বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এক অবিস্মরণীয় অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। দীর্ঘ সময় ধরে বড় দলের ছায়ায় জোটগত রাজনীতি করলেও এবারের নির্বাচনে নিজেদের একক শক্তির এক বিশাল মহড়া দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে এককভাবে ৬৮টি আসনে জয়লাভ করে দলটি সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে।
যদিও ২০৯টি আসন নিয়ে বিএনপি সরকার গঠনের পথে রয়েছে, তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টি এখন জামায়াতের এই অভাবনীয় উত্থানের দিকে। জোটগতভাবে তাদের আসন সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৭-এ। বিশ্লেষকরা একে বাংলাদেশের দ্বিমেরু কেন্দ্রিক রাজনীতিতে এক ‘ঐতিহাসিক মোড়’ হিসেবে দেখছেন।
ভোটের পরিসংখ্যানে জামায়াতের বড় লাফ
অতীতের পরিসংখ্যানের সাথে তুলনা করলে এবারের সাফল্যের গভীরতা স্পষ্ট হয়। ১৯৯৬ সালে এককভাবে নির্বাচন করে দলটি পেয়েছিল মাত্র ৩টি আসন। নিচে দলটির বিগত কয়েক বছরের আসন প্রাপ্তির একটি তুলনামূলক চিত্র দেওয়া হলো:
| নির্বাচনের বছর | প্রাপ্ত আসন সংখ্যা | মন্তব্য |
| ১৯৯১ | ১৮টি | জোট ও একক মিশ্রিত |
| ১৯৯৬ | ৩টি | এককভাবে লড়াই |
| ২০০১ | ১৭টি | চারদলীয় জোট |
| ২০০৮ | ২টি | চারদলীয় জোট |
| ২০২৬ | ৬৮টি | এককভাবে (ঐতিহাসিক সাফল্য) |
ঢাকার রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ
জামায়াতে ইসলামী অতীতে ঢাকা মহানগরে কখনোই বিশেষ সুবিধা করতে পারেনি। কিন্তু এবারের নির্বাচনে তারা ঢাকার ১৫টি আসনের মধ্যে ৬টিতে জয় পেয়ে নতুন চমক সৃষ্টি করেছে। জয়ী আসনগুলো হলো: ঢাকা-৪, ৫, ১২, ১৪, ১৫ ও ১৬।
এছাড়া তাদের জোটের শরিক এনসিপি নেতা নাহিদ ইসলাম ঢাকা-১১ আসনে জয়ী হয়েছেন। এমনকি ঢাকা-৭ ও ঢাকা-১০ এর মতো গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলোতেও তারা সামান্য ভোটের ব্যবধানে হেরেছে, যা প্রমাণ করে রাজধানীতে দলটির জনসমর্থন পূর্বের তুলনায় বহুগুণ বেড়েছে।
উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে জামায়াতের দাপট
এবারের নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, জামায়াতের সাফল্যের মূল ভিত্তি ছিল দেশের উত্তরাঞ্চল এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল। কয়েকটি বিভাগে তারা রীতিমতো আধিপত্য বিস্তার করেছে:
- খুলনা বিভাগ: ৩৬টি আসনের মধ্যে ২৫টিতেই জামায়াত জয়ী।
- রংপুর বিভাগ: ৩৩টির মধ্যে ১৬টি আসনে জয়।
- রাজশাহী বিভাগ: ৩৯টির মধ্যে ১১টি আসনে জয়।
- ক্লিন সুইপ: সাতক্ষীরা, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, নীলফামারী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সবকটি আসনেই জামায়াত প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন।
তরুণ ও নারী ভোটারদের পছন্দের পরিবর্তন কেন
এবারের নির্বাচনে তরুণ ও নারী ভোটারদের একটি বড় অংশ জামায়াতের দিকে ঝুঁকেছে। এর পেছনে কাজ করেছে কয়েকটি বিশেষ কারণ:
১. ছাত্র সংসদের প্রভাব: বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাফল্য তরুণদের মধ্যে দলটির গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে।
২. নতুন রাজনৈতিক ঐক্য: গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃত্বদানকারী তরুণদের দল এনসিপি-র সাথে নির্বাচনী ঐক্য জামায়াতকে একটি ‘পরিবর্তনের শক্তি’ হিসেবে ভোটারদের কাছে তুলে ধরতে সাহায্য করেছে।
৩. আদর্শিক পরিবর্তন: জামায়াত রক্ষণশীল ডানপন্থী পরিচয় থেকে বের হয়ে মধ্য-ডানপন্থী দল হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার চেষ্টা করেছে।
“জামায়াত নিজেদের ‘ক্ষমতামুখী নয়, পরিবর্তনের পক্ষে’ শক্তি হিসেবে তুলে ধরেছে, যা বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের ভোটারদের আকৃষ্ট করেছে।” অধ্যাপক এ কে এম ওয়ারেসুল করিম, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি।
ভিন্ন মত: মির্জা ফখরুলের ব্যাখ্যা
তবে জামায়াতের এই উত্থানকে ভিন্নভাবে দেখছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তার মতে, গত ১৫ বছরের ফ্যাসিস্ট শাসন এবং গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধের কারণেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, “যখনই গণতন্ত্র চাপা থাকে, তখনই উগ্রবাদী শক্তিগুলো মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। আওয়ামী লীগের দমন-পীড়নের কারণেই জামায়াতের এইটুকু উত্থান হয়েছে।”
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর এই বিশাল সাফল্য বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপি-আওয়ামী লীগ কেন্দ্রিক চিরাচরিত বলয় ভেঙে তৃতীয় এক শক্তিশালী মেরুর জানান দিচ্ছে। ৬৮ আসনে জয়ী হয়ে জামায়াত এখন সংসদের প্রধান বিরোধী দল হিসেবে বসার প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা আগামী দিনের রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করবে।








