বিশ্বজুড়ে মুসলিম উম্মাহর জন্য রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের সওগাত নিয়ে প্রতি বছর ফিরে আসে পবিত্র মাহে রমজান। হিজরি বর্ষপঞ্জির নবম এই মাসটি শুধু সংযমের মাস নয়, বরং আত্মশুদ্ধি ও তাকওয়া অর্জনের এক মহিমান্বিত সুযোগ। ২০২৬ সালের রমজান আমাদের দোরগোড়ায়। মুমিন মুসলমানদের জন্য রোজার ফজিলত ও আমল সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান রাখা অত্যন্ত জরুরি।
রমজান মাস আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে বান্দার জন্য এক বিশেষ উপহার। এই মাসে একটি নফল ইবাদত ফরজের সমান এবং একটি ফরজ ইবাদত ৭০টি ফরজের সমান সওয়াব বয়ে আনে। আজকের এই সুদীর্ঘ আর্টিকেলে আমরা রমজানের গুরুত্ব, রোজার আধ্যাত্মিক ও বৈজ্ঞানিক উপকারিতা, এবং এই পবিত্র মাসের করণীয় ও বর্জনীয় কাজগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। আপনি যদি রমজানের পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি নিতে চান, তবে এই গাইডলাইনটি আপনার জন্য।
পবিত্র মাহে রমজানের গুরুত্ব ও তাৎপর্য
ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে রোজা (সাওম) তৃতীয়। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে রমজান মাসকে বিশেষ মর্যাদায় ভূষিত করেছেন। অন্যান্য মাসের তুলনায় এই মাসের গুরুত্ব অপরিসীম।
কোরআন নাজিলের মাস: কেন রমজানকে কোরআনের মাস বলা হয়
রমজান মাসের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, এই মাসেই মানবজাতির হেদায়েতের জন্য পবিত্র কোরআনুল কারিম নাজিল হয়েছে। আল্লাহ তাআলা সুরা বাকারার ১৮৫ নম্বর আয়াতে ইরশাদ করেন:
“রমজান মাসই হলো সেই মাস, যাতে নাজিল করা হয়েছে কোরআন, যা মানুষের জন্য হেদায়েত এবং সত্যপথ যাত্রীদের জন্য সুস্পষ্ট পথনির্দেশ আর ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য বিধানকারী।”
এ কারণেই রমজানকে ‘কোরআনের মাস’ বা ‘শাহরুল কোরআন’ বলা হয়। এই মাসে জিবরাঈল (আ.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে কোরআন দাওর করতেন (একে অপরকে শোনাতেন)। তাই এই মাসে বেশি বেশি কোরআন তিলাওয়াত ও এর অর্থ অনুধাবন করা মুমিনের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস: তিন দশকের বিভাজন ও গুরুত্ব
রাসুলুল্লাহ (সা.) মাহে রমজানকে তিনটি দশকে ভাগ করেছেন, যা মুমিনদের জন্য এক বিশেষ বার্তা বহন করে।
১. প্রথম ১০ দিন (রহমত): রমজানের প্রথম অংশ আল্লাহ তাআলার অসীম করুণা ও রহমতে পরিপূর্ণ থাকে। এ সময় আল্লাহ বান্দার ওপর বিশেষ রহমত বর্ষণ করেন।
২. দ্বিতীয় ১০ দিন (মাগফিরাত): মাঝের ১০ দিন ক্ষমার। এই সময়ে বান্দা তার কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়ে তওবা করলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন।
৩. তৃতীয় ১০ দিন (নাজাত): শেষ ১০ দিন জাহান্নাম থেকে মুক্তির। এ সময়ে ইবাদতের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়ে মুমিনরা জাহান্নামের আগুন থেকে নিজেদের মুক্তির পরোয়ানা সংগ্রহ করেন।
জান্নাতের দরজা উন্মুক্ত ও জাহান্নাম বন্ধ
রমজানের আগমনে আসমানি জগতে এক বিশাল পরিবর্তন আসে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“যখন রমজান মাস আসে, তখন জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানদের শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়।” (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)
এর অর্থ হলো, এই মাসে নেক কাজ করা সহজ হয় এবং পাপ কাজ থেকে বিরত থাকার পরিবেশ তৈরি হয়। শয়তানের প্ররোচনা কমে যাওয়ায় মানুষ সহজেই ইবাদতে মশগুল হতে পারে। এটি রোজার ফজিলত ও আমল করার জন্য এক সুবর্ণ সুযোগ।

রোজার ফজিলত
রোজা শুধু উপবাস থাকার নাম নয়, এটি আল্লাহ ও বান্দার মধ্যে এক গোপন প্রেমের সম্পর্ক। রোজার ফজিলত বর্ণনা করে শেষ করা সম্ভব নয়, তবুও প্রধান কিছু ফজিলত নিচে আলোচনা করা হলো।
তাকওয়া বা খোদাভীতি অর্জন: রোজার মূল উদ্দেশ্য
আল্লাহ তাআলা রোজাকে ফরজ করেছেন একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে, আর তা হলো ‘তাকওয়া’ অর্জন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন:
“হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা তাকওয়া (পরহেজগারি) অর্জন করতে পারো।” (সুরা বাকারা, আয়াত ১৮৩)
তাকওয়া মানে আল্লাহর ভয়ে সব ধরনের পাপ কাজ থেকে বিরত থাকা এবং তাঁর নির্দেশ মেনে চলা। রোজা মানুষের কুপ্রবৃত্তিকে দমন করে এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ শেখায়।
গুনাহ মাফ ও আল্লাহর নৈকট্য লাভ
রমজান হলো গুনাহ মাফের শ্রেষ্ঠ মৌসুম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে ও সওয়াবের আশায় রমজানের রোজা রাখবে, তার অতীতের সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।” (সহিহ বুখারি)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, রোজা শুধু শারীরিক ইবাদত নয়, এটি আত্মিক প্রশান্তি ও পাপ মোচনের মাধ্যম। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর অত্যন্ত নিকটবর্তী হয়।
রোজাদারের বিশেষ মর্যাদা: ‘রাইয়ান’ নামক জান্নাতের দরজা
কেয়ামতের দিন রোজাদারদের জন্য আল্লাহ তাআলা বিশেষ সম্মানের ব্যবস্থা রেখেছেন। জান্নাতে প্রবেশের জন্য আটটি দরজা রয়েছে, যার মধ্যে একটির নাম ‘রাইয়ান’। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“জান্নাতে রাইয়ান নামক একটি দরজা আছে। কেয়ামতের দিন শুধু রোজাদাররাই ওই দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে। অন্য কেউ সেই দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না।”
রোজাদারদের তৃষ্ণা ও ক্ষুধার কষ্টের প্রতিদান হিসেবে আল্লাহ এই বিশেষ দরজাটি প্রস্তুত রেখেছেন।
রোজার প্রতিদান আল্লাহ নিজে দেবেন
অন্যান্য সব ইবাদতের সওয়াব ফেরেশতারা লিখে রাখেন এবং তা ১০ গুণ থেকে ৭০০ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। কিন্তু রোজার বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তাআলা বলেন:
“রোজা আমার জন্য এবং আমি নিজেই এর প্রতিদান দেব।”
এর ব্যাখ্যায় মুহাদ্দিসরা বলেন, রোজার সওয়াবের কোনো সীমা নেই। আল্লাহ তাআলা রোজাদারকে বেহিসাব সওয়াব দান করবেন এবং নিজের দিদার (সাক্ষাৎ) দিয়ে ধন্য করবেন। এটি রোজার ফজিলত ও আমল-এর সর্বোচ্চ প্রাপ্তি।
রোজার বৈজ্ঞানিক ও স্বাস্থ্যগত উপকারিতা
আধুনিক বিজ্ঞান রোজার উপকারিতা নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করেছে। ধর্মীয় গুরুত্বের পাশাপাশি রোজার বৈজ্ঞানিক উপকারিতা শরীর ও মনের জন্য অত্যন্ত কার্যকর।
অটোফ্যাজি (Autophagy) ও শরীর ডিটক্স
২০১৬ সালে জাপানি বিজ্ঞানী ইয়োশিনোরি ওসুমি ‘অটোফ্যাজি’ বা কোষের আত্মভক্ষণ প্রক্রিয়ার ওপর গবেষণা করে নোবেল পুরস্কার পান। তার গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ যখন দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকে (যেমন রোজা রাখা), তখন শরীরের কোষগুলো তাদের ভেতরের বর্জ্য পদার্থ, মৃত কোষ এবং ক্ষতিকারক প্রোটিনগুলোকে খেয়ে ফেলে বা পরিষ্কার করে। একেই অটোফ্যাজি বলা হয়।
রমজানের রোজা এই অটোফ্যাজি প্রক্রিয়াকে সক্রিয় করে, যা শরীরকে প্রাকৃতিকভাবে ডিটক্স (বিষমুক্ত) করতে সাহায্য করে এবং ক্যানসারসহ বিভিন্ন জটিল রোগ প্রতিরোধ করে।
ওজন নিয়ন্ত্রণ ও পরিপাকতন্ত্রের বিশ্রাম
সারা বছর আমাদের পরিপাকতন্ত্র অবিরাম কাজ করে। রমজানের এক মাস রোজা রাখার ফলে পরিপাকতন্ত্র বিশ্রাম পায়, যা এর কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করে। এছাড়া দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার ফলে শরীর জমানো চর্বি (Fat) থেকে শক্তি গ্রহণ করে, যা ওজন কমাতে সাহায্য করে। যারা ওবেসিটি বা স্থূলতায় ভুগছেন, তাদের জন্য রোজা একটি চমৎকার প্রাকৃতিক চিকিৎসা।
মানসিক প্রশান্তি ও ধৈর্য বৃদ্ধি
রোজা মস্তিষ্কে ‘নিউরোট্রফিক ফ্যাক্টর’ নিঃসরণ বাড়ায়, যা মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা উন্নত করে। এটি স্ট্রেস হরমোন কর্টিসলের মাত্রা কমায়, ফলে মানসিক অস্থিরতা ও বিষণ্নতা দূর হয়। ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করার মাধ্যমে মানুষের ধৈর্যশক্তি বৃদ্ধি পায়, যা তাকে জীবনের কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলায় সাহায্য করে।

রমজান মাসের গুরুত্বপূর্ণ আমলসমূহ
রমজানের প্রতিটি মুহূর্ত অত্যন্ত মূল্যবান। রোজার ফজিলত ও আমল পরিপূর্ণভাবে পেতে হলে আমাদের একটি রুটিন মেনে চলতে হবে। নিচে রমজান মাসের করণীয় প্রধান আমলগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
১. বিশুদ্ধ নিয়ত ও পাঁচ ওয়াক্ত সালাত
যেকোনো আমলের ভিত্তি হলো নিয়ত। রোজার শুরুতে বিশুদ্ধ মনে নিয়ত করতে হবে যে, আমি একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই রোজা রাখছি। পাশাপাশি, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামায়াতের সঙ্গে আদায় করা অত্যাবশ্যক। কারণ, নামাজ ছাড়া রোজা বা অন্য কোনো ইবাদত পূর্ণতা পায় না। রমজানে নামাজের গুরুত্ব অন্যান্য সময়ের চেয়ে অনেক বেশি।
২. সাহরি ও ইফতারের সুন্নাত
সাহরি ও ইফতার রোজার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
- সাহরি খাওয়ার বরকত: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তোমরা সাহরি খাও, কারণ সাহরিতে বরকত রয়েছে।” পেট ভরা থাকলেও সামান্য পানি বা খেজুর দিয়ে সাহরি করা সুন্নত। শেষ সময়ে সাহরি খাওয়া উত্তম।
- জলদি ইফতার করা: সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে ইফতার করা সুন্নত। ইফতারে খেজুর বা পানি দিয়ে শুরু করা ভালো। ইফতারের আগ মুহূর্তটি দোয়া কবুলের বিশেষ সময়, তাই এ সময় বেশি বেশি দোয়া করা উচিত।
৩. তারাবিহ ও তাহাজ্জুদ নামাজ
রমজানের রাতের বিশেষ ইবাদত হলো তারাবিহ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে ও সওয়াবের আশায় রমজানের রাতে তারাবিহ নামাজ আদায় করবে, তার অতীতের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।” ২০ রাকাত তারাবিহ নামাজ জামায়াতের সঙ্গে আদায় করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা। এছাড়া শেষ রাতে সাহরি খেতে ওঠার সময় তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত। তাহাজ্জুদের সময় আল্লাহ বান্দার সবচেয়ে কাছে নেমে আসেন এবং দোয়া কবুল করেন।
৪. বেশি বেশি কোরআন তিলাওয়াত
রমজান কোরআন নাজিলের মাস, তাই এই মাসে কোরআনের হক আদায় করা জরুরি।
- প্রতিদিন অন্তত এক পারা করে তিলাওয়াত করলে পুরো মাসে এক খতম দেওয়া সম্ভব।
- শুধু আরবি না পড়ে অর্থ ও তাফসির পড়ার চেষ্টা করুন।
- যাদের তিলাওয়াত শুদ্ধ নয়, তারা এই মাসে শুদ্ধ করে কোরআন শেখার উদ্যোগ নিতে পারেন।
৫. দান-সদকা ও যাকাত প্রদান
রমজান মাসে যেকোনো নেক কাজের সওয়াব ৭০ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। তাই দান-সদকা করার জন্য এটিই সেরা সময়। রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজান মাসে প্রবাহিত বাতাসের চেয়েও বেশি দানশীল হতেন। যাদের ওপর যাকাত ফরজ, তারা সাধারণত রমজান মাসেই যাকাত আদায় করে থাকেন, যাতে বর্ধিত সওয়াব লাভ করা যায়। গরিব-দুঃখী ও অসহায় মানুষদের ইফতার করানো বা সাহররি ব্যবস্থা করে দেওয়া বিশাল সওয়াবের কাজ।
৬. ইতিকাফ করা
রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা আলাল কিফায়া। ২০ রমজান সূর্যাস্তের আগে মসজিদে প্রবেশ করে ঈদের চাঁদ দেখা পর্যন্ত মসজিদে অবস্থান করাকে ইতিকাফ বলে। ইতিকাফকারী দুনিয়াবী সব ঝামেলা থেকে মুক্ত হয়ে একান্তভাবে আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকেন। বিশেষ করে শবে কদর পাওয়ার জন্য ইতিকাফের গুরুত্ব অপরিসীম।
৭. লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান
রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোর যেকোনো একটি রাত হলো লাইলাতুল কদর বা শবে কদর। আল্লাহ তাআলা বলেন, “লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়ে উত্তম।” (সুরা কদর)। অর্থাৎ, এই এক রাতের ইবাদত ৮৩ বছর ৪ মাস ইবাদতের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯তম রাতে বেশি বেশি ইবাদত, নফল নামাজ, জিকির ও দোয়ার মাধ্যমে এই রাত অনুসন্ধান করা শবে কদরের আমল-এর প্রধান অংশ।
৮. তওবা ও ইস্তিগফার
মানুষ মাত্রই ভুল করে। রমজান হলো সেই ভুলের মার্জনা চাওয়ার শ্রেষ্ঠ সময়। আল্লাহ এই মাসে ক্ষমার হাত প্রসারিত করে রাখেন। তাই প্রতিদিন বেশি বেশি ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ পাঠ করা এবং চোখের পানি ফেলে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত। দোয়া ইউনুস ও সাইয়্যেদুল ইস্তিগফার পাঠ করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ।
রমজানে বর্জনীয় কাজসমূহ (যা করা যাবে না)
শুধু না খেয়ে থাকার নাম রোজা নয়। হাত, পা, চোখ, কান ও জিহ্বারও রোজা রয়েছে। রোজার ফজিলত অক্ষুণ্ণ রাখতে হলে কিছু কাজ থেকে কঠোরভাবে বিরত থাকতে হবে।
মিথ্যা কথা, গীবত ও চোগলখুরি পরিহার
রাসুলুল্লাহ (সা.) কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন:
“যে ব্যক্তি রোজা রেখে মিথ্যা কথা ও খারাপ কাজ পরিত্যাগ করল না, তার পানাহার ত্যাগ করায় আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।” (বুখারি) তাই মিথ্যা বলা, গীবত (পরনিন্দা) করা এবং অন্যের নামে চোগলখুরি করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হবে। এগুলো রোজার সওয়াব নষ্ট করে দেয়।
অপচয় ও অতিরিক্ত ভোজন (Excessive Eating) থেকে বিরত থাকা
রমজানে আমরা অনেক সময় ইফতার ও সাহরিতে অতিরিক্ত খাবার আয়োজন করি, যা অপচয়ের পর্যায়ে পড়ে। ইসলামে অপচয়কারীকে শয়তানের ভাই বলা হয়েছে। এছাড়া অতিরিক্ত ভোজন করলে শরীর অলস হয়ে পড়ে এবং তারাবিহ বা ইবাদতে মন বসে না। তাই পরিমিত আহার গ্রহণ করা উচিত।
ঝগড়া-বিবাদ ও অশ্লীলতা বর্জন
রোজা ঢালস্বরূপ। কেউ যদি রোজাদারের সঙ্গে ঝগড়া করতে আসে, তবে তাকে বলা উচিত, “আমি রোজাদার।” অশ্লীল কথাবার্তা, গান-বাজনা, সিনেমা-নাটক দেখা এবং কুদৃষ্টি থেকে নিজেকে হেফাজত করতে হবে। সোশ্যাল মিডিয়ায় অযথা সময় নষ্ট না করে সেই সময়টুকু জিকির ও তিলাওয়াতে ব্যয় করা উচিত।
রমজান ও রোজার প্রস্তুতি কীভাবে নেবেন?
রমজান আসার আগেই এর জন্য প্রস্তুতি নেওয়া সুন্নাত। সাহাবায়ে কেরাম রমজান আসার ছয় মাস আগে থেকে দোয়া করতেন এবং প্রস্তুতি নিতেন। ২০২৬ সালের রমজানের জন্য আপনি কীভাবে প্রস্তুতি নেবেন?
মানসিক ও শারীরিক প্রস্তুতি
- তওবা করা: রমজান শুরুর আগেই গুনাহ থেকে তওবা করে মনকে পবিত্র করুন।
- জ্ঞান অর্জন: রোজার মাসায়েল, নিয়ম-কানুন এবং রোজার ফজিলত ও আমল সম্পর্কে বই পড়ুন বা নির্ভরযোগ্য আলেমদের আলোচনা শুনুন।
- স্বাস্থ্য পরীক্ষা: যাদের দীর্ঘমেয়াদী রোগ আছে, তারা ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে ওষুধের সময়সূচি ঠিক করে নিন।
কাজের রুটিন পরিবর্তন ও ইবাদতের সময় বের করা
- রমজানে অফিসের কাজ বা ব্যবসার পাশাপাশি ইবাদতের জন্য নির্দিষ্ট সময় বের করে রুটিন তৈরি করুন।
- কোরআন খতম দেওয়ার পরিকল্পনা করুন।
- মোবাইল ও ইন্টারনেটের আসক্তি কমিয়ে আনুন।
- বাজার-সদাই ও ঈদের কেনাকাটা রমজানের আগেই সেরে ফেলার চেষ্টা করুন, যাতে রমজানের মূল্যবান সময় নষ্ট না হয়।
পবিত্র মাহে রমজান আমাদের জন্য আত্মশুদ্ধি ও পরকালীন মুক্তির এক বিশাল সুযোগ। রোজার ফজিলত ও আমল সম্পর্কে জেনে তা জীবনে বাস্তবায়ন করা প্রতিটি মুমিনের দায়িত্ব। আসুন, ২০২৬ সালের রমজানকে আমরা আমাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ রমজান হিসেবে পালন করার প্রতিজ্ঞা করি। শুধু উপবাস নয়, বরং তাকওয়া অর্জনের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করাই হোক আমাদের মূল লক্ষ্য।
রমজানের শিক্ষা সংযম, সহানুভূতি ও দানশীলতা যেন আমরা সারা বছর ধরে রাখতে পারি। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের সবাইকে সুস্থতার সঙ্গে সম্পূর্ণ রমজানের রোজা রাখার এবং আমলগুলো কবুল করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

রোজার ফজিলত ও আমল সম্পর্কিত প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ)
প্রশ্ন: রোজা কাকে বলে?
উত্তর: সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পানাহার ও স্ত্রী-সহবাস থেকে বিরত থাকাকে শরিয়তের পরিভাষায় রোজা বা সাওম বলে।
প্রশ্ন: রোজা কত হিজরিতে ফরজ হয়?
উত্তর: দ্বিতীয় হিজরি সনের শাবান মাসে উম্মতে মুহাম্মদির ওপর রমজানের রোজা ফরজ করা হয়।
প্রশ্ন: রোজা রেখে ইনজেকশন বা ইনসুলিন নেওয়া যাবে কি?
উত্তর: হ্যাঁ, রোজা রেখে মাংসে বা শিরায় ইনজেকশন এবং ডায়াবেটিসের ইনসুলিন নেওয়া যাবে। এতে রোজা ভাঙবে না। তবে গ্লুকোজ বা শক্তিবর্ধক স্যালাইন নিলে রোজা ভেঙে যাবে।
প্রশ্ন: ভুল করে কিছু খেয়ে ফেললে কি রোজা ভেঙে যায়?
উত্তর: না, রোজা অবস্থায় ভুলবশত (মনে না থাকার কারণে) কিছু খেয়ে ফেললে বা পান করলে রোজা ভাঙ্গে না। মনে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে খাওয়া বন্ধ করতে হবে এবং রোজা পূর্ণ করতে হবে।
প্রশ্ন: অসুস্থ বা সফররত অবস্থায় রোজার বিধান কী?
উত্তর: কেউ যদি খুব বেশি অসুস্থ থাকে বা শরিয়ত সম্মত সফরে (মুসাফির) থাকে, তবে সে রোজা না রেখে পরে কাজা আদায় করতে পারবে। তবে কষ্ট সহ্য করে রোজা রাখলে তা উত্তম।
প্রশ্ন: তারাবিহ নামাজ কি রোজার অংশ? না পড়লে কি রোজা হবে?
উত্তর: তারাবিহ নামাজ রোজার অংশ নয়, এটি সুন্নতে মুয়াক্কাদা। কোনো কারণে তারাবিহ না পড়তে পারলে রোজা হয়ে যাবে, তবে রোজাদার তারাবিহের বিশাল সওয়াব থেকে বঞ্চিত হবেন।
প্রশ্ন: রমজানে ফিতরার পরিমাণ কত?
উত্তর: ফিতরার পরিমাণ প্রতি বছর ইসলামিক ফাউন্ডেশন নির্ধারণ করে দেয়। সাধারণত ১ কেজি ৬৫০ গ্রাম গম বা আটা অথবা এর বাজারমূল্য হলো ফিতরার সর্বনিম্ন পরিমাণ। কিসমিস, খেজুর বা পনির দিয়েও ফিতরা আদায় করা যায়, যা উত্তম।
প্রশ্ন: গর্ভবতী নারীদের রোজা রাখার বিধান কী?
উত্তর: গর্ভবতী বা দুগ্ধদানকারী নারী যদি নিজের বা সন্তানের ক্ষতির আশঙ্কা করেন, তবে তিনি রোজা ভাঙতে পারবেন এবং পরে সুবিধাজনক সময়ে কাজা আদায় করবেন।
প্রশ্ন: রোজা রেখে ব্রাশ বা মেসওয়াক করা যাবে কি?
উত্তর: মেসওয়াক করা সুন্নত এবং এতে কোনো সমস্যা নেই। তবে টুথপেস্ট দিয়ে ব্রাশ করলে যদি পেস্ট গলার নিচে চলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, তবে তা মাকরুহ। সাহরির শেষ সময়ের আগেই ব্রাশ করে নেওয়া উত্তম।
প্রশ্ন: রোজা অবস্থায় সুগন্ধি বা আতর ব্যবহার করা যাবে?
উত্তর: হ্যাঁ, রোজা অবস্থায় সুগন্ধি, আতর বা সুরমা ব্যবহার করা সম্পূর্ণ জায়েজ। এতে রোজার কোনো ক্ষতি হয় না।








