দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি আবারও অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। পাকিস্তানের বিমান হামলার পর আফগানিস্তান এবার দিল কঠোর প্রতিক্রিয়া। কাবুলের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, আফগানিস্তানের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করা হলে তার ‘কড়া জবাব’ দেওয়া হবে। এরই মধ্যে দুই দেশের সীমান্তে সামরিক উত্তেজনা বেড়েছে।
পাকিস্তানের বিমান হামলার অভিযোগ
গত বৃহস্পতিবার (৯ অক্টোবর) ভোরে কাবুল ও পাকতিকা প্রদেশে পাকিস্তানের যুদ্ধবিমান হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে আফগানিস্তান। আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, হামলায় বেসামরিক হতাহত হয়েছে। তবে পাকিস্তান এ হামলার দায় আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেনি। তারা দাবি করেছে, টার্গেট ছিল সীমান্তে সক্রিয় জঙ্গি গোষ্ঠী তেহরিকে তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)।
“এটি আগ্রাসন”- আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়
আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এনায়াতুল্লাহ খাওরাজমি বলেন:
“এটি আফগানিস্তানের ইতিহাসে নজিরবিহীন ও ঘৃণ্য আগ্রাসন। পাকিস্তান আমাদের আকাশসীমা লঙ্ঘন করেছে। এর ফল ভোগ করতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, আফগানিস্তান কোনো যুদ্ধ চায় না। তবে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় যে কোনো পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত আফগান বাহিনী।
ভারতের মাটিতে দাঁড়িয়ে কঠোর বার্তা দিলেন মুত্তাকি
ভারত সফররত আফগানিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি আরও কড়া ভাষায় পাকিস্তানকে সতর্ক করেন। তিনি বলেন:
“আমরা পাকিস্তানকে সতর্ক করছি – আফগানদের ধৈর্যের পরীক্ষা নেবেন না। ইতিহাস সাক্ষী – ব্রিটিশ, রাশিয়া, আমেরিকা ও ন্যাটো আফগানিস্তানে জোর করে কিছুই অর্জন করতে পারেনি।”
তিনি অভিযোগ করেন, পাকিস্তান নিজস্ব অভ্যন্তরীণ সমস্যার দায় আফগানিস্তানের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে। এ ধরনের অভিযোগ শুধু দায়িত্ব এড়ানো ছাড়া আর কিছু নয়।
সীমান্তে সামরিক উত্তেজনা বাড়ছে
ঘটনার পর আফগান তালেবান বাহিনী খোস্ত, পাকতিকা ও নংগরহার প্রদেশে সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করেছে। ভারী অস্ত্র ও অতিরিক্ত সৈন্য মোতায়েন করা হয়েছে। একইভাবে পাকিস্তানও উত্তর ওয়াজিরিস্তান ও খাইবার পাখতুনখাওয়া সীমান্তে টহল জোরদার করেছে। উভয় দেশ সীমান্ত ঘাঁটি সক্রিয় করেছে। পরিস্থিতি যে কোনো সময় বড় ধরনের সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়ছে
জাতিসংঘ এখনো এ ঘটনায় আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি। তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে সীমান্তে সংঘর্ষ শুরু হলে পুরো অঞ্চল নিরাপত্তা সঙ্কটে পড়বে। দক্ষিণ এশিয়া ইতিমধ্যেই ভারত–পাকিস্তান উত্তেজনা, আফগান শরণার্থী সঙ্কট ও সন্ত্রাসবাদের হুমকিতে জর্জরিত। নতুন এই উত্তেজনা পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলতে পারে।
উত্তেজনার পেছনে টিটিপি ইস্যু
পাকিস্তানের অভিযোগ—টিটিপি জঙ্গিরা আফগানিস্তানের ভেতর থেকে পাকিস্তানের ওপর হামলা চালাচ্ছে। তবে আফগানিস্তান তা অস্বীকার করেছে। আফগান সরকারের মতে, পাকিস্তান টিটিপি সমস্যার সমাধান সামরিকভাবে করতে চাইছে। কিন্তু এটি বুমেরাং হতে পারে।
মুত্তাকি বলেন:
“বলপ্রয়োগ কখনোই সমাধান নয়। পাকিস্তান যদি মনে করে আকাশপথে হামলা চালিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা করবে, তবে তা তাদের ভুল ধারণা।”
সাধারণ মানুষের মাঝে আতঙ্ক
এই সংঘাতের কারণে সীমান্তবর্তী এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ইতোমধ্যে বহু মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে মানবিক সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অঞ্চল কি নতুন যুদ্ধের দিকে?
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে দ্বন্দ্ব নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক বিমান হামলা পরিস্থিতিকে সরাসরি যুদ্ধের মুখে ঠেলে দিতে পারে। তাই এখন সবাই অপেক্ষা করছে—কূটনীতি কি উত্তেজনা কমাতে পারবে, নাকি দক্ষিণ এশিয়ার আকাশে আবারও যুদ্ধের মেঘ ঘনীভূত হবে?








