মানুষ সৃষ্টি হওয়ার পর থেকেই শয়তান তাকে পথভ্রষ্ট করার প্রতিজ্ঞা নিয়েছিল। প্রতিটি পদক্ষেপে মুমিনের ইমান নষ্ট করা, ইবাদত থেকে দূরে রাখা এবং পাপের দিকে ধাবিত করাই শয়তানের মূল লক্ষ্য। সে মানুষের রক্তের শিরা-উপশিরায় যাতায়াত করে প্রতি মুহূর্তে চক্রান্তের জাল বোনায় ব্যস্ত থাকে।
তবে শয়তানের এই নিরন্তর চেষ্টা ও প্রতারণার মাঝেও এমন কিছু বিশেষ মুহূর্ত ও অবস্থা আসে, যখন মুমিনের অটলতা এবং দৃঢ়তার কাছে সে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়ে যায়। একপর্যায়ে হতাশ হয়ে সে আর ওই মানুষের পেছনে না লেগে হাল ছেড়ে দিয়ে দূরে সরে যেতে বাধ্য হয়।
চলুন সহজ ভাষায় কুরআন ও হাদিসের আলোকে জেনে নেওয়া যাক শয়তান কখন মানুষের পেছন থেকে হাল ছেড়ে দেয় এবং কীভাবে নিজের ইমান রক্ষা করবেন।
১. আমলে ধারাবাহিকতা ও অটলতা বজায় রাখলে
তাবেয়ী হযরত ইমাম হাসান আল-বসরী (রহিমাহুল্লাহ) শয়তানের সাথে মুমিনের মানসিক ও আত্মিক যুদ্ধের চমৎকার এক চিত্র তুলে ধরেছেন।
তিনি জানান, কোনো বান্দা যখন নতুন কোনো ভালো কাজ বা ইবাদত শুরু করে, তখন শয়তান অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে ওঠে। সে নানাভাবে অলসতা, ভয় ও সংশয় সৃষ্টি করে বান্দাকে থামানোর চেষ্টা করে। কিন্তু বান্দা যদি শয়তানের সব প্ররোচনা উপেক্ষা করে ধারাবাহিকভাবে সেই নেক আমল চালিয়ে যেতে থাকে, তখন শয়তান একদম ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
বান্দাকে কোনোভাবেই দমানো যাচ্ছে না দেখে শয়তান শেষ পর্যন্ত হতাশ হয়ে তার পেছনে লাগা বন্ধ করে দেয় এবং হাল ছেড়ে দেয়।
২. ইখলাস বা একনিষ্ঠতা অর্জন করলে
কুরআন মাজিদে আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, শয়তানের কৌশল দেখতে যত বড়ই মনে হোক না কেন, তা মূলত অত্যন্ত দুর্বল। যারা আল্লাহর ওপর একনিষ্ঠ বিশ্বাস বা ইখলাস অর্জন করতে পারে, তাদের ওপর শয়তানের কোনো ক্ষমতা থাকে না।
সুরা সোয়াদে ইবলিসের উক্তি উল্লেখ করে আল্লাহ বলেন:
‘ইবলিস বলল: আপনার ইজ্জতের কসম! আমি তাদের সকলকেই পথভ্রষ্ট করব; তবে তাদের মধ্য থেকে আপনার খাঁটি ও একনিষ্ঠ বান্দারা ছাড়া।’ (সুরা সোয়াদ: ৮২-৮৩)
অর্থাৎ, আপনি যখন প্রতিটি কাজ একমাত্র আল্লাহকে ভালোবেসে করবেন এবং কোনো লোকদেখানো নিয়ত রাখবেন না, তখন শয়তান আপনার ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এবং হাল ছেড়ে দূরে সরে যায়।
৩. নিয়মিত জিকির ও আল্লাহর স্মরণে থাকলে
যে হৃদয়ে আল্লাহর স্মরণ বা জিকির থাকে, সেখানে শয়তান স্থান পায় না। রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন প্রতিটি কাজের শুরুতে আল্লাহর নাম নিতে এবং শয়তান থেকে আশ্রয় চাইতে।
যদি কোনো ব্যক্তি সবসময় জিকিরের মধ্যে থাকে এবং শয়তানের বিরুদ্ধে আল্লাহর সাহায্য কামনা করে (আউজু বিল্লাহ পড়ে), তখন শয়তান সেই মানুষের কাছ থেকে পালিয়ে যায়।
শয়তান দূরে সরলেও যে বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি
শয়তান একবার হাল ছেড়ে দূরে সরে গেলেই কিন্তু কাজ শেষ হয়ে যায় না। সে অত্যন্ত চতুর এবং সার্বক্ষণিক সুযোগের সন্ধানে থাকে।
যদি মুমিন বান্দা সাময়িকভাবেও ইবাদত থেকে গাফেল বা উদাসীন হয়ে পড়ে, তবে শয়তান আবার সুযোগ বুঝে দ্বিগুণ শক্তিতে এসে তাকে গ্রাস করে। সুরা আজ-যুখরুফে আল্লাহ তাআলা সতর্ক করে বলেন যে ব্যক্তি আল্লাহর স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় বা উদাসীন হয়, শয়তান তার চিরসঙ্গী হয়ে চেপে বসে।
পবিত্র হাদিস শরিফেও বলা হয়েছে, আল্লাহর কাছে সেই আমলই সবচেয়ে প্রিয়, যা পরিমাণে কম হলেও নিয়মিত বা ধারাবাহিকভাবে করা হয় (বুখারি: ৬৪৬৫)।
শয়তানের হাত থেকে বাঁচার ৩টি সহজ উপায়
- আমল ছোট হলেও নিয়মিত করুন: প্রতিদিন অল্প পরিমাণ হলেও নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত, জিকির বা নফল ইবাদত অব্যাহত রাখুন।
- সকালে-সন্ধ্যা জিকির ও দোয়া পড়া: দৈনন্দিন মাসনুন দোয়া ও আউজু বিল্লাহ পাঠের মাধ্যমে নিজেকে আল্লাহর সুরক্ষায় রাখুন।
- পাপ থেকে সাথে সাথে তাওবা করা: ভুলবশত কোনো পাপ হয়ে গেলে দেরি না করে সাথে সাথে তাওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসুন, যাতে শয়তান সুযোগ না পায়।
শয়তান মানুষের পেছন থেকে তখনোই হাল ছেড়ে দেয়, যখন সে দেখে কোনো বান্দা বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও তার ইবাদত ও নেক আমলে অটল রয়েছে। আমলে ধারাবাহিকতা ধরে রাখাই হলো শয়তানের চক্রান্ত নস্যাৎ করার সবচেয়ে বড় অস্ত্র। জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত সতর্ক থেকে ইবাদত চালিয়ে গেলেই শয়তানের সব ফাঁদ ছিন্ন করে জান্নাতের পথ সুগম করা সম্ভব।








