হটলাইনঃ +৮৮০ ৯৬১৩ ০০০ ২০০ |
Wednesday, July 29, 2026
- বিজ্ঞাপন-spot_img
Homeআর্ন্তজাতিকবাংলাদেশ-ভারত-নেপালের তরুণরা আদায় করল দাবি, পাকিস্তানে কেন আন্দোলন হয় না?
spot_img

বাংলাদেশ-ভারত-নেপালের তরুণরা আদায় করল দাবি, পাকিস্তানে কেন আন্দোলন হয় না?

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তরুণ প্রজন্ম বা ‘জেন-জি’ (Gen-Z) এখন এক বিশাল শক্তির নাম। ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে আমরা দেখেছি কীভাবে বাংলাদেশ, নেপাল এবং শ্রীলঙ্কার তরুণরা নিজেদের অধিকার ও দাবি আদায়ে রাজপথে নেমে ইতিহাস গড়েছে। এমনকি ভারতেও সাম্প্রতিক সময়ে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় তরুণদের তুমুল আন্দোলনের মুখে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ আদায় করে নিয়েছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (জিজেপি)।

দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সব দেশেই যেখানে তরুণরা অন্যায় ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে পরিবর্তনের বাতাস নিয়ে আসছে, সেখানে ব্যতিক্রম কেবল পাকিস্তান। ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দা, সর্বোচ্চ বেকারত্ব এবং ক্ষমতার চরম অপব্যবহার থাকা সত্ত্বেও পাকিস্তানে কেন বড় কোনো গণআন্দোলন গড়ে উঠছে না?

পাকিস্তানি তরুণদের হতাশা এবং বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে এই প্রশ্নের পেছনের আসল ও গভীর কারণগুলো।

১. আন্দোলনের সব উপাদান বিদ্যমান, তবু কেন আন্দোলন নেই?

পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে চরম অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশটি আন্তর্জাতিকভাবে ঋণখেলাপি হওয়ার একেবারে দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল। কর্মসংস্থানের অভাব এবং দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। অন্যদিকে, দেশটির রাজনীতি থেকে শুরু করে প্রশাসনের প্রায় সবকিছুই পরোক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণ করে সেনাবাহিনী।

দক্ষিণ এশিয়াভিত্তিক পররাষ্ট্র নীতি বিশেষজ্ঞ মাইকেল কুগেলম্যান এক্সে (টুইটার) এই বিষয়টি নিয়ে আলোকপাত করেছেন। তিনি লিখেছেন:

“পরিবর্তনের জন্য পাকিস্তানে কেন কোনো গণআন্দোলন হচ্ছে না? যেমনটা আমরা দেখেছি বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কায় এবং সম্প্রতি ভারতে? এটি একটি যৌক্তিক প্রশ্ন। দুর্নীতি, অত্যাচার, বেকারত্ব ও জনগণের সঙ্গে সরকারের সংযোগ না থাকার মতো যেসব কারণে আন্দোলন হয়, তার সবকিছুই পাকিস্তানে উপস্থিত।”

ভারতে যখন ককরোচ পার্টির আন্দোলন সফল হচ্ছিল, তখন সোশ্যাল মিডিয়ায় পাকিস্তানি তরুণদের মধ্যে চরম হা-হুতাশ দেখা গেছে। বিবিসি উর্দুকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এক পাকিস্তানি তরুণ আক্ষেপ করে বলেন, “আমরা যদি কখনও সুযোগ পাই, তবে আমাদেরও এভাবে রাস্তায় নামা উচিত। তারা যেভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দাবি আদায় করেছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়।”

২. ছাত্র রাজনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি দমন-পীড়ন

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় পাকিস্তানে ছাত্র রাজনীতির ভিত্তি অত্যন্ত দুর্বল। আর এর মূল কারণ হলো গত কয়েক দশক ধরে রাষ্ট্রীয়ভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও ছাত্র সংগঠনগুলোকে দমন করে রাখা হয়েছে।

মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, সাবেক সামরিক শাসক জেনারেল জিয়াউল হকের শাসনামলেই পাকিস্তানের ছাত্র রাজনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া হয়েছিল।

১৯৮০ সালে জেনারেল জিয়া আইন করে ছাত্র ইউনিয়ন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেন। এরপর আর কোনো সরকারই সেই নিষেধাজ্ঞা আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে নেয়নি। পাকিস্তানের ছাত্র আন্দোলন পিছিয়ে পড়ার ক্ষেত্রে এই আইনি ও প্রশাসনিক দমনপীড়নই সবচেয়ে বড় কারণ।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

অথচ এই নিষেধাজ্ঞার আগে পাকিস্তানে ছাত্র আন্দোলনের এক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ছিল। ১৯৬৮ ও ১৯৬৯ সালে শিক্ষার্থীদের বিশাল গণঅভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন সামরিক প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান পদত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৮০-এর দশকের পর থেকে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত ভয়ে তরুণদের রাজপথে নামার সংস্কৃতি প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। যদিও ২০১৮ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ছাত্র ইউনিয়ন পুনরুজ্জীবিত করার দাবিতে কিছু চেষ্টা হয়েছিল, কিন্তু জেনারেল জিয়ার আমলের মানসিক ও আইনি বাধা এখনো অনেকটাই রয়ে গেছে।

৩. তীব্র সামাজিক ও গোষ্ঠীগত বিভাজন

পাকিস্তানে তরুণদের একত্রিত হয়ে বড় কোনো জাতীয় আন্দোলন গড়ে তুলতে না পারার আরেকটি বড় কারণ হলো তাদের অভ্যন্তরীণ চরম বিভাজন। দেশটি অঞ্চল, ভাষা ও ধর্মের ভিত্তিতে গভীরভাবে বিভক্ত।

বেলুচিস্তান বা আজাদ কাশ্মিরে মাঝেমধ্যে কিছু বিক্ষোভ দেখা গেলেও সেগুলো আঞ্চলিক স্বার্থের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। পুরো দেশকে একসাথে নাড়া দেওয়ার মতো সর্বজনীন জাতীয় ঐক্য তাদের মধ্যে অনুপস্থিত।

বিবিসি উর্দুকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আরেক পাকিস্তানি তরুণ দেশের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতার কথা তুলে ধরে বলেন:

“ভারতে आंदोलনে আমরা দেখেছি কীভাবে সব তরুণ এক পতাকাতলে চলে এসেছিল। তাদের মধ্যে থাকা সেই ঐক্যই ছিল সাফল্যের চাবিকাঠি। কিন্তু পাকিস্তানে এটি এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। আমরা পাঞ্জাবি, পশতুন, শিয়া এবং সুন্নিতে মারাত্মকভাবে বিভক্ত। আমি মনে করি না পাকিস্তানি তরুণরা কখনোই প্রতিবেশী দেশের মতো একসাথে এক হয়ে রাজপথে নামতে পারবে।”

৪. সামরিক বাহিনীর শক্ত অবস্থান ও ভয়

পাকিস্তানে রাজনীতি এবং সাধারণ মানুষের জীবনের ওপর সামরিক কাঠামোর প্রভাব এতই গভীর যে, সেখানে রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে কথা বলা মানেই চরম ঝুঁকির মুখে পড়া। দীর্ঘদিনের সেনা শাসনের ইতিহাস এবং রাজপথে কড়া নজরদারির কারণে তরুণরা কোনো বড় প্রতিবাদের নেতৃত্ব দেওয়ার সাহস সংগ্রহ করতে পারে না। সাংগঠনিক নেতৃত্বের অভাব ও কঠোর শাস্তির ভয় তরুণদের রাজপথ থেকে দূরে সরিয়ে রাখছে।


বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল বা শ্রীলঙ্কার তরুণরা প্রমাণ করে দিয়েছে যে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ তরুণের কণ্ঠস্বর যেকোনো ক্ষমতার চেয়ে শক্তিশালী। তবে পাকিস্তানে ছাত্র রাজনীতির অনুপস্থিতি, সামরিক বাহিনীর ভয়াল প্রভাব এবং জাতিগত বিভাজনের কারণে জেন-জিদের সেই স্ফুলিঙ্গ বারবার নিভে যাচ্ছে। তরুণ সমাজ যতদিন না নিজেদের ভেদাভেদ ভুলে এক পতাকাতলে দাঁড়াতে পারছে, ততদিন পাকিস্তানে পরিবর্তন বা গণআন্দোলন গড়ে ওঠা বেশ কঠিন বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সর্বাধিক জনপ্রিয়

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সাম্প্রতিক মন্তব্য

- বিজ্ঞাপন-spot_img
error: Content is protected !!