সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত যুব এশিয়া কাপে আরও একটি অবিস্মরণীয় জয় তুলে নিয়েছে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট দল। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে শক্তিশালী শ্রীলঙ্কাকে ৩৯ রানে হারিয়ে তারা অপরাজিত থেকে সেমিফাইনালে পা রাখল। বুধবার দুবাইয়ের আইসিসি একাডেমি মাঠে টস হেরে প্রথমে ব্যাটিং করতে নামে বাংলাদেশ। শুরুতে ব্যাটসম্যানদের দারুণ পারফরম্যান্সের পর শেষ দিকে বোলারদের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে সহজ জয় নিশ্চিত হয় টাইগার যুবাদের। এই জয়ের ফলে ‘বি’ গ্রুপের পয়েন্ট তালিকায় শীর্ষস্থান দখল করল বাংলাদেশ। আগামী শুক্রবার সেমিফাইনালে তারা মুখোমুখি হবে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের। পুরো ম্যাচ জুড়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের মাঝে জয়ের যে ক্ষুধা দেখা গেছে তা সামনের বড় ম্যাচগুলোর জন্য ইতিবাচক সংকেত দিচ্ছে।
লঙ্কানদের বিপক্ষে টাইটানিক লড়াই ও বাংলাদেশের দাপট
ম্যাচের শুরু থেকেই বাংলাদেশ দলের ওপর চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করেছিল শ্রীলঙ্কান বোলাররা। তবে টস হেরে ব্যাটিংয়ে নামা বাংলাদেশের ওপেনাররা সেই চাপকে খুব সুন্দরভাবে সামলে নিয়েছেন। ওপেনিং জুটিতে জাওয়াদ আবরার এবং রিফাত বেগ দলকে একটি মজবুত ভিত্তি এনে দেন। তাদের অসাধারণ জুটিতে ৮৪ রান যোগ হওয়ায় বাংলাদেশের ইনিংস বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছিল। তবে মাঝপথে ব্যাটিং বিপর্যয়ের কারণে স্কোরটি আশানুরূপভাবে বড় হতে পারেনি। তারপরও বোলারদের নৈপুণ্যে অল্প পুঁজি নিয়েই লড়াই চালিয়ে যায় বাংলাদেশ। শ্রীলঙ্কা যখন লক্ষ্য তাড়া করতে নামে তখন বাংলাদেশের বোলাররা একের পর এক আঘাত হানতে শুরু করেন। শেষ পর্যন্ত ১৮৬ রানেই লঙ্কানদের ইনিংস থামিয়ে দেয় বাংলাদেশ যা টাইগারদের ধারাবাহিক সাফল্যের প্রতিফলন।
টপ অর্ডারের শক্ত ভিত্তি এবং মাঝপথে ব্যাটিং বিপর্যয়
বাংলাদেশের ইনিংসের অন্যতম বড় দিক ছিল টপ অর্ডারের ব্যাটসম্যানদের দায়িত্বশীল ব্যাটিং। ওপেনার জাওয়াদ আবরার বর্তমান টুর্নামেন্টে দারুণ ছন্দে আছেন। তিনি আজও ৩৯ বলে ৪৯ রানের একটি চমৎকার ইনিংস খেলেন যেখানে ৪টি ছক্কা ও ৪টি চারের মার ছিল। মাত্র ১ রানের জন্য তিনি ফিফটি মিস করলেও তার এই দ্রুতগতির রান দলের সংগ্রহকে গতি দিয়েছিল। রিফাত বেগও তাকে যোগ্য সঙ্গ দিয়েছেন এবং ৩৬ রান করে আউট হন। তবে প্রথম চার ব্যাটসম্যান ভালো শুরুর পর দলের মিডল অর্ডার এবং লোয়ার মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যানরা প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি। এক সময় বাংলাদেশের স্কোর ২ উইকেটে ১৫৬ রান থাকলেও সেখান থেকে মাত্র ২২৫ রানেই সবকটি উইকেট হারিয়ে ফেলে দলটি। শেষ দিকে নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারানো বাংলাদেশের জন্য চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
জাওয়াদ আবরারের আক্ষেপ ও লড়াকু পুঁজি গঠনে লড়াই
জাওয়াদ আবরার আগের দুই ম্যাচেও ফিফটি করেছিলেন এবং আজও তার ব্যাটে বড় স্কোরের আভাস পাওয়া যাচ্ছিল। তবে দুর্ভাগ্যবশত তিনি ৪৯ রানে সাজঘরে ফেরেন। জাওয়াদের বিদায়ের পর আজিজুল হাকিম এবং কালাম সিদ্দিকী ইনিংস মেরামতের কাজ শুরু করেন। তাদের জুটিতে ৫৩ রান যোগ হওয়ার পর বাংলাদেশের স্কোর বেশ ভালো অবস্থানে ছিল। আজিজুল হাকিম ২৯ এবং কালাম সিদ্দিকী ৩২ রান করেন। উইকেট রক্ষক ব্যাটসম্যান ফরিদ খানও শেষ দিকে ২৯ রানের একটি প্রয়োজনীয় ইনিংস খেলে দলকে ২০০ রানের গণ্ডি পার হতে সাহায্য করেন। তবে লঙ্কান স্পিনার কাভিজা গামাগের ঘূর্ণিতে বাংলাদেশ পথ হারিয়ে ফেলে। তিনি মাত্র ২৮ রান দিয়ে ৪টি উইকেট শিকার করেন যা বাংলাদেশের ইনিংসকে অল্পতেই গুটিয়ে দেয়।
নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে ইকবালের অলরাউন্ড নৈপুণ্য
২২৫ রানের অল্প পুঁজি নিয়ে জয়ের স্বপ্ন দেখা খুব কঠিন ছিল তবে বাংলাদেশের বোলাররা সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করেছেন। বিশেষ করে ইকবাল হোসেনের অলরাউন্ড পারফরম্যান্স দলের জয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে। ব্যাটিংয়ের সময় শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে নেমে ইকবাল ৬ বলে ১২ রান করেন যেখানে দুটি ছক্কা ছিল। তার এই ছোট ঝোড়ো ইনিংসটি ইনিংসের শেষ মুহূর্তে মানসিক শক্তি যুগিয়েছে। এরপর বোলিং হাতেও তিনি ছিলেন বিধ্বংসী। ১০ ওভারে স্রেফ ৩৭ রান দিয়ে তিনি লঙ্কানদের গুরুত্বপূর্ণ ৩টি উইকেট তুলে নেন। ইকবালের এই চমৎকার পারফরম্যান্সের জন্য তাকে ম্যাচ সেরার পুরস্কার দেওয়া হয়। তার সাথে পাল্লা দিয়ে বোলিং করেছেন শাহরিয়ার আহমেদ এবং সামিউন বাশিরও যা শ্রীলঙ্কার ব্যাটসম্যানদের ক্রিজে সেট হতে দেয়নি।
লঙ্কান ব্যাটিং লাইনআপে ধস ও বোলারদের একক আধিপত্য
শ্রীলঙ্কা যখন লক্ষ্য তাড়া করতে নামে তখন তাদের শুরুটা একেবারেই ভালো হয়নি। বাংলাদেশের পেসার ইকবাল এবং স্পিনার সামিউন বাশির শুরু থেকেই লঙ্কান ব্যাটসম্যানদের চেপে ধরেন। মাত্র ৪৪ রানেই শ্রীলঙ্কার ৪টি উইকেট পড়ে যায় যা তাদের জয়ের পথকে কঠিন করে তোলে। যদিও মাঝপথে ভিমাথ দিনসারা এবং চামিকা হিনাতিগালা প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করেছিলেন তবে শাহরিয়ার আহমেদের ঘূর্ণিতে সেই প্রতিরোধ ভেঙে যায়। চামিকা হিনাতিগালা দলের পক্ষে সর্বোচ্চ ৪১ রান করেন এবং আদাম হিলমি ৩৯ রান করেন। তবে বাংলাদেশের বোলারদের নিয়ন্ত্রিত লাইনে বোলিং করার সামনে লঙ্কানদের শেষ দিকের ব্যাটসম্যানরা দাঁড়াতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত ৪৯.১ ওভারে ১৮৬ রানে অলআউট হয়ে যায় শ্রীলঙ্কা।
সেমিফাইনালে পাকিস্তানের মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ
গ্রুপ পর্বের তিনটি ম্যাচেই জয়লাভ করে বাংলাদেশ এখন আত্মবিশ্বাসের তুঙ্গে রয়েছে। গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুবাদে সেমিফাইনালে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ হচ্ছে পাকিস্তান যারা ‘এ’ গ্রুপের রানার্সআপ হয়েছে। আগামী শুক্রবার এই হাইভোল্টেজ ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে। পাকিস্তানের মতো দলের বিপক্ষে জয় পেতে হলে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের আরও একটু দায়িত্বশীল হতে হবে কারণ গত ম্যাচে তারা ব্যাটিং ধসের শিকার হয়েছিলেন। তবে বাংলাদেশের বোলাররা যেভাবে নিয়মিত সাফল্য পাচ্ছেন তাতে পাকিস্তানের বিপক্ষে জয়ের আশা রাখা যায়। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কাও সেমিফাইনালে উঠেছে তবে তাদের খেলতে হবে শক্তিশালী ভারতের বিপক্ষে। ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে সেমিফাইনালে একটি তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
এই ম্যাচের অন্যতম টার্নিং পয়েন্ট ছিল বাংলাদেশের বোলারদের শুরুর স্পেল। অল্প রান নিয়ে খেলতে নেমে যখন দ্রুত উইকেট পাওয়া যায় তখন প্রতিপক্ষ মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। বাংলাদেশের বোলাররা ঠিক সেই কাজটিই করেছেন। এছাড়া শাহরিয়ার আহমেদের ২৭ রানে ৩ উইকেট শিকার করাও ছিল গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক। বাংলাদেশের যুব দল বর্তমানে খুব ভালো ফুটবল ক্রিকেটের ব্র্যান্ড খেলছে। ফিল্ডিং ইউনিটও ছিল বেশ তৎপর যা লঙ্কানদের রান নিতে বাধা দিয়েছে। টুর্নামেন্টের এই পর্যায়ে অপরাজিত থাকা যেকোনো দলের জন্যই বড় অনুপ্রেরণা। তবে সেমিফাইনালের আগে মিডল অর্ডারের ব্যাটিং দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা জরুরি। যদি ব্যাটসম্যানরা বড় ইনিংস খেলতে পারেন তবে বাংলাদেশের সামনে এশিয়া কাপের শিরোপা জয়ের উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে।
সেমিফাইনাল ও ফাইনালের হিসাব-নিকাশ এবং পরবর্তী প্রস্তুতি
এশিয়া কাপের এই আসরে বাংলাদেশ যেভাবে খেলছে তাতে অনেক বিশেষজ্ঞই মনে করছেন তারা ফাইনাল খেলার দাবিদার। পাকিস্তান দলের বোলিং আক্রমণও বেশ শক্তিশালী তাই বাংলাদেশের ওপেনারদের ওপর আবারও বড় দায়িত্ব থাকবে। অধিনায়ক এবং কোচ নিশ্চয়ই এই ম্যাচের ভুলগুলো নিয়ে কাজ করবেন। বিশেষ করে বড় ইনিংস খেলার যে প্রবণতা টপ অর্ডারে দেখা গেছে তা আরও একটু বাড়াতে হবে। বোলারদের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা এবং গুরুত্বপূর্ণ সময়ে উইকেট শিকার করার সক্ষমতা বাংলাদেশকে অন্য দলগুলোর চেয়ে এগিয়ে রাখছে। দেশের ক্রিকেট ভক্তরা আশা করছেন এই যুব দল আবারও দেশের জন্য বড় কোনো ট্রফি বয়ে আনবে।
যুব এশিয়া কাপে বাংলাদেশের জয় কেবল একটি ম্যাচের জয় নয় বরং এটি টাইগার যুবাদের সামর্থ্যের নতুন প্রমাণ। শ্রীলঙ্কার মতো শক্তিশালী দলকে পরাজিত করে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়া নিঃসন্দেহে বড় অর্জন। ব্যাটিংয়ে কিছু ঘাটতি থাকলেও বোলারদের ওপর ভর করে বাংলাদেশ এখন সেমিফাইনালের স্বপ্ন দেখছে। খেলোয়াড়দের মধ্যে যে একতা ও জেদ দেখা গেছে তা বজায় থাকলে পাকিস্তান বাধা টপকে ফাইনালে যাওয়া কঠিন হবে না। বাংলাদেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ এই তরুণদের কাঁধেই সুরক্ষিত। আমরা আশা করি সেমিফাইনালে তারা আরও শক্তিশালী হয়ে মাঠে নামবে এবং ফাইনালের টিকেট নিশ্চিত করবে। এই বিজয় পুরো জাতিকে গর্বিত করেছে এবং ভবিষ্যতে আরও বড় সাফল্যের জন্য অনুপ্রেরণা জোগাবে।








