বিশ্বজুড়ে ক্যানসারে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হলো ফুসফুসের ক্যানসার। কিন্তু এই রোগটিকে ঘিরে মানুষের মনে এখনো অনেক ভুল ধারণা বা অন্ধবিশ্বাস রয়ে গেছে। অনেকেই ভাবেন, যিনি কখনো সিগারেট স্পর্শ করেননি, তার বোধহয় এই রোগ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। আবার অনেকে মনে করেন, ক্যানসার ধরা পড়লে মৃত্যু একেবারে নিশ্চিত।
তবে ক্যানসার বিশেষজ্ঞদের মতে, বাস্তব চিত্রটি পুরোপুরি আলাদা। নিউইয়র্কের সিনাইয়ের টিশ ক্যানসার ইনস্টিটিউটের থোরাসিক অনকোলজি সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক ড. ফ্রেড আর. হার্শ ফুসফুসের ক্যানসার ও এর ঝুঁকি নিয়ে বেশ কিছু ভুল ধারণার সত্যতা উন্মোচন করেছেন। চিকিৎসকদের মতে, কেবল ধূমপায়ীরাই নন, যেকোনো মানুষের ক্ষেত্রেই এই রোগের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
১. ধূমপান না করলেও ফুসফুসের ক্যানসার হতে পারে
অনেকে বিশ্বাস করেন অধূমপায়ীদের এই রোগ হয় না, যা একেবারেই ভুল। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ক্যানসারে আক্রান্তদের প্রায় ১০ থেকে ২০ শতাংশ মানুষ জীবনে কখনো ধূমপানই করেননি। পরোক্ষ ধূমপান (অন্যের সিগারেটের ধোঁয়া) এবং পরিবেশের তেজস্ক্রিয় গ্যাসের প্রভাব অধূমপায়ীদের মধ্যেও ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
২. শুধু বয়স্ক নয়, কম বয়সীদেরও ঝুঁকি রয়েছে
সাধারণত ৬৫ বছরের বেশি বয়সী মানুষের মধ্যে এই রোগ বেশি দেখা যায়। কিন্তু ইদানীং তরুণদের মধ্যেও ফুসফুসের ক্যানসার শনাক্ত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের গবেষণায় দেখা গেছে, তরুণ বা অপেক্ষাকৃত কম বয়সী নারীদের মধ্যে আক্রান্ত হওয়ার হার আগের চেয়ে বাড়ছে। তাই বয়স কম হলেও শরীরের কোনো অস্বাভাবিক লক্ষণকে অবহেলা করা উচিত নয়।
৩. রেডন গ্যাস ও বায়ুদূষণের ক্ষতিকর প্রভাব
ধূমপান না করা সত্ত্বেও ফুসফুসের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে পরিবেশের কিছু উপাদান:
- রেডন গ্যাস: এটি মাটি ও পাথরের মধ্যকার ইউরেনিয়াম ভেঙে তৈরি হওয়া একধরনের গন্ধহীন ও বর্ণহীন তেজস্ক্রিয় গ্যাস। এটি বাতাস বা ঘরের বন্ধ পরিবেশে জমা হতে পারে। দীর্ঘদিন এই গ্যাসের সংস্পর্শে থাকলে ক্যানসারের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
- বায়ুদূষণ: বিষাক্ত ধোঁয়া ও বায়ুদূষণ ফুসফুসের ক্ষতি করে। বায়ুদূষণ ও ধূমপান দুটি ঝুঁকি যদি একসাথে থাকে, তবে রোগের আশঙ্কা অনেক বেড়ে যায়।
- অন্যান্য পরিবেশগত উপাদান: অ্যাসবেস্টস, অতিরিক্ত কেমিক্যাল বা বুকে পুরোনো রেডিয়েশন থেরাপির ইতিহাস থাকলেও ক্যানসার হতে পারে।
৪. ধূমপান ত্যাগ করা ও ক্যানসার পরবর্তী সচেতনতা
অনেক মানুষের ধারণা, দীর্ঘদিন ধূমপান করার পর তা ছেড়ে দিলে আর কোনো লাভ হয় না। কিন্তু চিকিৎসকরা বলছেন, যেকোনো বয়সে ধূমপান ত্যাগ করলে ক্যানসারের ঝুঁকি কমতে শুরু করে।
এমনকি ক্যানসার ধরা পড়ার পরও যদি রোগী ধূমপান সম্পূর্ণ বর্জন করেন, তবে ওষুধ ও চিকিৎসার কার্যকারিতা অনেক উন্নত হয় এবং রোগীর সুস্থ হয়ে ওঠার সুযোগ বাড়ে।
৫. ক্যানসার ও চিকিৎসা নিয়ে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা
ফুসফুসের ক্যানসার প্রতিরোধ ও চিকিৎসা নিয়ে সমাজে কিছু ভ্রান্ত কথা প্রচলিত আছে:
- অস্ত্রোপচারে ক্যানসার ছড়ায় না: অপারেশনের মাধ্যমে ক্যানসার পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ে এমন ভাবনার কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারই জীবন বাঁচানোর মূল উপায়।
- ট্যালকম পাউডার ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট: ট্যালকম পাউডার ব্যবহারে ক্যানসার হয় কিংবা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সাপ্লিমেন্ট খেলেই ক্যানসার আটকানো যায়—এই দুটির কোনোটিরই নিশ্চিত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ মেলেনি।
- লক্ষণ ছাড়াও হতে পারে: সবসময় শুরুতে ক্যানসারের স্পষ্ট লক্ষণ নাও থাকতে পারে। এ কারণে নিয়মিত শরীরের চেকআপ ও স্ক্রিনিং করা জরুরি।
ফুসফুসের ক্যানসার মানেই নিশ্চিত মৃত্যু নয়। প্রাথমিক অবস্থায় রোগ নির্ণয় করা গেলে আধুনিক চিকিৎসার মাধ্যমে ৬০ শতাংশেরও বেশি রোগী পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন। ভুল ধারণায় কান না দিয়ে ধূমপান এড়িয়ে চলা, বায়ুদূষণ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা এবং নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই হতে পারে ক্যানসার থেকে বেঁচে থাকার প্রধান হাতিয়ার।








