ঘূর্ণিঝড় মোন্থার প্রভাবে গতকাল রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টি হয়েছে। সাধারণত বৃষ্টি হলে ধুলোবালু ও ধোঁয়ার ঘনত্ব কমে, বাতাস কিছুটা পরিশুদ্ধ হয়। কিন্তু এবারের বৃষ্টি সে পরিবর্তন আনতে পারেনি। বৃহস্পতিবার সকালে আইকিউএয়ারের সূচকে ঢাকার গড় বায়ুমান ছিল ১৬০, যা অস্বাস্থ্যকর হিসেবে বিবেচিত। বিশ্বের ১২৫টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান পঞ্চম। গতকাল এই তালিকায় ঢাকার অবস্থান ছিল চতুর্থ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৃষ্টির পরও বাতাসে দূষণ কমেনি কারণ শহরে ধুলাবালি, যানবাহনের কালো ধোঁয়া ও শিল্পকারখানার নির্গমন অব্যাহত রয়েছে। সাময়িক বৃষ্টিতে উপরের স্তরের ধুলো কিছুটা ধুয়ে গেলেও নিচের স্তরে থাকা দূষণ অটুট থেকে যায়।
বিশ্বের শীর্ষ দূষিত শহরের তালিকায় আবারও ঢাকা
সুইজারল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ারের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বৃহস্পতিবার সকালে বায়ুদূষণে শীর্ষে আছে পাকিস্তানের লাহোর, যার স্কোর ৪৯৫। দ্বিতীয় স্থানে ভারতের দিল্লি, স্কোর ৪৪৭। তৃতীয় স্থানে চীনের বেইজিং (২০৬) এবং চতুর্থ স্থানে পাকিস্তানের করাচি (১৭০)। পঞ্চম স্থানে আছে বাংলাদেশ রাজধানী ঢাকা, যার স্কোর ১৬০।
এটি প্রমাণ করে যে দক্ষিণ এশিয়ার শহরগুলোই বর্তমানে সবচেয়ে বেশি বায়ুদূষণের শিকার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নগর পরিকল্পনা ও পরিবেশব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা, জনসংখ্যার ঘনত্ব ও যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল এই সংকটকে বাড়াচ্ছে।
নগরীর সাত এলাকায় দূষণ সবচেয়ে বেশি
রাজধানীর বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে সাতটি স্থানে বায়ুদূষণের মাত্রা অত্যন্ত বেশি। পুরান ঢাকার বেচারাম দেউড়ি-তে বায়ুমান সূচক ১৭০, যা “খুব অস্বাস্থ্যকর” হিসেবে বিবেচিত। এর বাইরে দক্ষিণ পল্লবী (১৭০), বে’জ এজ ওয়াটার (১৬৩), ইস্টার্ন হাউজিং (১৬৩), গ্রেস ইন্টারন্যাশনাল স্কুল (১৫৭), কল্যাণপুর (১৫৬) ও গোরান (১৫১) এলাকাতেও বাতাসের মান অস্বাস্থ্যকর পর্যায়ে রয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তর ও আইকিউএয়ারের তথ্য অনুযায়ী, এই এলাকাগুলোতে মূলত যানবাহনের ধোঁয়া, নির্মাণকাজের ধুলা, শিল্পকারখানার নির্গমন এবং আবর্জনা পোড়ানো বায়ুর মান নষ্ট করছে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ: নিজেকে সুরক্ষায় রাখুন
আইকিউএয়ার এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান বায়ুমান বিবেচনায় নাগরিকদের জন্য কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। ঘরের বাইরে বের হলে অবশ্যই মাস্ক পরতে হবে, জানালা বন্ধ রাখতে হবে এবং বাইরে ব্যায়াম বা হাঁটা যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলা উচিত। যেসব এলাকায় AQI স্কোর ১৫০–২০০ এর মধ্যে, সেসব এলাকায় বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্তদের বাইরে না যাওয়াই ভালো।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘরে থাকলেও পরিশোধিত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা রাখতে হবে। যদি সম্ভব হয়, এয়ার পিউরিফায়ার ব্যবহার করা যেতে পারে।
ঢাকার বায়ুদূষণ: দীর্ঘমেয়াদি হুমকি
বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু কমিয়ে দিচ্ছে বায়ুদূষণ। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউটের (ইপিআইসি) এয়ার কোয়ালিটি লাইফ ইনডেক্স (AQLI) ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দূষণের কারণে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু সাড়ে পাঁচ বছর পর্যন্ত কমছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত দেশ। বায়ুদূষণের প্রভাবে ১৯৮০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৩ কোটি ৫০ লাখ মানুষ অকালমৃত্যুবরণ করেছে বলে জানিয়েছে সিঙ্গাপুরের নানিয়াং প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
অর্থনীতিতেও ক্ষতির প্রভাব
বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত “বাংলাদেশ কান্ট্রি এনভায়রনমেন্ট অ্যানালিসিস (CEA)” প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালে বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের পরিবেশদূষণের কারণে দুই লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৫৫ শতাংশের মৃত্যু বায়ুদূষণের কারণে।
প্রতিবেদনটি আরও জানায়, ওই বছর দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১৭ দশমিক ৬ শতাংশের সমপরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে দূষণের কারণে। অর্থাৎ, বায়ুদূষণ শুধু মানুষের স্বাস্থ্য নয়, দেশের অর্থনীতিকেও মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে।
বায়ুদূষণ রোধে করণীয়
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দূষণ রোধে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। শিল্প এলাকা ও নির্মাণকাজে ধুলা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। যানবাহনের কালো ধোঁয়া নির্গমন রোধে পুরোনো গাড়ি বাতিল এবং জ্বালানিতে মান উন্নয়ন প্রয়োজন। পাশাপাশি বৃক্ষরোপণ ও সবুজায়ন বাড়াতে হবে।
সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ নিলে রাজধানীর বায়ুর মান কিছুটা হলেও উন্নত করা সম্ভব।
নাগরিকদের সচেতনতা সবচেয়ে বড় শক্তি
দূষণ রোধে শুধু সরকারি উদ্যোগ নয়, নাগরিক সচেতনতাও সমানভাবে জরুরি। প্রতিটি পরিবার যদি নিজস্ব পরিবেশ সচেতনতা বজায় রাখে, যেমন খোলা জায়গায় আবর্জনা না ফেলা, গাছ লাগানো, গাড়ি কম ব্যবহার করা, তবে ধীরে ধীরে শহরের পরিবেশে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
বৃষ্টির পরও ঢাকার বায়ুদূষণ কমেনি এটি আমাদের জন্য সতর্কবার্তা। অল্প সময়ের বৃষ্টি বা প্রাকৃতিক পরিবর্তনে নয়, দূষণ কমাতে লাগবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও সচেতনতা। এখনই ব্যবস্থা না নিলে আগামী প্রজন্মকে আরও ভয়াবহ পরিবেশে বসবাস করতে হবে।








