হটলাইনঃ +৮৮০ ৯৬১৩ ০০০ ২০০ |
সোমবার, জুন ২২, ২০২৬
- বিজ্ঞাপন-spot_img
Homeজাতীয়হাদির মাথায় গুলি: অবস্থা 'খুবই খারাপ', কী বলছেন চিকিৎসকরা?
spot_img

হাদির মাথায় গুলি: অবস্থা ‘খুবই খারাপ’, কী বলছেন চিকিৎসকরা?

শুক্রবার জুমার নামাজের পর ঢাকার বিজয়নগরের বক্স কালভার্ট রোডে মারাত্মক হামলার শিকার হন ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক এবং ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী শরীফ ওসমান বিন হাদি। মোটরসাইকেলে আসা অজ্ঞাতনামা হামলাকারীরা তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায় এবং মুহূর্তের মধ্যে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। বেলা ২টা ২৫ মিনিটের দিকে ঘটে যাওয়া এই ঘটনাটি পুরো রাজনৈতিক অঙ্গনে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে।

গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর হাদিকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসকরা জানান, গুলিটি তার মাথায় আঘাত করে। তার অবস্থা এতটাই গুরুতর ছিল যে, তাকে সঙ্গে সঙ্গেই হাসপাতালের ‘লাইফ সাপোর্টে’ রাখা হয়।

আঘাতের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, তার মাথায় জরুরি অস্ত্রোপচার করা হয়। অস্ত্রোপচার শেষে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরো সার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক জাহিদ রায়হান সাংবাদিকদের কাছে তার শারীরিক অবস্থার সর্বশেষ তথ্য তুলে ধরেন। অধ্যাপক রায়হান জানান, হাদির অবস্থা ‘খুবই খারাপ’। তারা তার বিষয়ে কোনো আশার কথা বলতে পারছেন না।

চিকিৎসক আরও জানান, অস্ত্রোপচারের সময় হাদির দুবার কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট বা হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়েছে এবং অস্ত্রোপচারের পরেও তার নাক-মুখ দিয়ে রক্ত বের হতে দেখা যায়। এমন পরিস্থিতিতে চিকিৎসকরা তার অবস্থা ‘সর্বোচ্চ খারাপ’ বলে উল্লেখ করেছেন। অধ্যাপক রায়হান বলেন, “উনি সর্বোচ্চ খারাপ অবস্থায় আছেন, কিন্তু বেঁচে আছেন এখনো। বাকিটা আল্লাহর ইচ্ছা।”

গুলি কি ভেতরে ছিল নাকি বেরিয়ে গেছে? চিকিৎসকের ব্যাখ্যা

গুলিবিদ্ধ রোগীর ক্ষেত্রে একটি বড় প্রশ্ন থাকে, গুলিটি মাথার ভেতরে রয়ে গেছে নাকি বাইরে বেরিয়ে গেছে। এই বিষয়ে অধ্যাপক জাহিদ রায়হান বলেন, “খুব সম্ভবত গুলি বেরিয়ে গেছে।” তিনি জানান, হামলাকারীরা ডান দিক থেকে গুলি করে এবং গুলিটি ডান দিক দিয়ে ঢুকে বাম দিক দিয়ে বেরিয়ে গেছে বলে তারা ধারণা করছেন।

চিকিৎসকের ভাষ্য অনুযায়ী, গুলিটি হাড্ডি ভেঙে বেরিয়ে যাওয়ার সময় এর কিছু ছোট ছোট অংশ মাথার ভেতরে রয়ে গিয়েছিল। অস্ত্রোপচারের সময় চিকিৎসকরা সেই ছোট অংশগুলো অত্যন্ত যত্ন সহকারে বের করে আনেন এবং সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেন।

তবে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেন, যদি গুলি মগজের একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে রয়ে যায়, তবে সেখানে আলাদাভাবে ‘অ্যাপ্রোচ’ করার বা গুলি বের করার প্রয়োজন হয় না এবং সাধারণত তা করাও হয় না। কিন্তু হাদির ক্ষেত্রে তাদের ধারণা, গুলি মাথা ফুঁড়ে বেরিয়ে গেছে।

গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার ও পরবর্তী চিকিৎসা ব্যবস্থা

অধ্যাপক জাহিদ রায়হান অস্ত্রোপচারের পদ্ধতির বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দেন। তিনি জানান, মাথার ভেতরে চাপ কমানোর জন্য তারা এক বিশেষ ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন। এই পদ্ধতি সম্পর্কে তিনি বলেন, “এ ধরণের ক্ষেত্রে আমরা খুলি খুলে ফেলে মগজের ভেতরের রক্তটা বের করে দিই, যেন মগজের ভেতরে যে চাপটা আছে, তা কমার সুযোগ পায়, ব্রেইন বড় হওয়ার সুযোগ পায়। এটাই এ ধরনের রোগীর ম্যানেজমেন্ট।”

গুরুত্বপূর্ণ এই অস্ত্রোপচারের পর রোগীর আরও উন্নত চিকিৎসা এবং ভালো আইসিইউ সাপোর্টের প্রয়োজন হয়। হাদির স্বজনদের মতামতের ভিত্তিতে এবং উন্নত চিকিৎসার আশায় শুক্রবার রাত ৮টার দিকে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

হাদির শারীরিক অবস্থা যে খুবই নাজুক, তা তার চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত প্রতিটি সদস্যের কথায় স্পষ্ট। অধ্যাপক রায়হান বলেন, “তার ওভারঅল কন্ডিশন খুবই খারাপ। আমরা যখন তার অস্ত্রপচার করি তখন তার ভাই, যিনি গুলিবদ্ধ হওয়ার সময় সঙ্গেই ছিলেন, তিনি ভাবছিলেন হাদি মারা গেছেন। কিন্তু সে এখনো বেঁচে আছে, কিন্তু খুব ক্রিটিকাল।”

তবে একটি আশার কথা ছিল যে, অপারেশনের জন্য যখন তাকে এনেস্থেসিয়া বা অজ্ঞান করার ওষুধ দেওয়া হচ্ছিল, তখন তার শরীর সাড়া দিয়েছে বলে এনেস্থেসিয়ার ডাক্তাররা জানিয়েছেন। এটি জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা একজন রোগীর জন্য সামান্য হলেও ইতিবাচক সংকেত।

হামলার পেছনের কারণ ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়ার পরই হাদির ওপর এই হামলা হলো। ঢাকা-৮ আসনটি মতিঝিল, শাহজাহানপুর, পল্টন, রমনা ও শাহবাগ থানা এলাকা নিয়ে গঠিত। এই আসনে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দল থেকেও প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বা নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

  • বিএনপি: এই আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস। হামলার খবর পেয়ে তিনি দ্রুত বিকাল ৪টার দিকে হাদিকে দেখতে ঢাকা মেডিকেলে ছুটে আসেন।
  • জামায়াত: জামায়াতে ইসলামী থেকে এ আসনে ভোটের প্রস্তুতি নিচ্ছেন দলের নায়েবে আমির হেলাল উদ্দিন।
  • বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পাটি: বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি থেকে সেখানে মনোনয়ন পেয়েছেন দলের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক।

হামলার দিন, অর্থাৎ শুক্রবার জুমার নামাজের পর বিজয়নগর এলাকায় হাদির লিফলেট বিলি কর্মসূচি ছিল। তার একজন সহযোদ্ধা জানান, তারা জুমার নামাজের পর লিফলেট বিলি শেষে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একত্রিত হয়ে দুপুরের খাবার এবং আলোচনা করার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু এর মধ্যেই হাদির ওপর হামলার খবর আসে।

ডিএমপির জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান নিশ্চিত করেন, “জুমার নামাজের পর বেলা ২টা ২৫ মিনিটে বিজয়নগর বক্স কালভার্ট এলাকায় মোটরসাইকেলে আসা হামলাকারীরা হাদিকে গুলি করে পালিয়ে যায়।”

হামলার পর ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগের সামনে প্রচুর ভিড় তৈরি হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশ, র‌্যাব ও সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়।

শরীফ ওসমান বিন হাদি ও ‘ইনকিলাব মঞ্চ’

শরীফ ওসমান বিন হাদি শুধু একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে পরিচিত নন, তিনি একটি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্লাটফর্ম ‘ইনকিলাব মঞ্চের’ আহ্বায়ক। গত জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থানের পর তার হাত ধরেই এই সংগঠনটি গড়ে ওঠে।

ইনকিলাব মঞ্চের ঘোষিত লক্ষ্য হলো ‘সব ধরনের আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র বিনির্মাণ’। এটি একটি ভিন্নধর্মী রাজনৈতিক চিন্তা নিয়ে গঠিত প্লাটফর্ম, যা দেশের প্রচলিত রাজনীতির বাইরে নতুন একটি ধারা তৈরির চেষ্টা করছে।

রাজনৈতিকভাবে হাদি ছিলেন স্পষ্টভাষী এবং সমালোচনামুখর। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ হিসেবে তিনি বিভিন্ন সময় আলোচিত মন্তব্য করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর তিনি বলেছিলেন, “এই রায় পুরো পৃথিবীর জন্য নজির স্থাপন করেছে।”

এছাড়াও, গত জুলাইয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষ্ঠানে তিনি মন্তব্য করেছিলেন যে, বিএনপি যদি ‘পুরনো ধারায়’ রাজনীতি করে ক্ষমতায় আসে, তবে তারা দুই বছরও ক্ষমতায় টিকতে পারবে না। একই অনুষ্ঠানে তিনি সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়েও সমালোচনা করেছিলেন।

দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তার ভাবনা ছিল গভীর। তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের দুর্বলতা এবং দৃশ্যত পরিবর্তনের ঘাটতির সমালোচনা করে একটি জাতীয় সরকার গঠনের প্রস্তাবও করেছিলেন।

হামলার কিছুক্ষণ আগেও তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয় ছিলেন। জুমার নামাজের আগে বেলা ১১টা ৫২ মিনিটে হাদি তার ফেইসবুকে লেখেন, “যেহেতু ঢাকা-৮ এ আমার পোস্টার-ফেস্টুন কিছুই নাই, তাই আমার এখন ছেঁড়া-ছিঁড়িরও চাপ নাই। দুদকের সামনে থেইকা জুম্মা মোবারক।” এই লেখার কয়েক ঘণ্টা পরেই তিনি হামলার শিকার হন।

রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর উদ্বেগ

ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী শরীফ ওসমান বিন হাদির ওপর এমন প্রকাশ্যে হামলা দেশের নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। একজন সম্ভাব্য প্রার্থীর ওপর দিনের আলোয় এমন সশস্ত্র হামলা রাজনৈতিক সহাবস্থানের পরিবেশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

চিকিৎসকদের বক্তব্য অনুযায়ী, হাদির অবস্থা এখনও সংকটজনক। তার উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হলেও, পুরো জাতি এখন তার আরোগ্যের জন্য অপেক্ষা করছে। একই সাথে, প্রশাসন কীভাবে এই হামলার পেছনের অপরাধীদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনে, সেদিকেও সকলের নজর থাকবে।

এ ঘটনা প্রমাণ করে যে, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন একটি জরুরি বিষয়। এই হামলার ঘটনা সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সর্বাধিক জনপ্রিয়

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সাম্প্রতিক মন্তব্য

- বিজ্ঞাপন-spot_img
error: Content is protected !!