বাংলাদেশে বর্তমানে অসংক্রামক ব্যাধিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম ক্যান্সার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, বাংলাদেশে ক্যান্সারের প্রাদুর্ভাব আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। পরিসংখ্যান বলছে, দেশে প্রতি বছর নতুন করে প্রায় দেড় লাখেরও বেশি মানুষ এই মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছেন। এর মধ্যে প্রতি বছর প্রাণ হারাচ্ছেন প্রায় ৯১ হাজার ৩৩৯ জন।
আপনি কি কখনো ভেবে দেখেছেন, এই সংখ্যাটি আসলে কতটা ভয়াবহ? আমরা যদি বার্ষিক এই হিসাবকে দিনের হিসাবে ভাগ করি, তবে দেখা যায় বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে ৪১১ জন মানুষ নতুন করে ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন। সহজ কথায় বলতে গেলে, প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১৭ জন মানুষ এই ঘাতক ব্যাধির শিকার হচ্ছেন। আর প্রতিদিন মৃত্যু হচ্ছে প্রায় ২৫০ জনের।
যেসব কারণে বাড়ছে ক্যান্সারের ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশে ক্যান্সারের প্রাদুর্ভাব বাড়ার পেছনে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ চিহ্নিত করেছেন। আমাদের আধুনিক জীবনযাত্রা এবং পরিবেশগত পরিবর্তনই এর জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী।
১. খাদ্যে ভেজাল ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস
আমাদের দেশে খাদ্যে ভেজালের সমস্যা দীর্ঘদিনের। ফরমালিন থেকে শুরু করে কার্বাইড নানা ক্ষতিকর রাসায়নিক আমাদের শরীরে ঢুকছে। এছাড়া অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত খাবার এবং শাকসবজিতে অনিয়ন্ত্রিত কীটনাশকের ব্যবহার কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধিতে সহায়তা করে, যা পরবর্তীতে ক্যান্সারে রূপ নেয়।
২. পরিবেশ দূষণ ও আধুনিকায়ন
শহর অঞ্চলের বায়ু দূষণ এখন চরমে। কলকারখানার ধোঁয়া এবং ধূলিকণা সরাসরি আমাদের ফুসফুসে প্রবেশ করছে। দীর্ঘমেয়াদী এই দূষণ ফুসফুসের ক্যান্সারের ঝুঁকি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
৩. তামাক ও ধূমপানের ভয়াবহতা
বাংলাদেশে পুরুষদের মধ্যে ক্যান্সারের প্রধান কারণ হলো তামাকজাত দ্রব্য। বিড়ি-সিগারেট ছাড়াও জর্দা ও গুলের ব্যবহার মুখগহ্বর এবং খাদ্যনালীর ক্যান্সারের জন্য দায়ী। পরোক্ষ ধূমপানও সমানভাবে ক্ষতিকর।
৪. শনাক্তকরণে চরম অবহেলা
আমাদের দেশের মানুষ সাধারণত রোগের শেষ পর্যায়ে ডাক্তারের কাছে যান। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ক্যান্সার যখন তৃতীয় বা চতুর্থ স্টেজে ধরা পড়ে, তখন চিকিৎসকদের আর কিছুই করার থাকে না। স্ক্রিনিং বা আগাম পরীক্ষার অভাবই মৃত্যুর হার বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ক্যান্সারের ধরণ ও লিঙ্গভিত্তিক পরিসংখ্যান
ক্যান্সার শরীরের যেকোনো অঙ্গে হতে পারে। তবে বাংলাদেশে লিঙ্গভেদে কিছু নির্দিষ্ট ক্যান্সারের আধিক্য দেখা যায়।
নারীদের ক্ষেত্রে প্রধান ক্যান্সার
বাংলাদেশে নারীরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন স্তন ক্যান্সারে। এর পরেই রয়েছে জরায়ুমুখের ক্যান্সার। বাল্যবিবাহ এবং ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার অভাব জরায়ুমুখের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।
পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রধান ক্যান্সার
পুরুষদের মধ্যে ফুসফুসের ক্যান্সার শীর্ষে। এছাড়া খাদ্যনালী, প্রোস্টেট এবং কোলন ক্যান্সারে আক্রান্তের সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে।
একনজরে পরিসংখ্যান টেবিল
| সময়কাল | নতুন আক্রান্ত (গড়ে) | মৃত্যুর সংখ্যা (গড়ে) |
| প্রতি বছর | ১,৫০,০০০+ জন | ৯১,৩৩৯ জন |
| প্রতি মাস | ১২,৫০০ জন | ৭,৬১১ জন |
| প্রতি দিন | ৪১১ জন | ২৫০ জন |
| প্রতি ঘণ্টা | ১৭ জন | ১০ জন |
ক্যান্সার প্রতিরোধে আমাদের করণীয়: বাঁচার উপায় কী?
ক্যান্সার মানেই নিশ্চিত মৃত্যু এই ধারণা এখন ভুল। সঠিক সময়ে ধরা পড়লে এবং জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনলে ক্যান্সার জয় করা সম্ভব।
১. খাদ্যাভ্যাসে আমূল পরিবর্তন
আপনার প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় প্রচুর পরিমাণে সবুজ শাকসবজি এবং রঙিন ফলমূল রাখুন। অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট যুক্ত খাবার শরীরের ক্ষতিকর টক্সিন বের করে দেয়। যতটা সম্ভব বাইরের প্রসেসড খাবার বা ফাস্টফুড বর্জন করুন।
২. তামাককে ‘না’ বলুন
আপনি যদি নিজেকে এবং নিজের পরিবারকে ভালোবাসেন, তবে আজই ধূমপান ত্যাগ করুন। তামাকজাত পণ্যের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলাই হলো ক্যান্সার থেকে বাঁচার সবচেয়ে সহজ পথ।
৩. নিয়মিত শরীরচর্চা ও ওজন নিয়ন্ত্রণ
অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা অনেক ধরণের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। প্রতিদিন অন্তত ৩০ থেকে ৪০ মিনিট দ্রুত হাঁটা বা ব্যায়াম করা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
৪. স্ক্রিনিং বা আগাম পরীক্ষা
৪০ বছর বয়সের পর পুরুষ ও নারী উভয়েরই নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো উচিত। বিশেষ করে পরিবারের কারো ক্যান্সারের ইতিহাস থাকলে স্ক্রিনিং করানো বাধ্যতামূলক। বর্তমানে সরকারি হাসপাতালগুলোতে জরায়ুমুখের ক্যান্সার শনাক্তকরণের জন্য ‘ভায়া’ (VIA) টেস্ট বিনামূল্যে করা হয়।
চিকিৎসাব্যবস্থা: সীমাবদ্ধতা ও সমাধান
বাংলাদেশে ক্যান্সারের উন্নত চিকিৎসা এখনও অনেক ব্যয়বহুল। অধিকাংশ বড় হাসপাতাল এবং বিশেষজ্ঞ ডাক্তার রাজধানী কেন্দ্রিক। ফলে গ্রাম বা মফস্বলের রোগীরা সঠিক সময়ে চিকিৎসা পান না।
জেলা পর্যায়ে আধুনিক সুবিধা প্রয়োজন
প্রতিদিন যে ৪১১ জন নতুন রোগী যোগ হচ্ছেন, তাদের সবার জন্য ঢাকায় এসে চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব নয়। তাই প্রতিটি বিভাগীয় ও জেলা শহরে ক্যান্সার ইউনিট স্থাপন করা এখন সময়ের দাবি। রেডিওথেরাপি ও কেমোথেরাপির খরচ সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসা জরুরি।
সরকারের ভূমিকা ও সচেতনতা মূলক কার্যক্রম
বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যেই বিভাগীয় শহরগুলোতে ক্যান্সার হাসপাতাল তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। তবে কেবল হাসপাতাল বানালে হবে না, জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। স্কুল-কলেজ এবং গণমাধ্যমে ক্যান্সারের লক্ষণগুলো নিয়ে ব্যাপক প্রচার চালানো প্রয়োজন।
ক্যান্সারের কিছু সাধারণ লক্ষণ (যা এড়িয়ে যাবেন না)
আপনার শরীরে নিচের পরিবর্তনগুলো দেখলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন:
- শরীরের কোনো স্থানে অস্বাভাবিক চাকা বা দলা অনুভব করা।
- দীর্ঘদিন ধরে সারছে না এমন ক্ষত।
- মলত্যাগের অভ্যাসে আকস্মিক পরিবর্তন।
- হঠাৎ করে শরীরের ওজন কমে যাওয়া।
- দীর্ঘদিনের কাশি বা কর্কশ কণ্ঠস্বর।
- অস্বাভাবিক রক্তপাত (বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে)।
সচেতনতাই বড় ওষুধ
প্রতিদিন ৪১১ জন নতুন আক্রান্ত হওয়ার এই ভয়াবহ পরিসংখ্যান আমাদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। ক্যান্সার কেবল একজন ব্যক্তিকে নয়, বরং পুরো পরিবারকে ধ্বংস করে দেয়। আমাদের মনে রাখতে হবে, ক্যান্সার প্রতিরোধের চাবিকাঠি আমাদের হাতেই। সঠিক খাদ্যাভ্যাস, সুস্থ জীবনযাপন এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষাই পারে এই মরণব্যাধি রুখে দিতে। আসুন, নিজে সচেতন হই এবং অন্যকেও সচেতন করি।








