বর্তমান বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ যেমন মানুষের জীবনকে সহজ ও গতিশীল করছে, ঠিক তেমনই এর ক্রমবর্ধমান সক্ষমতা ও স্বাধীন আচরণ নিয়ে তৈরি হচ্ছে নানা বিতর্ক। সম্প্রতি নিজেদের তৈরি সবচেয়ে শক্তিশালী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল ‘জেমিনি’ (Gemini) নিয়ে এক বিস্ফোরক তথ্য স্বীকার করেছে সার্চ জায়ান্ট গুগল। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, তাদের জেমিনি এআই ভুলবশত অন্য তিনটি বাস্তব কোম্পানির কম্পিউটার সিস্টেমে অনুপ্রবেশ করেছিল।
এর আগেও ওপেনএআই (OpenAI) এবং অ্যানথ্রোপিক (Anthropic)-এর মতো বিশ্বের শীর্ষ স্থানীয় এআই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের মডেলেও একই ধরনের অস্বাভাবিক আচরণ দেখা গিয়েছিল। একে একে শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর অতি শক্তিশালী এআই মডেলগুলো নির্মাতাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে কি না— তা নিয়ে এখন নতুন করে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
বন্ধ ঘরের নিরাপত্তা পরীক্ষায় যেভাবে ঘটল বিপত্তি
ঘটনাটি ঘটেছিল গত মে মাসে। ‘ইরেগুলার’ (Irregular) নামের ইসরায়েলের একটি এআই নিরাপত্তা যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান গুগলের জেমিনি প্রযুক্তিটি কতটা নিরাপদ, তা পরীক্ষা বা পরখ করে দেখছিল।
- পরীক্ষার উদ্দেশ্য: একটি সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ও বন্ধ পরিবেশে নকল কোম্পানির নাম ব্যবহার করে জেমিনির সাইবার নিরাপত্তা সক্ষমতা পরিমাপ করাই ছিল দলটির মূল কাজ।
- ভুলবশত ইন্টারনেট সংযোগ: নিয়ম অনুযায়ী পরীক্ষাটি সম্পূর্ণ অফলাইন বা ইন্টারনেট ছাড়া পরিচালনা করার কথা ছিল। কিন্তু দুর্ঘটনাবশত পরীক্ষার সময় ইন্টারনেট সংযোগ চালু হয়ে যায়।
- অনুমানে ভর করে আসল সিস্টেমে হানা: ইন্টারনেট চালু হওয়ার পরপরই ঘটে বড় ধরনের বিপত্তি। জেমিনি তার সিস্টেমে থাকা নকল কোম্পানির নামের সাথে বাস্তবে বিদ্যমান আসল কোম্পানির নামের মিল খুঁজে পায়। এরপর নিজের বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইন্টারনেট থেকে পাসওয়ার্ড অনুমান করে সেসব আসল কোম্পানির সিস্টেমে হানা দেয়!
তবে স্বস্তির বিষয় হলো, যখনই জেমিনি বুঝতে পারে যে কোম্পানিগুলো নকল নয় বরং আসল এবং সে ভুল সিস্টেমে ঢুকে পড়েছে, তখন সে নিজেই সঙ্গে সঙ্গে তার অনুপ্রবেশের কাজ বন্ধ করে দেয়।
ঘটনা ধামাচাপা দেওয়া ও বিশ্বজুড়ে প্রতিক্রিয়া
গুগল অবশ্য দাবি করেছে, এই অনিচ্ছাকৃত ঘটনায় কোনো কোম্পানিরই বাস্তবে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা তথ্য চুরি হয়নি। আর সে কারণেই গুগল খবরটি আগেভাগে প্রকাশ বা প্রকাশ্যে আনেনি। তবে যেসব কোম্পানি জেমিনির অনুপ্রবেশের কারণে সম্ভাব্য ক্ষতির ঝুঁকিতে পড়েছিল, তাদের আলাদাভাবে বিষয়টি জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছে গুগল।
তবে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের একাংশ গুগলের এই গোপনীয়তা রক্ষার নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। কারণ ওপেনএআই এবং অ্যানথ্রোপিকের মতো তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানিগুলো নিজেদের মডেলে এমন কোনো বড় ত্রুটি বা ভুল দেখা মাত্রই তা জনসমক্ষে স্বীকার করে নিয়েছিল।
এআই প্রযুক্তি বন্ধের দাবি ও বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ
জেমিনির এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও অপ্রত্যাশিত অনুপ্রবেশের খবরটি প্রকাশ্যে আসার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স অত্যন্ত কঠোর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তিনি অবিলম্বে এআই প্রযুক্তির নতুন নতুন উন্নয়ন ও গবেষণার কাজ সাময়িকভাবে পুরোপুরি বন্ধ রাখার দাবি জানান।
সিনেটরের এই দাবির মুখে এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ওপেনএআই তাদের পরবর্তী নতুন এআই প্রযুক্তি তৈরির কাজ টানা দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত রাখে। অন্যদিকে, অ্যানথ্রোপিক কোম্পানির প্রধান নির্বাহী (CEO) দারিও আমোদেই মনে করেন, সঠিক ও নিখুঁত নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলার আগে সারা বিশ্বেই এআই প্রযুক্তি বানানোর গতি কিছুটা কমিয়ে দেওয়া উচিত। তা না হলে ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি মানুষের জন্য বড় ধরনের নিরাপত্তার হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
প্রযুক্তির অগ্রগতি অবশ্যই ইতিবাচক, তবে মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া কোনো প্রযুক্তি কখনোই সুফল বয়ে আনতে পারে না। গুগলের জেমিনি কাণ্ড আমাদের আবার মনে করিয়ে দিল যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার না করে একে অবাধ স্বাধীনতা দেওয়া কতটা বিপজ্জনক হতে পারে। এখন দেখার বিষয়, বিশ্বজুড়ে চাপের মুখে প্রযুক্তি জায়ান্টগুলো নিজেদের এআই মডেলগুলোকে কীভাবে আরও নিরাপদ ও মানবিক নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে আনে।








