আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার এক গভীর ষড়যন্ত্রের তথ্য ফাঁস হয়েছে। একাধিক নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, একটি বিদেশি শক্তি ও দেশের ভেতর ঘাপটি মেরে থাকা কিছু চক্র মিলে এই নির্বাচন বানচালের ‘নীলনকশা’ তৈরি করেছে। এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ বাধিয়ে দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের নির্বাচন প্রক্রিয়াকে বিতর্কিত করা।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে ‘ক্রিটিক্যাল ফেজ’ ও নাশকতার পরিকল্পনা
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের ঠিক আগে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় বা ‘ক্রিটিক্যাল ফেজ’ নির্ধারণ করা হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে টার্গেট কিলিং, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং রাজনৈতিক সমাবেশে বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াতের মতো বড় রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের মধ্যে অনুপ্রবেশকারী ঢুকিয়ে সংঘাত তৈরির চেষ্টা চলছে। দেশের ৮৭টি সংসদীয় আসনে এই ধরনের বড় সংঘাতের আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জেএমবির ১০৩ সদস্য ও ‘র’-এর সংশ্লিষ্টতা নিয়ে উদ্বেগ
সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্যটি হলো, ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর মদতে একদল তরুণকে উগ্রবাদী হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে বলে গোয়েন্দা তথ্যে উঠে এসেছে। এদের মাধ্যমে ২০০৫ সালের মতো দেশজুড়ে সিরিজ বোমা হামলার পুনরাবৃত্তি ঘটানোর চেষ্টা করা হতে পারে।
- জেএমবি কানেকশন: জেএমবির ১০৩ জন প্রশিক্ষিত পলাতক সদস্যকে নিয়ে দেশজুড়ে উচ্চ সতর্কবার্তা (High Alert) জারি করা হয়েছে।
- সীমান্ত প্রশিক্ষণ: ভারতে পলাতক কিছু সাবেক পুলিশ ও সেনা কর্মকর্তা এই ঘাতক বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
- সাইবার যুদ্ধ: সাধারণ তরুণদের ব্রেইনওয়াশ করে গণতন্ত্রকে ‘কুফরি ব্যবস্থা’ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যাতে তারা নির্বাচন বিরোধী কর্মকাণ্ডে অংশ নেয়।
দিল্লিতে বসে রিমোট কন্ট্রোল নাড়ছেন ‘জুলাই গণহত্যার’ নায়করা
গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, এই পুরো ষড়যন্ত্রের মূল কেন্দ্রবিন্দু বর্তমানে দিল্লি ও কলকাতায় অবস্থানরত আওয়ামী লীগের পলাতক নেতারা। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, জাহাঙ্গীর কবির নানক এবং সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ একদল পলাতক প্রশাসনিক কর্মকর্তা এই ‘আনহলি অ্যালায়েন্স’ বা অপশক্তির জোট গঠন করেছেন। তাদের মূল লক্ষ্য হলো যে কোনো মূল্যে আওয়ামী লীগবিহীন এই নির্বাচনকে ব্যর্থ করে দেওয়া।
টার্গেট কিলিংয়ের নিশানায় জুলাই বিপ্লবের নায়করা
জুলাই বিপ্লবের আইকন হিসেবে পরিচিত তরুণ নেতা নাহিদ ইসলাম ও নাসিরউদ্দীন পাটওয়ারীসহ ছাত্র নেতাদের ওপর হামলার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। গোয়েন্দাদের ধারণা, এদের ওপর হামলা চালিয়ে সেই দায়ভার অন্য রাজনৈতিক দলের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে, যা দেশকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
প্রযুক্তি ব্যবহার করে সাইবার যুদ্ধ ও গুজব
বর্তমান সময়ের এই ষড়যন্ত্র কেবল মাঠে নয়, ডিজিটাল জগতেও সক্রিয়। ইউটিউব, টেলিগ্রাম এবং এনক্রিপ্টেড প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে গুজব ছড়ানো হচ্ছে।
১. এআই প্রযুক্তির ব্যবহার: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে রাজনৈতিক নেতাদের কণ্ঠ নকল করে ভুয়া অডিও ক্লিপ তৈরি করা হচ্ছে।
২. ভুয়া ভিডিও: ভোটকেন্দ্রে হামলার ভুয়া ভিডিও তৈরি করে জনমনে আতঙ্ক ছড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
৩. নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন করা: বড় ধরনের অপারেশন চালানোর সময় মোবাইল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন করার মতো প্রযুক্তিও এই চক্রের হাতে রয়েছে বলে জানা গেছে।
সরকারের নিরাপত্তা প্রস্তুতি
ষড়যন্ত্রের জাল ছিঁড়তে সরকার নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী:
- ৯ লাখ সদস্য মোতায়েন: সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি, র্যাব এবং আনসারসহ ৯ লাখের বেশি সদস্য নির্বাচনের নিরাপত্তায় থাকবেন।
- ১ লাখ সেনা সদস্য: সরাসরি মাঠে থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবেন ১ লাখ সেনা সদস্য।
- প্রযুক্তি নজরদারি: ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে ড্রোন, সিসিটিভি ক্যামেরা এবং থার্মাল ইমেজিং ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারি চালানো হবে।
- সীমান্তে রেড অ্যালার্ট: সিলেট, যশোর ও ময়মনসিংহ সীমান্ত দিয়ে যাতে কোনো বিস্ফোরক বা ঘাতক ঢুকতে না পারে, সেজন্য বিজিবিকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়েছে।
সাধারণ মানুষের জন্য নিরাপত্তা বার্তা
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা এবং মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. ওমর ফারুক জানিয়েছেন, সাধারণ মানুষের সচেতনতাই পারে এই নীলনকশা ব্যর্থ করে দিতে।
- সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোনো তথ্য যাচাই ছাড়া শেয়ার করবেন না।
- অপরিচিত কোনো পার্সেল বা সন্দেহজনক গতিবিধি দেখলে দ্রুত ৯৯৯ নম্বরে ফোন করুন।
- গুজব প্রতিরোধে স্থানীয় প্রশাসন ও যৌথ বাহিনীকে সহায়তা করুন।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানিয়েছেন, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে সরকার বদ্ধপরিকর। বিদেশি কোনো প্রেসক্রিপশন বা নীলনকশা এদেশের সচেতন জনগণের সামনে টিকবে না।








