দিয়ে মোট কয়টি সিম বায়োমেট্রিক রেজিস্ট্রেশন করা আছে এবং কোন অপারেটরের কয়টি।
যদি দেখেন আপনার নামে ৫টির বেশি সিম বা অপরিচিত কোনো নম্বর নিবন্ধিত আছে, তবে দ্রুত সংশ্লিষ্ট মোবাইল অপারেটরের কাস্টমার কেয়ারে গিয়ে অতিরিক্ত বা অপ্রয়োজনীয় সিমটি বন্ধ (Deactivate) করে দিন।
গ্রাহকদের করণীয়
১ জানুয়ারি থেকে যেহেতু ৫টি সিমের সময়সীমা কার্যকর হচ্ছে, তাই গ্রাহকদের উচিত এখনই সচেতন হওয়া।
- আপনার প্রয়োজন নেই এমন সিমগুলো নিজের নাম থেকে মুছে ফেলুন।
- পরিবারের অন্য সদস্যদের এনআইডি দিয়ে সিমগুলো ট্রান্সফার বা মালিকানা পরিবর্তন করে নিতে পারেন।
- মনে রাখবেন, সিমের সংখ্যা ৫-এর মধ্যে রাখলে ভবিষ্যতে যেকোনো আইনি জটিলতা থেকে মুক্ত থাকা সহজ হবে।
প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে বিটিআরসির এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে সাধারণ গ্রাহকদের যাতে ভোগান্তি না হয়, সেদিকেও লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন। ১ জানুয়ারির আগেই নিজের সিমের হিসাব মিলিয়ে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে। অতিরিক্ত সিম কার্ড বন্ধ হলে সাময়িক অসুবিধা হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি সাইবার অপরাধ ও জালিয়াতি কমাতে সাহায্য করবে।
এক এনআইডিতে ৫টির বেশি সিম নয় সম্পর্কিত প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ)
প্রশ্ন: একজন কয়টি সিম চালাতে পারবে?
উত্তর: ১ জানুয়ারি থেকে একজন গ্রাহক তার এনআইডি দিয়ে সর্বোচ্চ ৫টি সিম সক্রিয় রাখতে পারবেন।
প্রশ্ন: অতিরিক্ত সিম থাকলে কী হবে?
উত্তর: ৫টির বেশি সিম থাকলে বিটিআরসির নির্দেশ অনুযায়ী অতিরিক্ত সিমগুলো পর্যায়ক্রমে বন্ধ করে দেওয়া হবে।
প্রশ্ন: সিমের সংখ্যা চেক করার নিয়ম কী?
উত্তর: মোবাইলে *১৬০০১# ডায়াল করে এনআইডির শেষের ৪টি সংখ্যা দিলে জানা যাবে আপনার নামে কয়টি সিম আছে।
প্রশ্ন: নতুন সিমের নিয়ম কবে থেকে চালু হবে?
উত্তর: ১ জানুয়ারি থেকে সর্বোচ্চ ৫টি সিম রাখার নতুন নিয়ম কার্যকর হবে বলে বিটিআরসি জানিয়েছে।
প্রশ্ন: বিটিআরসি সিম বন্ধ করছে কেন?
উত্তর: অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা রোধ, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড দমন এবং সিমের অপব্যবহার ঠেকাতে এই কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রশ্ন: আগে কয়টি সিম রাখা যেত?
উত্তর: আগে এক এনআইডিতে সর্বোচ্চ ১৫টি পর্যন্ত সিম নিবন্ধনের সুযোগ ছিল, যা এখন কমিয়ে ৫টি করা হচ্ছে।
প্রশ্ন: অতিরিক্ত সিম কীভাবে বন্ধ করব?
উত্তর: সংশ্লিষ্ট মোবাইল অপারেটরের কাস্টমার কেয়ারে গিয়ে অতিরিক্ত বা অপ্রয়োজনীয় সিমটি ডিঅ্যাক্টিভেট বা বন্ধ করতে পারবেন।
প্রশ্ন: বাংলাদেশে মোট সিম ব্যবহারকারী কত?
উত্তর: বিটিআরসির সর্বশেষ তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে মোবাইল সিম ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি ৭৯ লাখ ৭০ হাজার।
প্রশ্ন: সিমের মালিকানা বদলানো যাবে কি?
উত্তর: হ্যাঁ, পরিবারের অন্য সদস্যদের এনআইডি দিয়ে সিমগুলো ট্রান্সফার বা মালিকানা পরিবর্তন করে নেওয়া যাবে।
প্রশ্ন: সিম চেক করার কোড কত?
উত্তর: সিম চেক করার ইউএসএসডি (USSD) কোড হলো *16001#
প্রশ্ন: এক এনআইডিতে কয়টি সিম রাখা যাবে?
উত্তর: একটি NID (জাতীয় পরিচয়পত্র) দিয়ে বর্তমানে সর্বোচ্চ ১০টি সিম রাখা যায়, তবে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) ২০২৩ সালের শেষের দিকে এই সীমা কমিয়ে প্রতি NID-তে ৫টি করার নির্দেশনা দিয়েছে, যা ২০২৬ সাল থেকে কার্যকর হবে, তাই নতুন নিয়মে এই সংখ্যা ৫টি হবে।
প্রশ্ন: একজনের নামে কয়টি সিম রাখা যাবে?
উত্তর: এক এনআইডিতে সর্বোচ্চ ৫ সিম রাখা যাবে।
প্রশ্ন: একটি এনআইডি দিয়ে কয়টি সিম রেজিস্ট্রেশন করা আছে দেখবো কিভাবে?
উত্তর: একটি এনআইডি দিয়ে কয়টি সিম রেজিস্ট্রেশন করা আছে দেখার কোড হলো *16001#








