কিডনিতে পাথর হওয়া বর্তমানে খুবই পরিচিত এবং কষ্টদায়ক একটি মূত্রনালিজনিত স্বাস্থ্য সমস্যা। চিকিৎসা বিজ্ঞানের তথ্য অনুযায়ী, নারীদের তুলনায় পুরুষদের মধ্যে এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার হার তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়।
অনেকেই ধারণা করেন, ওষুধ খেয়ে বা অস্ত্রোপচারের (অপারেশন) মাধ্যমে একবার পাথর অপসারণ বা বের করে আনলেই বোধহয় এই সমস্যা থেকে চিরতরে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা এই বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে সতর্ক করছেন। যদি রোগীরা সঠিক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নেন, তবে কিডনিতে বারবার পাথর হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।
আসুন আজকের প্রতিবেদনে আমরা সহজ ভাষায় জেনে নিই কেন কিডনিতে বারবার পাথর হয়, কাদের এই ঝুঁকি বেশি এবং কীভাবে খুব সহজেই দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিবর্তন এনে এই হাত থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব।
কিডনিতে কেন বারবার পাথর ফিরে আসে?
চিকিৎসা বা অস্ত্রোপচারের পর অনেক রোগীই পরবর্তীতে নিয়ম মেনে চলার বিষয়ে অবহেলা করেন। সঠিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা এড়িয়ে যাওয়ার ফলেই মূলত কিছুদিন পর আবার কিডনিতে পাথর জমা হতে শুরু করে। তবে এর পেছনে প্রধান কয়েকটি কারণ বা প্রভাবক কাজ করে:
১. অপর্যাপ্ত পানি পান ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস
শরীরে তরলের বা পানির অভাব দেখা দিলে কিডনি তার স্বাভাবিক কাজ ঠিকমতো করতে পারে না। সঠিক পরিমাণে পানি পান না করলে মূত্র ঘন হয়ে যায়, যা পরবর্তীতে জমে পাথরে রূপ নেয়। এছাড়া খাবারে প্রক্রিয়াজাত বা অস্বাস্থ্যকর উপাদানের বাড়াবাড়িও এর বড় কারণ।
২. অতিরিক্ত ওজন ও বিপাকীয় সমস্যা
অতিরিক্ত শারীরিক ওজন বা স্থূলতা কেবল হৃদরোগ নয়, কিডনির পাথরের জন্যও দায়ী। শরীরে বিপাকীয় (মেটাবলিক) প্রক্রিয়া স্বাভাবিক না থাকলে রক্ত ও প্রস্রাবে বর্জ্য পদার্থের মাত্রা অনিয়মিত হয়ে পাথর তৈরি সহজ করে দেয়।
৩. বংশগত কারণ বা পারিবারিক ইতিহাস
পরিবারে যদি কারো আগে থেকে কিডনিতে পাথর হওয়ার ইতিহাস থাকে, তবে পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যেও এই সমস্যা বারবার দেখা দেওয়ার প্রবল আশঙ্কা থাকে।
৪. শরীরে ক্ষতিকর উপাদানের উচ্চমাত্রা
প্রাকৃতিকভাবেই অনেক মানুষের শরীরে সাধারণ মাত্রার চেয়ে বেশি পরিমাণে ক্যালসিয়াম, অক্সালেট কিংবা ইউরিক অ্যাসিড নিঃসৃত বা তৈরি হয়। মূত্রে এই উপাদানগুলো দ্রবীভূত হতে না পারলে ক্রিস্টাল বা পাথরের কণা তৈরি করে।
কাদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি?
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিচে উল্লেখ করা রোগীদের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা দরকার:
- যাদের ইতোমধ্যে একাধিকবার কিডনিতে পাথর হয়েছে।
- যাদের শরীরের দুইটি কিডনিতেই পাথর ধরা পড়েছে।
- যাদের কিডনিতে জমা পাথরের আকার বা আকৃতি অনেক বড় ছিল।
এই ধরনের রোগীদের ক্ষেত্রে দ্রুত সময়ের মধ্যে রক্তের বিভিন্ন পরীক্ষা এবং বিশেষ মূত্র পরীক্ষা (Urine Test) করিয়ে শরীরের অভ্যন্তরীণ মূল কারণটি শনাক্ত করা উচিত।
বারবার কিডনিতে পাথর জমা এড়াতে যা করণীয়
যদি আপনি একবার এই মারাত্মক ব্যথার মুখোমুখি হয়ে থাকেন, তবে ভবিষ্যৎ ঝুঁকি এড়াতে অবশ্যই একজন ইউরোলজিস্টের (Urologist) পরামর্শ গ্রহণ করা উচিত। পাশাপাশি আপনার প্রতিদিনের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় কয়েকটি স্বাস্থ্যকর পরিবর্তন আনা ভীষণ জরুরি:
১. পর্যাপ্ত পানি ও তরল পান করা
শরীরকে সবসময় আর্দ্র রাখা বা সঠিক হাইড্রেশন নিশ্চিত করাই হলো কিডনিতে পাথর প্রতিরোধের সবচেয়ে প্রধান ও সহজ উপায়। সুবিখ্যাত চিকিৎসা সাময়িকী ‘দ্য ল্যানসেট’-এ প্রকাশিত একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণাতেও সঠিক হাইড্রেশনের এই বিশেষ সুফলের কথা প্রমাণিত হয়েছে। প্রতিদিন অন্তত ২.৫ থেকে ৩ লিটার বা পর্যাপ্ত পানি পান করা আবশ্যক।
২. খাবারে লবণের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা
অতিরিক্ত কাঁচা লবণ বা খাবারে অতিরিক্ত সোডিয়াম গ্রহণ করা কিডনির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এটি প্রস্রাবে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়, যা পাথর তৈরির অন্যতম মূল অনুঘটক। রান্নায় বা খাবারের স্বাদ বাড়াতে বাড়তি লবণের বদলে প্রাকৃতিক ও স্বাস্থ্যকর ভেষজ বা মসলা ব্যবহার করার অভ্যাস করুন।
৩. সুষম ও সঠিক ডায়েট মেনে চলা
স্বাস্থ্যকর ডায়েট অনুসরণ করলে শরীরের অনেক জটিল রোগ দূরে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ডায়াবেটিস অ্যান্ড ডাইজেস্টিভ অ্যান্ড কিডনি ডিজিজেস-এর গবেষণা অনুযায়ী, উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধী ও বিশেষ খাদ্য তালিকা ‘ড্যাশ’ (DASH) ডায়েট মেনে চললে কিডনিতে পাথর জমা হওয়ার ঝুঁকি কার্যকরভাবে অনেক কমে যায়।
আমাদের একটুখানি অসচেতনতাই কিন্তু কিডনির মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের বড় ক্ষতি করে দিতে পারে। আপনি যদি নিয়ম মেনে পর্যাপ্ত পানি পান করেন, লবণের পরিমাণ কমিয়ে আনেন এবং পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করেন, তবে খুব সহজেই কিডনিতে পাথর বারবার ফিরে আসার ভয় থেকে দূরে থাকা সম্ভব। তাই আজ থেকেই নিজের স্বাস্থ্যের প্রতি সচেতন হোন এবং যেকোনো শারীরিক সমস্যায় চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।








