হটলাইনঃ +৮৮০ ৯৬১৩ ০০০ ২০০ |
Wednesday, September 23, 2026
- বিজ্ঞাপন-spot_img
Homeজাতীয়উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি ভাগাভাগি ও বিক্রিতে এলো বড় পরিবর্তন: যা আপনার...
spot_img

উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি ভাগাভাগি ও বিক্রিতে এলো বড় পরিবর্তন: যা আপনার জানা জরুরি

বর্তমানে বাংলাদেশে জমি-জমা সংক্রান্ত বিরোধের একটি বড় অংশজুড়ে থাকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তি। অনেক সময় দেখা যায়, ভাই-বোন বা অন্যান্য ওয়ারিশদের না জানিয়েই একজন অংশীদার তার ভাগের জমি বিক্রি করে দিচ্ছেন। এতে পারিবারিক অশান্তি থেকে শুরু করে দীর্ঘমেয়াদী মামলা-মোকদ্দমা তৈরি হয়। এই অরাজকতা বন্ধ করতে এবং জমির মালিকানায় স্বচ্ছতা আনতে সরকার ভূমি আইনে যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে।

এখন থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তি কেবল মৌখিক বা অনানুষ্ঠানিক আপোষে ভাগ করলে হবে না, বরং সরকারি নিয়ম মেনে আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক। চলুন জেনে নেই নতুন এই নিয়মের বিস্তারিত।

উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে নতুন বিধান কী?

সরকারের নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত কোনো সম্পত্তি বিক্রি, নামজারি (Mutation) বা রেকর্ড সংশোধন করার আগে অবশ্যই একটি ‘আপোষ বণ্টননামা’ দলিল তৈরি করতে হবে। এই দলিলটি হবে সব ওয়ারিশের সম্মতিতে এবং এটি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে রেজিস্ট্রি করতে হবে।

আগে অনেকে খসড়া কাগজ বা মৌখিক সম্মতিতে জমি ভোগদখল করতেন। কিন্তু বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, যতক্ষণ পর্যন্ত রেজিস্ট্রিকৃত বণ্টননামা দলিল না থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত সেই জমির মালিকানা আইনগতভাবে পূর্ণতা পাবে না।

জমি বিক্রির আগে বণ্টননামা কেন বাধ্যতামূলক?

আপনি যদি আপনার পৈত্রিক সম্পত্তি থেকে কিছু অংশ বিক্রি করতে চান, তবে ক্রেতা আপনার কাছ থেকে শুধু ওয়ারিশন সার্টিফিকেট দেখলেই জমি কিনবেন না। তাকে অবশ্যই দেখতে হবে যে, সব অংশীদারের মধ্যে জমিটি আইনগতভাবে বণ্টন হয়েছে কি না।

বণ্টননামা বাধ্যতামূলক করার মূল কারণগুলো হলো:

  • স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা: কার অংশে কোন জমি পড়েছে তা দলিলে স্পষ্টভাবে লেখা থাকে।
  • জালিয়াতি রোধ: অন্য ওয়ারিশদের ঠকিয়ে জমি বিক্রির সুযোগ বন্ধ করা।
  • মামলা কমানো: বণ্টন স্পষ্ট থাকলে পরবর্তীতে কেউ মালিকানা দাবি করে মামলা করতে পারে না।

আপোষ বণ্টননামা দলিল কী এবং কীভাবে করবেন?

আপোষ বণ্টননামা হলো একটি আইনি চুক্তি যেখানে মৃত ব্যক্তির সব ওয়ারিশ একত্রিত হয়ে নিজেদের মধ্যে জমি ভাগ করে নেন। এটি করার প্রক্রিয়া নিচে দেওয়া হলো:

ক) ওয়ারিশ তালিকা সংগ্রহ

প্রথমে ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভা থেকে সঠিক ওয়ারিশন সার্টিফিকেট সংগ্রহ করতে হবে। সেখানে কতজন অংশীদার আছেন তার স্পষ্ট উল্লেখ থাকবে।

খ) জমি পরিমাপ ও চিহ্নিতকরণ

আমিন বা সার্ভেয়ার দিয়ে জমি মেপে কে কোন অংশে থাকবেন তা নকশা করে চিহ্নিত করতে হবে।

গ) দলিল প্রস্তুত ও রেজিস্ট্রি

সব অংশীদারের উপস্থিতিতে একটি বণ্টননামা দলিল লিখতে হবে। এরপর সেটি স্থানীয় সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে সরকারি ফি জমা দিয়ে রেজিস্ট্রি করতে হবে। মনে রাখবেন, একবার এই দলিল সম্পন্ন হলে তা আর সহজে বাতিল করা যায় না।

নামজারি ও রেকর্ড সংশোধনে নতুন নিয়ম

অনেকেই মনে করেন শুধু নামজারি (Mutation) করলেই মালিকানা চূড়ান্ত। কিন্তু নতুন নিয়ম অনুযায়ী, নামজারি করার সময়ও এখন বণ্টননামা দলিল দেখাতে হবে। আপনি যদি উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির রেকর্ড সংশোধন করতে চান, তবে এই দলিল ছাড়া ভূমি অফিস আপনার আবেদন গ্রহণ করবে না। অর্থাৎ, আপোষ বণ্টননামা ছাড়া মালিকানা আইনগতভাবে অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২৩

সরকার ভূমি অপরাধ রুখতে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ‘ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২৩’-এর বিধিমালার আওতায় এই নিয়মগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কেউ যদি ভুল তথ্য দিয়ে বা অন্য ওয়ারিশকে ফাঁকি দিয়ে জমি বিক্রি বা নামজারি করার চেষ্টা করেন, তবে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এই আইনে শাস্তির মধ্যে রয়েছে:

  • কারাদণ্ড বা জরিমানা।
  • অবৈধভাবে করা নামজারি বাতিল।
  • ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষকে ক্ষতিপূরণ প্রদান।

অনানুষ্ঠানিক ভাগের ঝুঁকি

আমাদের দেশের গ্রামগঞ্জে এখনো অনেক পরিবারে মৌখিকভাবে জমি ভাগ করে বছরের পর বছর বসবাস করা হয়। বড় কোনো সমস্যা না হলেও, আইনি জটিলতা দেখা দেয় যখন কেউ মারা যান বা জমি বিক্রি করার প্রয়োজন পড়ে।

অনানুষ্ঠানিক ভাগের বড় ঝুঁকিগুলো হলো: 

১. যেকোনো সময় অন্য ওয়ারিশ আপনার দখলকৃত জমির ওপর দাবি করতে পারেন। 

২. ব্যাংক লোন বা কোনো আইনি কাজে এই জমি বন্ধক রাখা যাবে না। 

৩. সরকারি কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ করলে ক্ষতিপূরণ পেতে সমস্যা হবে।

সাধারণ মানুষের জন্য করণীয়

আপনি যদি উত্তরাধিকার সূত্রে কোনো জমি পেয়ে থাকেন এবং এখনো বণ্টননামা না করে থাকেন, তবে দ্রুত নিচের পদক্ষেপগুলো নিন:

  • সব ভাই-বোন বা অংশীদারদের নিয়ে আলোচনায় বসুন।
  • সবাই মিলে সম্মতিতে পৌঁছালে একজন দক্ষ আইনজীবীর পরামর্শ নিন।
  • রেজিস্ট্রিকৃত আপোষ বণ্টননামা দলিল তৈরি করে রাখুন। এতে আপনার ভবিষ্যৎ প্রজন্মও আইনি ঝামেলা থেকে মুক্ত থাকবে।

কেন এই পরিবর্তন ইতিবাচক?

অনেকে মনে করতে পারেন এটি একটি অতিরিক্ত ঝামেলা। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে চিন্তা করলে এটি সাধারণ জনগণের জন্যই আশীর্বাদ। জমি নিয়ে যে হাজার হাজার মামলা আদালতে ঝুলে আছে, তার সিংহভাগই এই বণ্টননামা না থাকার কারণে। এই নিয়ম কার্যকর হলে জমি কেনা-বেচায় প্রতারণা বন্ধ হবে এবং সাধারণ মানুষের হয়রানি কমবে।


ভূমি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে সরকারের এই নতুন পদক্ষেপ অত্যন্ত প্রশংসনীয়। উত্তরাধিকার সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ মেটাতে এবং নিজের মালিকানা সুরক্ষিত করতে রেজিস্ট্রিকৃত আপোষ বণ্টননামার কোনো বিকল্প নেই। তাই আইনি জটিলতা এড়াতে আজই আপনার সম্পত্তির সঠিক বণ্টন নিশ্চিত করুন।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সর্বাধিক জনপ্রিয়

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সাম্প্রতিক মন্তব্য

- বিজ্ঞাপন-spot_img
error: Content is protected !!