বর্তমান ডিজিটাল যুগে আমাদের প্রতিদিন অসংখ্য ই-মেইল, মেসেজ এবং সোশ্যাল মিডিয়া মেসেজ পেতে হয়। অচেনা নম্বর বা ই-মেইল থেকে আসা এসব বার্তার মাঝে অনেক সময় লুকিয়ে থাকে সাইবার অপরাধীদের ফাঁদ। ক্ষতিকর এসব লিঙ্ককে বলা হয় ‘ফিশিং লিঙ্ক’।
সাধারণত পুরস্কারের লোভ দেখিয়ে, জরুরি নোটিশ দিয়ে কিংবা অ্যাকাউন্ট বন্ধ হওয়ার ভয় দেখিয়ে এসব লিঙ্কে ক্লিক করতে বাধ্য করা হয়। অসাবধানতাবশত যদি আপনি এমন কোনো ক্ষতিকর লিঙ্কে ক্লিক করেই ফেলেন, তবে একদম আতঙ্কিত হবেন না। নিজেকে সাইবার আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে ঠাণ্ডা মাথায় কয়েকটি সহজ কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে হবে।
১. কোনো ধরনের ব্যক্তিগত তথ্য দেবেন না
সন্দেহজনক লিঙ্কে ক্লিক করার পর যদি কোনো ওয়েবসাইট ভেসে ওঠে এবং সেখানে আপনার নাম, ই-মেইল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাসওয়ার্ড, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা ডেবিট-ক্রেডিট কার্ডের তথ্য চাওয়া হয় তবে ভুল করেও তা দেবেন না।
- ফর্ম পূরণ বন্ধ করুন: পেজটি হুবহু আপনার চেনা কোনো ব্যাংকের মতো দেখতে হলেও সেখানে তথ্য দেওয়া থেকে বিরত থাকুন।
- দ্রুত পেজটি কেটে দিন: কোনো কিছু চিন্তা না করে ব্রাউজারের ট্যাবটি সাথে সাথে বন্ধ করে দিন।
মনে রাখবেন, ফিশিং লিঙ্কগুলোর আসল উদ্দেশ্যই হলো আপনার কাছ থেকে নিজের হাতে তথ্যগুলো লিখিয়ে নেওয়া। আপনি তথ্য না দিলে ক্ষতির আশঙ্কা অনেক কমে যায়।
২. পাসওয়ার্ড দ্রুত বদলে ফেলুন
যদি আপনি ভুল করে সেই ভুয়া ওয়েবসাইটে নিজের কোনো অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড লিখেই ফেলেন, তবে ১ সেকেন্ডও দেরি করবেন না।
- মূল অ্যাপ বা ওয়েবসাইট থেকে পাসওয়ার্ড সরান: ফিশিং লিঙ্কের পেজ বন্ধ করে আপনার ফোনের আসল অ্যাপ বা অফিশিয়াল ব্রাউজারে যান এবং পাসওয়ার্ড বদলে দিন।
- অন্যান্য অ্যাকাউন্টের কথা ভাবুন: আপনি কি একই পাসওয়ার্ড ই-মেইল, ফেসবুক বা বিকাশ-নগদে ব্যবহার করেন? তবে সেসব জায়গাতেও দ্রুত নতুন ও শক্ত পাসওয়ার্ড দিন।
- টু-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন (2FA): প্রতিটি অ্যাকাউন্টে দুই স্তরের নিরাপত্তা বা টু-স্টেপ ভেরিফিকেশন চালু রাখুন। এতে কেউ পাসওয়ার্ড পেলেও আপনার ফোনে আসা কোড ছাড়া লগইন করতে পারবে না।
৩. আপনার ডিভাইস ম্যালওয়্যার বা ভাইরাস দিয়ে পরীক্ষা করুন
অনেক সময় ক্ষতিকর লিঙ্কে ক্লিক করার সাথে সাথে ফোনের পেছনে অচেনা কোনো ফাইল বা ক্ষতিকর অ্যাপ ডাউনলোড হয়ে যেতে পারে, যাকে ম্যালওয়্যার বলা হয়।
- ডাউনলোড ফোল্ডার দেখুন: ফোনের ‘Download’ ফোল্ডারে গিয়ে দেখুন অচেনা কোনো ফাইল অটোমেটিক ডাউনলোড হয়েছে কি না। থাকলে সাথে সাথে তা ডিলিট করুন।
- অ্যান্টাভাইরাস স্ক্যান: কম্পিউটারে বা ফোনে একটি ভালো মানের অ্যান্টিভাইরাস বা অ্যান্টি-ম্যালওয়্যার সফটওয়্যার দিয়ে পুরো ডিভাইস স্ক্যান করে নিন।
- অস্বাভাবিক আচরণ নজরে রাখুন: ফোন কি হঠাৎ খুব গরম হচ্ছে, হ্যাং করছে বা বেশি ডাটা খরচ করছে? এমন হলে বুঝবেন ডিভাইসে সমস্যা হয়েছে।
৪. ব্যাংক ও আর্থিক লেনদেনের ওপর নজর রাখুন
যদি লিঙ্কে ভুল করে আপনার ক্রেডিট কার্ড, ডেবিট কার্ড বা অনলাইন ব্যাংকিংয়ের তথ্য দিয়ে থাকেন, তবে দ্রুত আর্থিক ক্ষতি ঠেকাতে ব্যবস্থা নিতে হবে।
- হেড অফিসে কল দিন: সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা কার্ড সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের কাস্টমার কেয়ারে কল দিয়ে বিষয়টি জানান। প্রয়োজনে সাময়িকভাবে কার্ড বা অ্যাকাউন্ট ব্লক করুন।
- স্টেটমেন্ট চেক করুন: পরবর্তী কয়েক দিন নিয়মিত আপনার ব্যাংক স্টেটমেন্ট বা মোবাইলের ট্রানজেকশন হিস্ট্রি চেক করুন। অচেনা ১ টাকার লেনদেন চোখে পড়লেও সাথে সাথে ব্যাংককে জানান।
৫. অ্যাকাউন্টে সন্দেহজনক কার্যকলাপ দেখলে যা করবেন
লিঙ্কে ক্লিক করার পর যদি দেখেন আপনার ই-মেইলে অচেনা ডিভাইসে লগইনের নোটিফিকেশন আসছে বা পাসওয়ার্ড পরিবর্তনের মেইল এসেছে, তবে বুঝে নেবেন অ্যাকাউন্ট ঝুঁকিতে আছে।
- সব ডিভাইস থেকে লগআউট দিন: অ্যাকাউন্দের সিকিউরিটি অপশনে গিয়ে ‘Log out of all devices’ অপশনে ক্লিক করুন।
- অফিশিয়াল সাপোর্ট থেকে সাহায্য নিন: সন্দেহজনক লিঙ্কে আর দ্বিতীয়বার ঢুকবেন না। কেবল মূল ওয়েবসাইটের হেল্প সেন্টারে যোগাযোগ করে আপনার অ্যাকাউন্টটি উদ্ধার করুন।
সহজে কীভাবে ফিশিং লিঙ্ক চিনবেন?
সাইবার অপরাধীরা খুব চালাক হলেও ফিশিং লিঙ্ক চেনার কিছু সহজ উপায় আছে। এগুলো মাথায় রাখলে আপনি সহজেই ভুয়া লিঙ্ক ধরে ফেলতে পারবেন:
ফিশিং লিঙ্ক চেনার সহজ উপায়:
১. বানানে ভুল: আসল ডোমেইন নামের বানানে সামান্য পরিবর্তন থাকে (যেমন: facebook-এর জায়গায় faacebook)।
২. জরুরি ভয় বা অফার: "২ মিনিটে ১ লাখ টাকা জিতুন" বা "আপনার অ্যাকাউন্ট এখনই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে"।
৩. অচেনা প্রেরক: অচেনা ই-মেইল বা মেসেজ থেকে আসা লিঙ্ক।
যেকোনো ব্যাংকিং বা দরকারি কাজে মেসেজে আসা লিঙ্কে ক্লিক না করে সরাসরি ব্রাউজারে গিয়ে নিজে ওয়েবসাইটের ঠিকানা টাইপ করে ঢুকাই সবচেয়ে নিরাপদ।
একটি কথা সবসময় মনে রাখা জরুরি শুধুমাত্র কোনো লিঙ্কে একটা ভুল ক্লিক করলেই যে সাথে সাথে আপনার ফোন বা সম্পূর্ণ অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়ে যাবে, বিষয়টি কিন্তু সব সময় তেমন নয়। আসল বিপদ তখন ঘটে, যখন আপনি সেই ওয়েবসাইটে গিয়ে নিজের মনের অজান্তে পাসওয়ার্ড দিয়ে দেন কিংবা ক্ষতিকর কোনো অ্যাপ ডাউনলোড করে ফেলেন।
তাই ভুল করে ফেলে দিলে ভয় না পেয়ে তৎক্ষণাৎ সচেতন হওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। এই সহজ পদক্ষেপগুলো মেনে চললে আপনি ও আপনার কষ্টার্জিত টাকা সবসময় সুরক্ষিত থাকবে।








