সম্প্রতি ভয়াবহ বন্যায় বিপর্যস্ত শ্রীলঙ্কায় পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে পাঠানো খাদ্য ও চিকিৎসা সামগ্রী নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র বিতর্ক ও নিন্দার ঝড় উঠেছে। পাকিস্তানের এই ‘মানবিক সাহায্য’ ত্রাণের প্যাকেটে মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ থাকার কারণে এটি এখন ইসলামাবাদ সরকারের জন্য এক বড় কূটনৈতিক বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে।
বিতর্কের সূত্রপাত: মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ প্রকাশ
শ্রীলঙ্কায় পাকিস্তান হাইকমিশনের নিজস্ব এক্স (পূর্বে টুইটার) হ্যান্ডেল থেকে সম্প্রতি ত্রাণ–সামগ্রীর ছবি পোস্ট করা হয়। পোস্টে জানানো হয়, “এই কঠিন সময়ে কলম্বোর পাশে রয়েছে পাকিস্তান।” এই পোস্টটিই বিতর্কের জন্ম দেয়।
- মেয়াদোত্তীর্ণ প্রমাণ: ভাইরাল হওয়া ছবিগুলোতে স্পষ্ট দেখা যায়, খাদ্যসামগ্রীর মোড়কে মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ হিসেবে ‘অক্টোবর, ২০২৪’ উল্লেখ করা আছে।
- কর্তৃপক্ষের শনাক্তকরণ: শ্রীলঙ্কায় ত্রাণ পৌঁছানোর পর সেখানকার কর্তৃপক্ষ চালানের সামগ্রীগুলি পরীক্ষা করে সেগুলিকে সম্পূর্ণ অকার্যকর এবং মেয়াদোত্তীর্ণ বলে চিহ্নিত করে।
- অ-কূটনৈতিক বার্তা: শ্রীলঙ্কার ত্রাণ কর্মকর্তারা গুরুতর এই সমস্যাটি শনাক্ত করার পর কলম্বো থেকে ইসলামাবাদকে প্রথমে অনানুষ্ঠানিক এবং পরবর্তীতে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ত্রুটিপূর্ণ চালান সম্পর্কে অবহিত করেন।
প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের ওপর সমালোচনার ঝড়
এই খবর প্রকাশ্যে আসার সঙ্গে সঙ্গেই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সরকার দেশ-বিদেশের কড়া সমালোচনার মুখে পড়েছে।
- এক্স ব্যবহারকারীদের মন্তব্য:
- একজন ব্যবহারকারী তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে লেখেন, “মেয়াদোত্তীর্ণ ত্রাণ পাঠিয়ে পাকিস্তান শ্রীলঙ্কার দুর্যোগ কবলিত মানুষকে অসম্মান করেছে।”
- আরেকজন প্রশ্ন তোলেন, “এত বড় মানবিক সহায়তা পাঠানোর আগে কেন চালানটি পরীক্ষা করা হলো না? পরীক্ষা না করেই বা এমন ছবি প্রকাশ্যে পোস্ট করা হলো কীভাবে?”
- পুরোনো অভিযোগ: এক্স-এ ভাইরাল হওয়া একাধিক পোস্টে উল্লেখ করা হয়েছে, এই ধরনের ঘটনা পাকিস্তানে নতুন নয়। অতীতেও মানবিক সহায়তা হিসেবে পাকিস্তান পুরোনো বা মেয়াদোত্তীর্ণ সামগ্রী অন্যত্র পাঠানোর অভিযোগ রয়েছে।
- আফগানিস্তান প্রসঙ্গ: ২০২১ সালে তালেবান আফগানিস্তান দখলের পর ভারতের পাঠানো আটা পাকিস্তানের মাধ্যমে দূষিত অবস্থায় আফগানিস্তানে পৌঁছেছিল এই ঘটনাও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
ইসলামাবাদের নীরবতা এবং মানবিক প্রশ্ন
এখন পর্যন্ত পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এই বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া বা ব্যাখ্যা জানানো হয়নি। তবে কূটনৈতিক মহল মনে করছে, আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে এমন গুরুতর ত্রুটি পাকিস্তানের মানবিক ভাবমূর্তি নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে। কীভাবে একটি ত্রাণ-সামগ্রী পরীক্ষা ছাড়াই অন্য একটি দেশে পাঠানো হলো, তা নিয়েও চলছে বিস্তর আলোচনা।
শ্রীলঙ্কায় ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়
এদিকে, সাইক্লোন দিতওয়ার তাণ্ডবে শ্রীলঙ্কার বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
- মৃতের সংখ্যা: ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে এখন পর্যন্ত অন্তত ৪৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
- কলম্বোর পরিস্থিতি: রাজধানী কলম্বোসহ বহু এলাকায় পানি দ্রুত বাড়ছে এবং কয়েকটি অঞ্চলে ভূমিধসের সতর্কতা জারি রয়েছে।
- পানিবন্দি হাজারো মানুষ: ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, হাজারো মানুষ তাদের বাড়ির ছাদে উঠে সাহায্যের অপেক্ষায় আছেন।
- জাতীয় দুর্যোগ: শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট অনুরা কুমারা দিসানায়েকে এই পরিস্থিতিকে দেশের ‘ইতিহাসের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং প্রাকৃতিক দুর্যোগ’ উল্লেখ করে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন এবং দ্রুত আন্তর্জাতিক সহায়তা চেয়েছেন।
পাকিস্তানের মেয়াদোত্তীর্ণ ত্রাণ পাঠানো এমন এক সময়ে ঘটল যখন শ্রীলঙ্কার মানুষ জীবন বাঁচাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জরুরি সহায়তার দিকে তাকিয়ে আছে।








